জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলোর একটি হলো সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি জীবনব্যাপী শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি। এছাড়া এসডিজির ৪-এর সাবকম্পোনেন্ট ৪.১-এ ২০৩০ সালের মধ্যে সব শিক্ষার্থী যাতে প্রাসঙ্গিক, কার্যকর ও ফলপ্রসূ অবৈতনিক, সমতাভিত্তিক ও গুণগত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে, তার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা খাতের বাস্তবতা হলো মাধ্যমিক পর্যায়ে অবৈতনিক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে দেশ অনেকটাই পিছিয়ে।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ২১ হাজারের বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৯৩ দশমিক ৭ শতাংশই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীর সংখ্যার দিক থেকেও একই চিত্র প্রতিফলিত হয়। মাধ্যমিকে অধ্যয়নরত প্রায় ৯৪ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮৭ লাখের বেশি পড়ছে বেসরকারি বিদ্যালয়ে। এসব বিদ্যালয়ে ভর্তি ফি, মাসিক বেতন, পরীক্ষা ফিসহ নানা ধরনের ব্যয় বহন করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীর পরিবারকে। যদিও অনেক বেসরকারি বিদ্যালয়কে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। যার মাধ্যমে সরকার এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনের একটি অংশ বহন করে এবং বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করে, তবু আর্থিক চাপ উল্লেখযোগ্য হারে কমেনি। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের অনেকেই আর্থিক চাপের কারণে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে। বর্তমানে মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার ৩৫ শতাংশের ওপর। উচ্চ ব্যয়ের কারণে শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার পরও মাধ্যমিক শিক্ষা কেন বেসরকারি খাতনির্ভর হয়ে উঠল সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ব্যানবেইসের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত ৫০ বছরে মোট বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে ১২ হাজার ২৬৮টি। একই সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৪৯৬। এর মধ্যে ৩১৭টি প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হয় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের শাসনামলে (২০১১-২৩ সাল)। কিন্তু জাতীয়করণ হলেও যথাযথ পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের অভাবে এসব বিদ্যালয়কে মানসম্মত করে গড়ে তোলা যায়নি। অন্যদিকে এর আগে থেকে বিদ্যমান সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোও মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠেনি। মোটাদাগে, বেশির ভাগ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ অনুযায়ী শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৩০ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হলেও সেটি বাস্তবায়ন করা যায়নি। এছাড়া গতানুগতি পাঠ্যক্রম, সেকেলে পাঠদান পদ্ধতি, শ্রেণীকক্ষ, আসন, টয়লেট, পানীয়জল ও প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধার ঘাটতিও রয়েছে। এসব কারণে বেসরকারি বিদ্যালয়নির্ভরতা বেড়েছে।
কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, গুটিকয়েক মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাদে বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে সেভাবে সফল হতে পারেনি। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান লাভ করতে না পারায় অভিভাবকরা গৃহশিক্ষক বা কোচিং সেন্টারের মতো প্রতিষ্ঠানে সন্তানকে পাঠাতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। চাহিদার কারণে বিগত সময়ে কোচিং সেন্টারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা শিক্ষাকে আরো ব্যয়বহুল করেছে। অর্থাৎ উচ্চ ব্যয়ের কারণে একদিকে শিক্ষার সুযোগ হারাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে অতিরিক্ত ব্যয় করেও তারা মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে না, যা শিক্ষাক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
মাধ্যমিকে শিক্ষার উচ্চ ব্যয় ও মানহীনতার পাশাপাশি আরো কিছু সমস্যা বিদ্যমান, যা বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। এ স্তরের শিক্ষাধারা একমুখী নয়। সরকারি, বেসরকারিসহ কারিগরি, মাদ্রাসা, ইংরেজি মাধ্যম ও কওমি মাদ্রাসা বিভিন্ন ধারার মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম, শিক্ষার মান ও ব্যয়ের পরিমাণের ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে। এতে দেখা যায় একই বয়সী শিশু ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন মানের শিক্ষা পাচ্ছে। অভিভাবক যত বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারছেন, তাদের সন্তান তত বেশি মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থার এ বৈষম্য এসডিজির অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা লক্ষ্য অর্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরে বিদ্যমান এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া এসডিজিতে বিনামূল্যে মানসম্মত শিক্ষার যে লক্ষ্য রয়েছে তা পূরণে সক্ষম না হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। এর সমাধান করতে হলে সর্বাগ্রে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ও সব সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে বিদ্যমান অবকাঠামোমূলক সংকট দূর করা দরকার। এর বাইরে পাঠ্যক্রম নিয়েও ভাবনা প্রয়োজন। বিভিন্ন ধারা থেকে মাধ্যমিক শিক্ষাকে একমুখী করে গড়ে তোলা কঠিন। তবে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতে অন্তত কয়েকটি মৌলিক বিষয় পড়ানো হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নে কার্যকর মনিটরিং ও জবাবদিহি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি ও অন্যান্য সহায়তা সময়োপযোগী করা দরকার, যাতে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে। এজন্য শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি আবশ্যক।
দেশের শিক্ষা খাতে সরকারি বরাদ্দ এখনো জিডিপির ২ শতাংশেরও নিচে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষায় ন্যূনতম ৪-৬ শতাংশ বরাদ্দ প্রয়োজন। বরাদ্দ কম থাকায় নতুন সরকারি স্কুল স্থাপন, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সংযোজন—সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষার মানোন্নয়ন অসম্ভব হয়ে পড়ছে এবং শিক্ষা হয়ে উঠেছে ব্যয়বহুল।
দেশ অবৈতনিক শিক্ষার বিষয়ে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষায় কিছু সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে এখনো অনেক পিছিয়ে। এসডিজির লক্ষ্য পূরণ করতে হলে মাধ্যমিক স্তরে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষায় বরাদ্দও বহুগুণে বাড়াতে হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। কেননা জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরের ক্ষেত্রে মানসম্মত ও সর্বজনীন শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। আর এদেশের মতো জনবহুল দেশের জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে রূপান্তর করা অতীব জরুরি। টেকসই অগ্রগতির পাশাপাশি ২০৩০ সালের এসডিজি অর্জন করতে হলে সরকারকে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং মাধ্যমিক স্তরে সরকারি শিক্ষার সুযোগ প্রসারিত করতে হবে। অন্যথায় এসডিজি কেবল কাগজে-কলমেই থেকে যাবে।










