চাহিদা বিবেচনায় চালের পর দেশের প্রধানতম কৃষিপণ্য আলু। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আলুর সর্বোচ্চ বার্ষিক চাহিদা ৮০ লাখ টন। এ বছর আলুর আবাদ হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি জমিতে। উৎপাদন ১ কোটি ২০ লাখ টন ছাড়ানোর প্রাক্কলন রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই জোগান বেশি থাকায় এর বাজারদর বর্তমানে নিম্নমুখী। এতে দেখা যাচ্ছে, আলুর বিক্রীত দামে কৃষকদের উৎপাদন খরচ উঠে আসছে না। এমন সময় সাধারণত কৃষকরা আলু সংরক্ষণে আগ্রহী হন এবং জোগান কমে এলে বাজারে তা আবারো সরবরাহ করেন। তবে এক্ষেত্রে এবার বিপাকে পড়েছেন দেশের কৃষকরা। হিমাগার মালিকরা কোল্ড স্টোরেজের ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়িয়েছেন। এমনিতে বাড়তি উৎপাদনের কারণে কৃষকরা আলু বিক্রিতে লোকসানে রয়েছেন, অন্যদিকে সংরক্ষণের জন্য তাদের বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে। যে কারণে কৃষকরা, বিশেষত প্রান্তিক কৃষকরা কম দামে মাঠেই আলু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
এদিকে কৃষি বিপণন আইন ২০১৮ অনুযায়ী, হিমাগারের ভাড়া বৃদ্ধি বা নির্ধারণ করতে হবে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পরামর্শক্রমে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে। কিন্তু ভাড়া বাড়ানো হয়েছে সংবাদ সম্মেলন করে। ৮ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে আলু সংরক্ষণে ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএসএ)। সেখানে হিমাগারে সংরক্ষণে কেজিপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ৮ টাকা, যা আগে ছিল ৫ টাকা। আর প্রতি বস্তায় ৫০ কেজি আলু রাখার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। যদিও আগে কৃষকরা ৭০ কেজির বস্তা ৩৫০ টাকায় কোল্ড স্টোরেজে রাখতেন।
হিমাগারের ভাড়া বাড়ানোর পেছনে যুক্তি হিসেবে হিমাগার মালিকরা বলছেন, ব্যাংকের সুদহারসহ ব্যবসার খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিসিএসএর ভাষ্যমতে, কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভাড়ার যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে সরকার যদি কৃষকদের সুরক্ষা দিতে চায় তাহলে তাদের জন্য ব্যাংকের সুদহার কমিয়ে দিতে হবে। তারা জানায়, বর্তমানে হিমাগার পরিচালনার জন্য গৃহীত ব্যাংক ঋণের সুদহার বহুলাংশে বেড়ে প্রায় ১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া সঠিক সময়ে কিস্তি দিতে না পারলে জরিমানা ২ শতাংশসহ মোট ১৭ শতাংশে দাঁড়ায়। তারা সুদের হার ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে। উল্লেখ্য, সংস্থাটি বিদ্যুৎ বিল কমানোর দাবিও উত্থাপন করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আলু উৎপাদন বেশি হওয়ায় এ ধরনের কারসাজি করা হচ্ছে। প্রভাবশালী হিমাগার মালিকরা আইন অমান্য করে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে হিমাগারের বাড়তি ভাড়া চাপিয়ে দিয়েছেন কৃষকের ওপর। কৃষক এখন উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। এর মধ্যে ভাড়া বাড়ানোয় কৃষকের লোকসান আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাজার পর্যবেক্ষকদের অভিমত, এ অবস্থার সুযোগ নিতে পারে মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট। তারা কম দামে মাঠ থেকে আলু সংগ্রহ করে মজুদ বাড়াতে চায়, যাতে সামনের দিনগুলোয় আলুর বাজারকে আবারো অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
গত নভেম্বরের শেষ দিকে পুরনো আলুর দাম কেজিতে ৭৫ টাকা ছড়িয়ে যায়, যা বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। ২০২৩ সালের ২৩ নভেম্বর বাজারে আলুর কেজিপ্রতি মূল্য ছিল ৫০ টাকার মধ্যে। আলুর বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পেছনে সে সময়ও অন্যতম দায় ছিল সরবরাহ সংকট ও হিমাগার পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধি। সেই সময় কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, দেশী ও আমদানীকৃত আলুর দাম কোনো অবস্থায়ই ৩৫-৪০ টাকার বেশি হওয়ায় কথা না। মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের পাশাপাশি আরো অনেকেই আলুর বাজারদরে অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ায় ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকদের কারসাজিকে দায়ী করেছেন।
এ প্রেক্ষাপট বিচারে আলুর বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার যে আশঙ্কা রয়েছে তা উপেক্ষা করা কঠিন। তাছাড়া নিয়মের তোয়াক্কা না করে বিসিএসএ যে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে তা কোনোভাবেই মান্য হতে পারে না। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বণিক বার্তাকে জানিয়েছে, এরই মধ্যে হিমাগারের ভাড়া নির্ধারণের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করা হয়েছে। দ্রুতই আইন অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রত্যাশা রয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর এ কাজে সফল হোক। হিমাগারের ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা হোক। সেই সঙ্গে সরকারের উদ্যোগ নিতে হবে আলু সংরক্ষণে এবং বাড়তি আলু সঠিকভাবে বাজারজাত করার বিষয়ে।
বর্তমানে কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ ১৪-১৫ টাকা হলেও বিক্রির সময় দাম পাচ্ছেন মাত্র ৯-১৩ টাকা। এতে কৃষকের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে, যা তাদের ভবিষ্যৎ চাষাবাদের উৎসাহ কমিয়ে দেবে। অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগীরা কম দামে আলু মজুদ করে ভবিষ্যতে উচ্চমূল্যে বিক্রি করলে বাজারে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতি এড়াতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক।
প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বিশেষ সংরক্ষণ সুবিধা দেয়া যেতে পারে। সরকার হিমাগারগুলোর একটা নির্দিষ্ট শতাংশ জায়গা প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সংরক্ষিত রাখার নীতি নিতে পারে, যাতে তারা কম খরচে আলু সংরক্ষণ করতে পারে। কেজিপ্রতি ভর্তুকি দেয়াও হতে পারে একটি সমাধান। এতে কৃষকদের সংরক্ষণ ব্যয় অনেকটাই কমে আসবে।
পাশাপাশ কৃষি মন্ত্রণালয় বা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) সরাসরি কয়েক লাখ টন আলু কিনে মজুদ করতে পারে, যাতে পরবর্তী সময়ে দাম বাড়লে তা বাজারে সরবরাহ করে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যায়। সেই সঙ্গে উদ্বৃত্ত আলু রফতানির জন্য সরকার সহজ শর্তে নীতিমালা ঘোষণা করতে পারে।
মোট কথা, কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। একই
সঙ্গে সহনীয় মূল্যে ভোক্তা খাদ্যপণ্য কিনবেন, সেটিও নিশ্চিতে সরকারকে সচেষ্ট থাকতে হবে।










