ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের দ্বাদশ দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। এ যুদ্ধবিরতি আদৌ বাস্তবায়ন হবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এখন আলোচনার কেন্দ্রে যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো—যদি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তার শর্ত কী হবে এবং ইরান ও ইসরায়েল উভয়েই কি এতে সম্মত হবে?

এ বিতর্কের ভিড়ে লেখাটির মূল আলোচ্য বিষয় হলো: যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানে উদ্ভূত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট এবং তার জটিল সম্ভাবনাগুলো।

যুদ্ধের পটভূমি ও ইসরায়েলের অবস্থান

যুদ্ধের সূচনালগ্নে ইসরায়েল দাবি করে, তাদের হামলার লক্ষ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ থেকে বিরত রাখা। প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দেন—এ অভিযান কেবল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামানো নয়, বরং খামেনি সরকারের পতন ঘটানোই চূড়ান্ত উদ্দেশ্য। তিনি ইরানের বর্তমান শাসন ব্যবস্থাকে ‘স্বৈরাচারী সরকার’ হিসেবে অভিহিত করেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইরানের প্রকৃত সংকট কি শুধুই খামেনি সরকার?

অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও সরকারের বিরুদ্ধে গোষ্ঠীগত প্রতিরোধ ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানে একটি ধর্মভিত্তিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মানবাধিকার লঙ্ঘন, নারীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপসহ নানা বিষয়ে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। এ পটভূমিতে ইরানে ইসলামী সরকার ব্যবস্থা বাদে গড়ে উঠেছে নানামুখী বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং সরকার ব্যবস্থা। এদের মধ্যে কেউ ধর্মনিরপেক্ষ, কেউ জাতিগতভাবে সংগঠিত, কেউ ইসলামপন্থী, আবার কেউ রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। এদের অধিকাংশকেই ইরানি সরকার সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে।

গত ৪৬ বছরে ইসলামী প্রজাতন্ত্র এদের দমনে কঠোর ও বিস্তৃত ব্যবস্থা নিয়েছে। যদিও কোনো গোষ্ঠীই এখন পর্যন্ত ব্যাপক গণসমর্থন কিংবা প্রয়োজনীয় সামর্থ্য অর্জন করতে পারেনি, যার মাধ্যমে তারা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নেতৃত্বাধীন শাসন ব্যবস্থার জন্য অস্তিত্ব সংকট তৈরি করতে পারে। তবে এ যুদ্ধ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এবং ইসরায়েলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় এসব ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠী ইরানের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। যদিও তারা নিজেদের বিকল্প সরকার হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়, কিন্তু তাদের মধ্যে ঐক্যের অভাব, জনসমর্থনের ঘাটতি এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে তারা কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।

প্রতিটি বিরোধী গোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব এজেন্ডা ও কৌশল, যেগুলোর বহু ক্ষেত্রেই পারস্পরিক বিরোধ রয়েছে। ফলে ইরান আশির দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর সবচেয়ে গুরুতর সংঘাতের মুখোমুখি হলেও একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গঠন হয়ে উঠেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠীগুলোর অনেকেই গোপনে ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বা তাদের সহযোগিতা করছে।

সাবেক ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তা গিওরা আইল্যান্ড—যিনি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর রিজার্ভ মেজর জেনারেল ও জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সাবেক প্রধান সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘‌ইসরায়েল কোনো না কোনোভাবে কিছু ইরানির সহায়তা পাচ্ছে।’ তিনি ইঙ্গিত দেন ইরানে অন্তত তিনটি স্তরের সহায়তা থাকতে পারে—বিশেষত ইরানি স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে পরিচালিত কিছু ড্রোন হামলায় স্থানীয়দের সহযোগিতা পাওয়া যেতে পারে। তার বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়, ইরানের অভ্যন্তরে এমন কিছু গোষ্ঠী রয়েছে যারা খামেনি সরকারের পতন চায় এবং সেই লক্ষ্যে ইসরায়েলকেও সহায়তা করছে।

সম্ভাব্য বিকল্প নেতৃত্ব: কতটা বাস্তবসম্মত?

ধরা যাক, ইরানে খামেনি সরকার পতনের মুখে—তখন কে ক্ষমতায় আসবে? এ প্রশ্নের জবাব এখনো স্পষ্ট নয়। দুটি নাম ঘুরে বেড়াচ্ছে জনচর্চায়:

রেজা পাহলভি ইরানের শেষ শাহ্‌র পুত্র, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। তিনি প্রকাশ্যে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পক্ষে কথা বলেছেন এবং ইরানি জনগণকে বিদ্রোহের আহ্বান জানিয়েছেন।

মরিয়ম রাজাভি মুজাহেদিন-ই-খালকের প্রধান, যাদের অতীতে সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে মিত্রতা ছিল এবং এ দল ইরান-ইরাক যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনের পক্ষে ছিল। তারা বর্তমানে ফ্রান্স ও আলবেনিয়ায় অবস্থান করছে এবং ইরানে সরকারবিরোধী তৎপরতার দাবি করছে।

তবে এ উভয় নেতৃত্বই অত্যন্ত বিতর্কিত। রেজা পাহলভির রাজতান্ত্রিক অতীত এবং মুজাহেদিন-ই-খালকের অস্বচ্ছ ইতিহাস তাদেরকে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের অভ্যন্তরে এদের জনসমর্থন নেই বললেই চলে।

জাতিগত গোষ্ঠীগুলো ও বিচ্ছিন্নতাবাদের হুমকি

মুজাহেদিন-ই-খালক ও রেজা পাহলভির বাইরে আরো বহু গোষ্ঠী বিদ্রোহী অবস্থানে রয়েছে। এর মধ্যে আরব, আজেরি, বেলুচ এবং কুর্দি জাতিগোষ্ঠী উল্লেখযোগ্য। কেউ চাচ্ছে স্বায়ত্তশাসন, কেউ চাচ্ছে স্বাধীনতা। কুর্দিদের ক্ষেত্রে, ইরাক ও সিরিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় তারা মার্কিন সহযোগিতা পেয়েছে এবং ইসরায়েলের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়েছে। কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা মোস্তাফা হেজরি একাধিকবার ইসরায়েলের কাছ থেকে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন।

অন্যদিকে গবেষক মুহাম্মদ সাহিমি বলেন, ‘‌আজেরি ও আরব জনগোষ্ঠী বিচ্ছিন্নতাবাদে আগ্রহী নয় এবং বেলুচদের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সামরিক সামর্থ্যও অত্যন্ত সীমিত। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে চায়, তাদের প্রধান লক্ষ্য হবে কুর্দিরাই।’

তবে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও বিভাজন আছে—যেমন PJAK, PAK এবং কুমালা পার্টি—যারা মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যেই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। কুমালার মহাসচিব আবদুল্লাহ মোহতাদি বলেন, ‘‌তারা এখন আর সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষে নয়, তারা আন্তর্জাতিক সহায়তা চায়।’

যদিও এ রকম পরিস্থিতিতে ইতিহাস থেকে দেখা যায়, জাতীয় সংকটের সময়ে ইরানি জনগণ সরকারের পক্ষে দাঁড়ায় এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী হুমকির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘‌জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর ওপর জোর দিলে তা গোটা অঞ্চলকেই অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে, যেমনটি হয়েছিল ২০০৩ সালের পর ইরাকে।’

জাতীয় ঐক্য ও সাময়িক সংহতি

সাম্প্রতিক জরিপগুলো ইঙ্গিত দেয়, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ইরানকে ভাঙার বদলে বরং অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে জোরদার করছে। এতে যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও নেতানিয়াহুর উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি আরো জোরালো হচ্ছে। সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো সিনা তুসি বলেন, ‘‌এখন অধিকাংশ ইরানিই পারমাণবিক অস্ত্র চায়।’

তুসি আরো বলেন, ‘‌যদি আমেরিকা ও ইসরায়েল বিভিন্ন জাতিগত আন্দোলনকে উসকে দেয়, তা সাময়িকভাবে কিছু সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে চরম মূল্য দিতে হবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০০৩ সালের ইরাকের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, শাসন ব্যবস্থার পতনের পর চরমপন্থীরা সুযোগ নেয় এবং সীমান্ত অঞ্চলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে ইরানের পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্ত এরই মধ্যে সহিংসতার ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে।’

ইসরায়েলি হামলায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যু এবং অবকাঠামো ধ্বংস—দুই-ই ইরানের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ভুলিয়ে, বহিরাগত হুমকির বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। তুসি বলেন, ‘‌অনেক ইরানিই যুদ্ধ চায় না কিন্তু বিদেশী আগ্রাসনকে বড় হুমকি হিসেবে দেখে।’ এ প্রবণতা হয়তো স্বল্পমেয়াদে রাষ্ট্রীয় ঐক্য গড়তে সাহায্য করবে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সরকারবিরোধী অসন্তোষ আরো গভীরতর হতে পারে।

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পরিণতি কেবল সামরিক পর্যায়ে নয়, বরং রাজনৈতিক কাঠামোতেও গভীর প্রভাব ফেলবে। যুদ্ধের সময় জনগণ সাধারণত সরকারের পাশে থাকে, কিন্তু যুদ্ধ শেষে তাদের প্রতিক্রিয়াই হবে নির্ধারক—তারা খামেনি সরকারের সঙ্গে থাকবে, নাকি এক নতুন রাজনৈতিক পথ খুঁজবে।

তবে পরিবর্তন যদি আসে, তা যেন বাহ্যিক প্রভাব থেকে নয় বরং ভেতরের গণতান্ত্রিক শক্তির মাধ্যমেই ঘটে। এ যুদ্ধ যেন জাতীয় ঐক্যে বিভাজন না আনে বরং তা আরো সুদৃঢ় করে। কেননা ইরানের স্থিতিশীলতা এখন মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার প্রধান ভিত্তি।

সানজিদা বারী: পিএইচডি শিক্ষার্থী এবং গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগো