সরকারের নীতিনির্ধারক এবং জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের মধ্যে সামনাসামনি মতবিনিময় এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে প্রতি বছর ডিসি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এবারের জেলা প্রশাসক সম্মেলন শেষ হয়েছে গতকাল। তিন দিনব্যাপী আয়োজিত এ সম্মেলনে বিভিন্ন মহল থেকে নানা পরামর্শ ও সুপারিশ উঠে এসেছে। বিশেষত দেশে আইনের শাসন বজায় রাখতে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে এ সম্মেলনে। বর্তমান প্রেক্ষাপটের দিকে লক্ষ করলে এ আহ্বান তথা ডিসিদের পেশাদারত্ব আচরণের গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়।
গত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পতন ঘটেছে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের। দলটির প্রধান দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। সেই সঙ্গে আত্মগোপনে গেছেন অন্যান্য নেতা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা। জনরোষের মুখে পড়ে কর্মক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়েছেন অনেক জেলা প্রশাসকও। এতে জনপ্রশাসনে শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
জেলা প্রশাসকদের এমন জনরোষে পড়ার অন্যতম কারণ, তারা জনগণের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত না করে বিগত সরকারের এক ধরনের দলীয় কর্মীতে পরিণত হয়েছিল। গত দেড় দশকে তারা তাদের পেশাদারত্ব সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করেছিলেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অনেকেই বিপুল ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের অংশীজন হয়ে যান। বিগত সরকারের সব অনৈতিক কাজে তারা সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছেন। বিনিময়ে নিজেরা অবৈধ ধনে-সম্পদে-ক্ষমতায় ফুলেফেঁপে ওঠেন।
এমন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে জনপ্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। উদ্যোগ হিসেবে সরকার ব্যাপক রদবদল করেছে প্রশাসনে। পদোন্নতি থেকে বদলি সবই করা হয়েছে। তবে সেটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হয়নি। নতুন পদে পদায়ন ঘিরে সচিবালয়ে গোলমাল-বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। অনেকেই নিজেকে বিগত সরকার ও একইভাবে বর্তমান সরকারের আমলে পদবঞ্চিত থাকার দাবি তুলেছেন। আবার নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকদের অনেকের বিরুদ্ধে আগের সরকারের আমলে বিশেষ সুবিধা পাওয়া, আর্থিকভাবে অসৎ, রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্টতা ও অনৈতিকতার অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আবার সরকার বেশ কয়েকজন নবনিযুক্ত ডিসির নিয়োগ বাতিল করে ও বদলিকৃত জেলা পরিবর্তন করে। তবে এসব বিশৃঙ্খলার অবসান এখনো ঘটেনি। সব মিলিয়ে বলা যায়, এ দেশে ডিসিদের পেশাদারত্বের অভাব রয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তাদের দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। সাধারণত ডিসিদের জেলায় তিন ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হয়। রাজস্ব আদায়, বিচারসংক্রান্ত এবং সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ তাদের ওপর অর্পিত থাকে। এসব কর্মকাণ্ড যথাযথভাবে পালনে দৃঢ়তা ধরে রাখতে পারলে কোনো রাজনৈতিক দলের শাসনযন্ত্র হবে না তারা। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু উদ্যোগ নেয়া আবশ্যক।
জেলা প্রশাসক নিয়োগ হতে হবে যোগ্যতার মানদণ্ডে। দল বা সরকারের আনুগত্যের বদলে কিংবা প্রার্থীর রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে পেশাদারত্বের প্রতি গুরুত্ব দেয়া এক্ষেত্রে সর্বাধিক জরুরি। তাই কেউ নিজেকে পদবঞ্চিত দাবি করলেই তাকে পদায়ন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। নয়তো অযোগ্য ব্যক্তি প্রশাসক হলে তাতে জনপ্রশাসনের কর্মকাণ্ড ব্যাহত হতে পারে। সেই সঙ্গে পদবঞ্চিত হওয়ার কারণও খুঁজে বের করতে হবে। কেননা দুর্নীতি-অনিয়ম-অদক্ষতা-অনৈতিকতা-অপেশাদারত্বের কারণেও অনেকে পদবঞ্চিত হতে পারেন। এছাড়া অনেকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও চালু থাকলে অনেকে পদবঞ্চিত হন। এমন কোনো ব্যক্তি ডিসি পদে পদায়নের অযোগ্য বলে বিবেচিত হওয়া উচিত। আবার নানা অভিযোগ সত্ত্বেও সর্বশেষ যারা ডিসি হিসেবে পদায়িত হয়েছেন, তাদের অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন এবং অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনা দরকার।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে জনপ্রশাসনে জনসেবা উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে দায়িত্বরতরা জনগণের আস্থা হারিয়েছেন। তবে নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে জনপ্রশাসন সংস্কার করতে হবে। সেক্ষেত্রে ডিসি সম্মেলনে জেলা প্রশাসকদের দায়িত্বশীল হওয়ার পাশাপাশি আরো যে সুপারিশ প্রস্তাবিত হয়েছে, সেগুলো বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। যেমন যেকোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকারের সঙ্গে ডিসিদের যোগাযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সমঝোতার মাধ্যমে হওয়া বড় দুর্নীতির খবর ধামাচাপা না দিতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে রমজানে খাদ্যশস্য বিতরণ সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে কাজ করতে হবে ডিসিদের।
মোট কথা, দেশের সার্বিক পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় কাজ করতে হবে ডিসিদের। এজন্য নৈতিকতা ও পেশাদারত্বের অনুশীলন করতে হবে। নিজ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনসেবাকে প্রাধান্য দেয়া জরুরি—এ মনোভাব তাদের মধ্যে ওঠা আবশ্যক। জনপ্রশাসন গত দেড় দশকে যেভাবে ফ্যাসিবাদের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে, এমন আমলাতন্ত্র পুনরায় দেশবাসী চায় না। জনপ্রশাসকদের হতে হবে নীতির বাহক। আমলাতন্ত্রের ফ্যাসিবাদের সহযোগী হয়ে ওঠার প্রবণতা ঠেকাতে হবে।
একই সঙ্গে ডিসিদের যৌক্তিক দাবির প্রতি সরকারের যত্নশীল হতে হবে। জানা যায়, প্রতি বছর ঘটা করে ডিসি সম্মেলন করা হলেও এখান থেকে উৎসারিত অনেক সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন হয় না। সিদ্ধান্তগুলো আটকে থাকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়। সেগুলো যাচাই করতে হবে। সিদ্ধান্তগুলোকে বিভিন্ন মেয়াদে ভাগ করে সেগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।










