গত তিনটি নির্বাচনের যে অভিজ্ঞতা, তার নিরিখে বহুদিন মানুষ ভেবেছিল এ দেশে আর কখনো হয়তো ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ মিলবে না। সে ধারা থেকে বেরিয়ে যখন রাজনৈতিক শক্তির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলো, তখন আবার নতুন করে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হয়। এবারের ভোটের ফল আমাদের নতুন করে আত্মবিশ্বাস দিল যে এ দেশের রাজনীতি শুধু প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে চলে না, মানুষের অনুভূতিও এটাকে চালায়। এটি মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্র আর সমাজ এক নয়। তবে এখনই আত্মতৃপ্ত হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এ নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামোয় উত্তরণের সুযোগ পেয়েছি। এখনো সামনে অনেক পথচলা বাকি। বিষয়টি নবগঠিত বিএনপি সরকারও অনুধাবন করতে পেরেছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকার কাঠামোয় নিযুক্ত মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তিনি বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। নির্বাচনের আগে বিএনপির দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নিতে যাচ্ছে সরকার। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী কোন মন্ত্রণালয় কী কাজ করবে তার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনও দ্রুত জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এরই মধ্যে আমরা মন্ত্রীদের সংবাদ সম্মেলনে তাদের পরিকল্পনা ভাবনার অনেকটুকুই জানতে পেরেছি। এসব পরিকল্পনায় বাজার তদারকি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থা, জননিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এমনকি শিক্ষা খাতেও আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। এসবই ইতিবাচক। তবে নতুন সরকারের সামনে সংকটও ভারি। রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সর্বোপরি প্রশাসনিক ক্ষেত্রের এ সংকটগুলোকে চিহ্নিত করা জরুরি। জরুরি গণতান্ত্রিক ও জনকল্যাণমুখী শাসন পরিচালনার স্বার্থে। এক্ষেত্রে সরকারের অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতাগুলোকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ১৭ ফেব্রুয়ারি বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দায়িত্ব নেয়ার সময় নতুন সরকারের ওপর ২৩ লাখ কোটি টাকার মতো ঋণের বোঝা পড়েছে। এছাড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে এ মুহূর্তে ৪০ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ঘাটতিও রয়েছে। একে শুরু হয়েছে রমজান। আবার দেশের বিভিন্ন অংশে সেচ মৌসুমও শুরু। সদ্য দায়িত্ব নেয়া সরকারের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ অর্থনীতির এ প্রভাবকগুলো সরাসরি জনজীবনের সঙ্গে জড়িত।

বলা যায়, গত দেড় বছরে দেশে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার তুলনায় রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে শঙ্কাই নানা গোষ্ঠীর মনে বেশি ছিল। দেশের অর্থনীতি ক্রমান্বয়ে নাজুক হওয়ায় এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিতিশীলতার কারণে সাধারণ মানুষ রাজনীতিবিমুখ হয়ে উঠেছিল। জননিরাপত্তা তো বটেই, প্রশাসনিক কাঠামোও নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছিল। এসব প্রতিবন্ধকতা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কারণ আমাদের দেশে যে মিশ্র অর্থনৈতিক কাঠামো বিদ্যমান, সেটি অর্থনীতিকেও নানাভাবে প্রভাবিত করে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে গতিশীল করার জন্য শাসন কাঠামোয় জনরায়ে নির্বাচিত রাজনৈতিক শক্তিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে নির্বাচনী সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের মধ্যে কিছু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। বাংলাদেশে নির্বাচন মূলত গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় উত্তরণের পথ। নির্ধারিত সময় পরপর দেশের মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করে তাদের আকাঙ্ক্ষার রায় দেন। কারণ দেশের মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেই ব্যাপক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তাই বিভিন্ন আসনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন অর্জন করেছে বিএনপি। তাই যখন শাসন কাঠামোর বিষয়টি আসে, তখন আমাদের বিএনপির কার্যক্রমের দিকেই বেশি মনোযোগ রাখতে হবে। কারণ অর্থনৈতিক যে সংকটগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয় সেগুলোর সমাধানের রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োগ করবে সরকার ও মন্ত্রিপরিষদ। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে সেগুলোকে বাস্তবায়নের কাজ করবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে জনপ্রশাসন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, আমলাতন্ত্র এমনকি বিভিন্ন খাতের অংশীজনদেরও এড়ানোর সুযোগ নেই। প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সরকার সমন্বয় করবে, যাতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ তৈরি হয়।

দেশের মানুষ আপাতত নতুন মন্ত্রিপরিষদের আগামী ১৮০ দিনের কর্মপদক্ষেপের বিষয়ে কৌতূহলী। এসবই গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। বিএনপির মন্ত্রিপরিষদে যোগ্যতার নিরিখে তিনজনকে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের নাম দেখেই পূর্বানুমান করা যাচ্ছে তারা কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেবেন। এছাড়া ১০ জনকে উপদেষ্টা হিসেবেও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এদিকে জনপ্রশাসনেও বড় রদবদলের প্রত্যাশা বেড়েছে। কিন্তু এ রদবদল অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভিন্ন। কারণ আমরা দেখেছি, গত তিনটি নির্বাচনের পর প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসনের অভাব থাকায় প্রশাসন মাথাভারি হয়ে উঠেছিল। প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে জনগণের এজন্যই দূরত্ব বেড়েছে। এ দূরত্ব বাড়ায় রাষ্ট্রের মধ্যকার অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোও অতীতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা রাখতে পারেনি। তবে এ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নানা তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী বাদেও নিবন্ধিত ৫১টি রাজনৈতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে মাত্র ১২টি নিবন্ধিত দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। অর্থাৎ এ দেড় বছরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থাকলেও রাজনৈতিক শক্তিগুলো জনরায়ের সম্ভাবনা বুঝতে পেরেছে। বিষয়টি বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বও বারবার বলছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদের প্রথম বৈঠক শেষে মন্ত্রীদের সংবাদ সম্মেলন দেখে অন্তত তা-ই মনে হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ পাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়টি। জানা গেছে, চলতি বছর ইসি সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন, উপনির্বাচন ও স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচন আয়োজনে ব্যস্ত সময় পার করবে। এ নির্বাচনগুলো আয়োজনের বিষয়ে সরকারও শক্তিশালী অবস্থান রাখার আশ্বাস দিয়েছে। এ সবই ইতিবাচক।

বলে নেয়া ভালো, অতীতে অনেকের মধ্যে এমন একটি ধারণা গড়ে উঠেছিল, রাজনীতি শুধু প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে চলে। ফলে রাজনৈতিক দল তো বটেই, জনপ্রশাসনের সঙ্গেও সাধারণ মানুষের ব্যাপক দূরত্ব তৈরি হয়। কিন্তু সে ধারা থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের পর। ছাত্র-জনতার এ আন্দোলনের পর আমরা কর্তৃত্ববাদী শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্তি পাই। এরপর দেশের মানুষের মনে নতুন করে প্রত্যাশা বাড়ে। তারা ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক শক্তিকেই রাষ্ট্রক্ষমতায় দেখতে চেয়েছিল। দেশের মানুষের এ আকাঙ্ক্ষা রাজনৈতিক দলগুলো বুঝতে পেরেছে। বিএনপির বিজয় নানা কারণেই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। এখনো দেশের মানুষ মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শক্তির ওপরই আস্থা রাখে, এমনটিই ভোটের ফল দেখে প্রতীয়মান হয়েছে। এক্ষেত্রে বিএনপিকে নিয়ে সমালোচনাও যে নেই তা বলা যাবে না। তবে মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে দেখিয়েছে, এখনো দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি জনগণের অনুভূতি দিয়ে পরিচালিত হয়। অনুভূতি দিয়ে পরিচালিত হয় বলেই রাজনৈতিক দলগুলোকেও জনগণের চাহিদা বিবেচনা করেই পরিকল্পনা সাজাতে হয়।

নতুন সরকার হিসেবে বিএনপির সামনে এখনো অনেক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে এখন প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করার কাজটি বিএনপিকে করতে হবে। আমি অতীতে বহুবার বলেছি, জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচনটি আয়োজন করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচন আয়োজন সহজ হতো। স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচন আয়োজনের ঘাটতির দিকগুলো চিহ্নিত করা যেত। সেটি হয়নি বিধায় এ নিয়ে আলোচনা না করাই শ্রেয়। এ মুহূর্তে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকেও অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। কারণ তিনি একটি লিগাসিকে ধারণ করেন। পঁচাত্তরের পর তার পিতা সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কাজটি সম্পন্ন করেন। সেই বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতাকে বজায় রাখার কাজটি তারেক রহমানকে করতে হবে। কাজটি করার জন্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় করতে হবে। এসব রাতারাতি হবে না। তবে নির্বাচিত সরকারের প্রতিশ্রুত আগামী ১৮০ দিনের পরিকল্পনা ও কার্যক্রম দেখেও কিছু প্রাক্কলন করা যাবে।

দেশের অর্থনীতি এখন নাজুক অবস্থায় রয়েছে। বৈষম্য, জননিরাপত্তা, সামাজিক নানা ক্ষেত্রে অসংগতি, আর্থিক খাতে দুর্নীতি, ঋণখেলাপিদের দৌরাত্ম্য, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্য ইত্যাদি বিষয়ের নিরসনে চাই সুশাসন। গত কয়েক দশকে যারা রাজনীতিকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের দরুন জনগণ চাপে-তাপে আছে। দুর্নীতি দমন, রাজনৈতিক সংকট নিরসন এবং আদর্শ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা—এ তিনটি বিষয়ে কাজ করলে বিএনপির ভবিষ্যৎ আরো মসৃণ হবে। বিশেষত নির্বাচন কমিশনকে আরো শক্তিশালী করার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ বিএনপি সরকারের অধীনেই স্থানীয় সরকার কাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার নির্বাচন আয়োজিত হবে। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা অনেক, একই সঙ্গে সরকারের সামনে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জও। তবে সর্বাগ্রে নজর দিতে হবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার দিকে। অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়ানোর জন্য তাই জনকল্যাণমুখী আমলাতন্ত্র (সিভিল ব্যুরোক্রেসি) প্রতিষ্ঠার দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। যখন আমরা সিভিল ব্যুরোক্রেসি প্রতিষ্ঠা করব, তখন অর্থনৈতিক জটিলতা অনেক ক্ষেত্রেই দূর করা যাবে। এ মুহূর্তে তাই দেশের মানুষের প্রত্যাশার পারদ অনেক উঁচু। সে প্রত্যাশাকে নতুন সরকার কতটা পূরণ করতে পারবে তা আগামী কিছুদিনেই স্পষ্ট হবে।

ড. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ: স্থানীয় সরকার ও রাজনীতি বিশেষজ্ঞ; অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়