বাংলাদেশ বর্তমানে এক গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। প্রতিদিন সংবাদপত্র কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার পাতা খুললেই চোখে পড়ে—রক্তাক্ত সংঘর্ষ, গণপিটুনি, ছিনতাই, ধর্ষণ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, খুন কিংবা চাঁদাবাজির মতো ভয়াবহ সব দৃশ্য। এসব ঘটনা আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর সমাজ-সংকটের প্রতিচ্ছবি। এ সংকটের মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা, সামাজিক বৈষম্য, মূল্যবোধের অবক্ষয়, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নানা দুর্বলতা। ফলে মানুষ ক্রমেই হয়ে উঠছে সহিংস, আত্মকেন্দ্রিক ও প্রতিহিংসাপরায়ণ। এ অবস্থার পেছনে কেবল ব্যক্তি নয়, রয়েছে একটি সিস্টেমের দীর্ঘমেয়াদি ব্যর্থতা যা এখন একটি প্রজন্মকে অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দিচ্ছে। তাই এখনই সময় এ অস্থিরতার গভীরে প্রবেশ করে এর মূল কারণগুলো শনাক্ত করা এবং উত্তরণের জন্য সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা।
অস্থিরতার পেছনের বাস্তব কারণগুলো: বাংলাদেশে যে সামাজিক অস্থিরতা দিন দিন বেড়েই চলেছে তা কোনো আকস্মিক প্রক্রিয়ার ফসল নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জটিলতার ফল, যা বহুস্তরবিশিষ্ট এবং গভীরভাবে প্রোথিত। এর পেছনে কিছু প্রভাবশালী কারণ ক্রমাগতভাবে কাজ করে যাচ্ছে, যেগুলোর অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতা এবং নৈতিক শিক্ষার অভাব সমাজে অস্থিরতা তৈরির অন্যতম প্রধান কারণ। আজকের শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত সার্টিফিকেট ও গ্রেড নির্ভর হয়ে পড়েছে। পাঠ্যবই মুখস্থ করা, কোচিং নির্ভরতা এবং পরীক্ষায় ভালো ফলাফলকে একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে নেয়ায় শিক্ষার্থীরা মানবিকতা, সহনশীলতা, মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধের চর্চা থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। আরো উদ্বেগজনক হলো, নৈতিক শিক্ষার প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি কেবল চাকরি পাওয়া হয়, তবে সে শিক্ষা সমাজবোধ, ন্যায়বোধ কিংবা মানবিকতা গঠনে ব্যর্থ হবে। অন্যদিকে দরিদ্র ও বস্তিবাসী শিশুদের অনেকের কাছেই এ শিক্ষা পৌঁছে না, ফলে তারা সহজেই অপরাধ, মাদকাসক্তি কিংবা সহিংস চক্রে জড়িয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থানের অভাব ও বেকারত্ব এক ভয়াবহ সামাজিক চাপ তৈরি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ থেকে বের হওয়া হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণ কোনো উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ না পেয়ে হতাশায় ভুগছে। এ হতাশা ধীরে ধীরে রূপ নেয় ক্রোধ, হিংসা ও সহিংস প্রবণতায়। অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অভাবে অনেকে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, যেমন চাঁদাবাজি, ছিনতাই, সাইবার অপরাধ বা রাজনৈতিক সন্ত্রাস। যখন যুবসমাজ স্বপ্ন দেখতে ভুলে যায়, তখন তারা ভিন্ন পথে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চায় এবং সেটিই সমাজে অস্থিরতার নতুন মাত্রা যোগ করছে।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সহিষ্ণুতার অভাব এবং রাজনীতির দলীয় অপব্যবহার আজকের সমাজে অস্থিরতার অন্যতম চালিকাশক্তি। রাজনৈতিক বিরোধ এখন আর কেবল মতভিন্নতা নয়, বরং হয়ে উঠেছে অস্তিত্বের লড়াই। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে নিঃশেষ করার প্রবণতা বাড়ছে। রাজনৈতিক মদদে অপরাধীদের প্রশ্রয় দেয়া, দলীয় ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজি, জমি দখল কিংবা বিরোধীদের ওপর হামলা এখন সমাজে একটি স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনি আস্থার জায়গা দিন দিন ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে এবং সহিংসতা একটি গ্রহণযোগ্য প্রতিক্রিয়া হিসেবে গৃহীত হচ্ছে।
চতুর্থত, সোশ্যাল মিডিয়ার অসচেতন ব্যবহার এবং সেখানে হিংসার উসকানি, গুজব ও ভুল তথ্যের অবাধ বিস্তারও সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। অনেক সময় কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই না করেই গণপিটুনির মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা এবং সামষ্টিক রাগের বহিঃপ্রকাশের জন্য সোশ্যাল মিডিয়াই যেন এখন একমাত্র প্লাটফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিংসা, বিদ্বেষ আর প্রতিশোধমূলক মনোভাব ক্রমেই এখানে স্থান পাচ্ছে, যা সরাসরি সমাজে হিংসাত্মক আচরণে অনুপ্রাণিত করছে।
পঞ্চমত, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারত্বের অভাব, পক্ষপাতমূলক আচরণ এবং দায়িত্বহীনতা সমাজে ন্যায়ের বোধ দুর্বল করে ফেলছে। যখন অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে বারবার বেরিয়ে আসে কিংবা রাজনৈতিক আশ্রয়ে রক্ষা পায়, তখন সাধারণ মানুষ মনে করে—আইনের কোনো কার্যকারিতা নেই। এ বিশ্বাসহীনতা থেকেই মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেয়ার মনোভাব পোষণ করতে শুরু করে, যা সমাজে নৈরাজ্যের জন্ম দেয়।
অবশেষে সমাজে বাড়তে থাকা মনস্তাত্ত্বিক চাপ, মানসিক অবসাদ এবং ব্যর্থতা গ্রহণ করতে না পারার প্রবণতাও অস্থিরতার অন্যতম উৎস। মানুষের চাওয়া-পাওয়ার সীমা বেড়ে গেছে, কিন্তু তার পেছনে শ্রম, ধৈর্য কিংবা আত্মনিয়ন্ত্রণ নেই। তরুণরা স্বল্প সময়ে বড় কিছু অর্জন করতে চায়, কিন্তু ব্যর্থ হলে তা সহ্য করতে পারে না। এতে তৈরি হচ্ছে আত্মকেন্দ্রিকতা, ঈর্ষা, হিংসা এবং আত্মঘাতী প্রবণতা। এ মানসিক শূন্যতা, উদ্দেশ্যহীনতা এবং হতাশাই অনেক সময় অপ্রত্যাশিত সহিংস আচরণে রূপ নেয়।
এ প্রতিটি স্তর একে অন্যের সঙ্গে জড়িত এবং মিলিতভাবে একটি বৃহৎ অস্থির সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করছে। রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজ—এ তিন স্তরেই এখন প্রয়োজন গভীর আত্মসমালোচনা ও সক্রিয় পদক্ষেপ। নয়তো এ অস্থিরতার ধারাবাহিকতা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে একটি অনিরাপদ, নৈতিকতাহীন এবং মানবিকতাহীন সমাজ গড়ে তুলবে যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এখনই সময় নীরবতা ভাঙার, দায়িত্ব নেয়ার এবং একটি স্থিতিশীল সমাজের ভিত্তি গড়ার।
আমরা কী করতে পারি: এ অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রেই আত্মজিজ্ঞাসা এবং সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সমস্যাগুলোর উৎস যেমন বহুমুখী, তেমনি সমাধানও হতে হবে সমন্বিত ও কার্যকর। অস্থিরতা নিরসনে কিছু মৌলিক পথে অগ্রসর হওয়া এখন সময়ের দাবি।
প্রথমেই প্রয়োজন শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার বাধ্যতামূলক অন্তর্ভুক্তি। শিশুরা যেন ছোটবেলা থেকেই মানবিকতা, সহমর্মিতা, সহনশীলতা এবং দায়িত্ববোধের মতো গুণাবলিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, সেজন্য পাঠ্যসূচিতে নৈতিক শিক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়, বরং জীবনের অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিদ্যালয় যেন নৈতিক চরিত্র গঠনের কারিগর হয়ে ওঠে, শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতিস্থল না হয়।
শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি। প্রতিযোগিতামূলক অথচ চাপমুক্ত একটি শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরির পাশাপাশি দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার মাধ্যমে শ্রেণীবৈষম্য দূর না হলে সেটি বরং বৈষম্য আরো গভীর করে তুলবে এবং সমাজে ক্ষোভের জন্ম দেবে।
তারুণ্যের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাও অস্থিরতা রোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। বর্তমান যুগে স্কিল বেজড ট্রেনিং, উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি, স্টার্টআপ ফান্ড এবং ফ্রিল্যান্সিং বা রিমোট জবের সুযোগ বাড়াতে হবে। যুবসমাজের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তাদের উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপান্তর করতে না পারলে তারা হিংসা, হতাশা বা অপরাধের দিকে ঝুঁকবে—এটি শুধু ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রেরও ক্ষতি।
সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব, হিংসা ও উসকানিমূলক কনটেন্টের অবাধ প্রবাহ বন্ধে সরকারকে প্রযুক্তিনির্ভর আইন প্রয়োগ এবং গণসচেতনতা—এ দুই কৌশল একসঙ্গে নিতে হবে। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল লিটারেসির মাধ্যমে সচেতন করে তোলা, গঠনমূলক কনটেন্ট তৈরি ও উপভোগের সংস্কৃতি গড়ে তোলা এখন প্রয়োজন।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত আইনের প্রতি আস্থা ফিরবে না। পুলিশ, র্যাব কিংবা প্রশাসনের অন্যান্য সংস্থার সদস্যদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সততা, নিরপেক্ষতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রয়োগে পক্ষপাতমূলক আচরণ অস্থিরতাকে প্রশ্রয় দেয়, তাই শক্তিশালী অথচ ন্যায়নিষ্ঠ আইন প্রয়োগ জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সামাজিক উদ্যোগকে শক্তিশালী করা। মসজিদ-মন্দিরের ইমাম ও পুরোহিত, স্কুলের শিক্ষক, ক্লাবের সংগঠক কিংবা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সমাজ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের মাধ্যমে জনসচেতনতা গড়ে উঠলে হিংসা, গুজব, মাদক কিংবা অপরাধপ্রবণতা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। এ উদ্যোগ কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়, সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে এতে অংশ নিতে হবে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, সমস্যার গভীরতা যেমন মারাত্মক, তেমনি সমাধানের পথও দৃঢ় সংকল্প ও সঠিক পরিকল্পনায় সুগম হতে পারে। শুধু রাজনৈতিক দল বা প্রশাসনের হাতেই না রেখে, ব্যক্তি থেকে পরিবার, সমাজ থেকে রাষ্ট্র—সব স্তরের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে আমাদের এ অস্থিরতা থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে। এখনই সময়, আমরা সবাই মিলে প্রশ্ন করি—আমরা কি সত্যিই স্থিতিশীল, মানবিক ও নৈতিক সমাজ চাই? যদি উত্তর হয় ‘হ্যাঁ’, তাহলে আমাদের কাজ এখনই শুরু করা উচিত।
শেষকথা: সহনশীলতার ভিত্তিতে সুস্থ সমাজের নির্মাণ
একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়, যখন তার মানুষ কেবল প্রযুক্তিতে নয়—নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধেও সমৃদ্ধ হয়। উন্নয়ন মানেই শুধু বড় বড় ভবন, সেতু, অর্থনৈতিক সূচকের ঊর্ধ্বগতি নয়—বরং তার মূলে রয়েছে সামাজিক স্থিতি, ন্যায়বিচার ও মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস।
আজকের সমাজে আমরা যে অসহিষ্ণুতা, সহিংসতা ও নৈতিক শূন্যতার বিস্তার দেখছি, তা কোনো দৈব চিত্র নয়—বরং বহু বছর ধরে জমে থাকা ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ। যদি এখনই আমাদের চিন্তার ও কর্মের অভিমুখ পরিবর্তন না করি, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের সন্তানরা এক ভয়ংকর অনিরাপদ, অবিচারপূর্ণ সমাজে বড় হবে—যেখানে মানবিক মূল্যবোধ কেবল পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে।
এখন সময় এসেছে নিজেদের আয়নায় দেখার, ভুলগুলো স্বীকার করে শুদ্ধির পথে হাঁটার। প্রয়োজন সবার সম্মিলিত প্রয়াসে একটি সহনশীল, শান্তিপূর্ণ এবং নৈতিকতায় ঋদ্ধ সমাজ গড়ে তোলার—যেখানে মানুষ হবে মানুষের বন্ধু, প্রতিযোগিতা হবে সদ্বুদ্ধির আর উন্নয়ন হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই।
শান্তি কখনো হিংসার পরিণতি হতে পারে না—তা জন্ম নেয় সহমর্মিতা, সংযম ও দায়িত্বশীলতার ভেতর থেকে। সেই চর্চা আমাদের ঘর থেকে শুরু হোক এবং প্রসারিত হোক রাষ্ট্র পর্যন্ত। তবেই সম্ভব, এ অস্থির সময়ের মাঝে নতুন এক আশার আলো জ্বালানো।
অধ্যাপক ড. মো. আবদুল জলিল: ডিন, ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্স এবং ফ্যাকাল্টি অব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি)










