রমনার বটমূলে ঐতিহ্যবাহী সংগীতানুষ্ঠান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ আয়োজিত ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ সারা দেশই নববর্ষকে বরণ করতে নানা আয়োজনে মত্ত থাকে। ১৪৩২ বঙ্গাব্দকে বিদায় জানিয়ে পরম সমারোহে পালিত হয়েছে বাংলা নববর্ষ-১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। এবারের বৈশাখী শোভাযাত্রার স্লোগান ‘নববর্ষের ঐক্যতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। নববর্ষের আকাঙ্ক্ষাও এটিই। দেশের সর্বত্র গণতন্ত্রের চর্চা হোক এবং সবার মধ্যে ঐক্য বজায় থাকুক। সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ বাড়ুক।
দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে খুব বেশি স্বস্তি নেই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাউল, মরমিশিল্পী, লোকসংগীতশিল্পী, মঞ্চ ও যাত্রাশিল্পী এবং সংস্কৃতিকর্মীদের ওপর ধারাবাহিক হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে চলেছে। এসব ঘটনা নতুন করে সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। এগুলো লোকশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এগুলো বিশেষত বাউল সংগীত মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা ও আধ্যাত্মিক মুক্তির বার্তা বহন করে, সেটিই আজ আক্রমণের মুখে। লালন ফকিরের দর্শন যেখানে মানুষকে ভেদাভেদ ভুলে এক হওয়ার শিক্ষা দেয়, সেখানে তার অনুসারীদের ওপর সহিংস আচরণ সাংস্কৃতিক পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে। আর এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এ প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে এবং সমাজে এক ধরনের বিভাজন তৈরি করছে।
গণতন্ত্রের চর্চা প্রসঙ্গে এটিও বিবেচনায় রাখা উচিত যে সাংস্কৃতিক চর্চাও মানুষের অধিকারের অংশ। এক্ষেত্রেও কোনো হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। আর কোনো এক অংশকে অবদমন করতে গেলে পুরো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ ও ব্যর্থও হয়। সুতরাং সাংস্কৃতিক পরিবেশকে অবশ্যই স্বস্তিদায়ক করতে হবে, যদি দেশে প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করতে হয়। এজন্য সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বাগ্রে সচেষ্ট থাকতে হবে। বাংলা নববর্ষ সেই সহাবস্থানেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের পর থেকেই বর্ষবরণ উৎসব অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক হিসেবে নতুন মাত্রা পায়। বাঙালির জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে নববর্ষ একাত্ম হয়ে ওঠে। এ উৎসব ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে একত্র করে, যা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সংহতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখে দেয়া জরুরি। মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক সৌহার্দপূর্ণ সহাবস্থানই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
বাংলা নববর্ষের সূচনা হয় মূলত মোগল সম্রাট আকবরের সময়ে। কৃষিকাজে সুবিধার জন্য সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সন প্রবর্তন করেন। তবে তা কার্যকর ধরা হয় তার সিংহাসনে আরোহণের বছর তথা ১৫৫৬ সালে। গোড়ায় ‘ফসলি সন’ নামে অভিহিত করা হলেও পরে নাম হয় বঙ্গাব্দ। তখন চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার ও অন্যান্য ভূস্বামীর খাজনা পরিশোধ করতেন কৃষকরা। নতুন বছরের শুরুর দিন ভূস্বামীরা তাদের করাতেন মিষ্টিমুখ। এ উপলক্ষে আয়োজন করা হতো মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠান। ক্রমে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে পহেলা বৈশাখ আনন্দ-উৎসবের উপলক্ষ হয়ে ওঠে। পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈশাখী মেলার প্রভাব গভীর হতে থাকে। কুমার, তাঁতি, ময়রা, বাঁশ-বেতশিল্পীদের জন্য এটি ছিল কর্মসংস্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। আজও সেই ধারা বহমান, যদিও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে।
বর্তমান সময়ে বৈশাখকে ঘিরে অর্থনীতির একটি মৌসুমি গতি তৈরি হলেও তা আর আগের মতো প্রাণবন্ত নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, জ্বালানি পণ্যের সংকট ও দামে ঊর্ধ্বগতি এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে মানুষের ভোগ ব্যয় কমছে। ফলে বৈশাখী মেলা ও উৎসবকেন্দ্রিক বাণিজ্যও কিছুটা চাপের মুখে। দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভীত রফতানি খাতও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারায় রয়েছে। অর্থাৎ সামষ্টিক অর্থনীতিতে যে স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, তা এখন নেই। এক্ষেত্রে গ্রামীণ অর্থনীতি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতি তথা ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি (এসএমই) শিল্প খাতের গতিও বেশ শ্লথ। এ খাতের উদ্যোক্তারা ব্যাংক ও অন্যান্য খাত থেকে অর্থায়ন সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা অসুবিধায় পড়েন। অথচ তাদের জন্য নীতি সহায়তা আরো বাড়ানো গেলে সেটি সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক ফল আনতে পারে। এসএমই খাতের উদ্যোক্তারা প্রায়ই ব্যাংকিং ও অর্থায়ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। যদিও এ খাতে দেশের অর্থনীতির প্রাণ বলে অভিহিত করা হয়। সম্প্রতি বৈশাখী মেলার উদ্বোধনে এ খাতের সহায়তায় ক্রেডিট হোলসেলিং কার্যক্রমের আওতায় দেয়া ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা উল্লেখ করেছেন শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী। তিনি আরো বলেন যে এ তহবিল ভবিষ্যতে ২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হবে। প্রয়োজনীয় অর্থায়নের পাশাপাশি এ খাতের প্রতি সরকার বিশেষ নজর দেবে এটাই প্রত্যাশা। তাতে ভবিষ্যতে বৈশাখী অর্থনীতিও আরো চাঙ্গা হবে বলে আশা করা যায়।
নববর্ষের উৎসব বাংলার গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আজও গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণত নববর্ষে তারা বাড়িঘর পরিষ্কার রাখে এবং ব্যবহার্য সামগ্রী ধোয়ামোছা করে। দিনটিতে ভালো খাওয়া, ভালো থাকা এবং ভালো পরার চেষ্টা করে। ঘরে ঘরে মিষ্টি-পিঠা-পায়েসসহ নানা রকম লোকজ খাবার তৈরির ধুম পড়ে যায়। একে অন্যের সঙ্গে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় চলে। প্রিয়জনকে উপহার দেয়ার মাধ্যমে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, যা শহরাঞ্চলেও এখন বহুল পরিচিত। বর্ষবরণ অনুষ্ঠান এখন শুধু আনন্দ-উল্লাসের উৎসব নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির শক্তিশালী ধারক-বাহক।
এ প্রেক্ষাপটে নববর্ষের আহ্বান কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনে প্রতিফলত হবে, সেই প্রত্যাশা রয়েছে। আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে পরিপূর্ণ স্বস্তি ফিরে আসুক। স্বাগত ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।










