অথচ এলপিজি বিপণনসংশ্লিষ্টরা বলছে, এ মাসে এলপিজির আমদানি বাড়ায় পণ্যটির তীব্র সংকট নেই। কিন্তু বাজার থেকে এখন বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে বিধায় গেরস্থালির জীবনে সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এলপিজির বাড়তি দামের কারণে শুধু গেরস্থালিই সংকটে পড়েছে এমনটি নয়, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে নগরজীবনেও। হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সবাই এ সংকটের শিকার। সংকটে ভুগছে অটোগ্যাস স্টেশনগুলোও।
এলপিজির খুচরা পর্যায়ের কয়েকজন বিক্রেতার দাবি, সিলিন্ডারের দাম নিয়ে তাদের সঙ্গে গ্রাহকরা বাজারে প্রায়ই বিবাদে জড়াচ্ছেন। এজন্য তারা আপাতত এলপিজি বিক্রি করছেন না। আর তাতেই ভোগান্তিতে পড়ছেন লাখ লাখ গ্রাহক। আমরা জানি, রমজান মাসে বছরের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় সব পণ্যের চাহিদা থাকে বেশি। চাহিদা বেশি থাকলে এবং পর্যাপ্ত জোগান না থাকলে দাম বাড়বে, অর্থনীতির ধ্রুপদী তত্ত্ব অন্তত আমাদের তা-ই বলে। কিন্তু দাম বৃদ্ধি যদি অযৌক্তিক হারে হয় তাহলে পরিস্থিতি যেমন উদ্বেগের, তেমনি উৎকণ্ঠারও। গতকাল বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ মাসে ১ লাখ ৩০ হাজার টনের কাছাকাছি এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত হবে। দেশে এলপিজির চাহিদা ১ লাখ ২০ হাজার টন। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারিতে চাহিদা পূরণ করেও সংরক্ষণের সুযোগ মিলবে। পণ্যের সরবরাহ সংকট না থাকার পরও কেন ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজির কিনতে বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে, তা অনুসন্ধান করা জরুরি।
উন্নত বহু দেশে পাইপলাইনের মাধ্যমে এলপিজি সরবরাহ করা হয়। জ্বালানি অবকাঠামোর মাধ্যমে বিকল্প ব্যবস্থাও তাই নেয়া সহজ সেসব দেশের জন্য। কিন্তু আমরা এখনো সিলিন্ডারের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ করি। এলপিজি সরবরাহ অবকাঠামো নির্মাণে তাই আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। পুরনো পন্থায় এমন জনগুরুত্বপূর্ণ খাতকে পরিচালনা করলে নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন দুরূহ।
দীর্ঘদিনের অভিযোগ, দেশের এলপিজি খাতে ভর্তুকি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সুশাসন—এ তিনেরই অভাব রয়েছে। এর কারণ তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলো অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয় না। এও অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে বাজারে এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে যে তদারকি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তা ভেদ করাও কঠিন হয়ে ওঠে। বাজারের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কারসাজির মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অযৌক্তিক হারে পণ্যের দাম বাড়িয়ে থাকেন। অথচ এ মুহূর্তে দেশে এলপিজির প্রকৃত কোনো ঘাটতি নেই। বাজারে যে সংকট দেখা যাচ্ছে, তা অনেকাংশে কারসাজির ফল বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। নীতিনির্ধারণী ও তদারকি প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টদের দাবি, এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কাজ করছে। কিন্তু তার ইতিবাচক ফল কি মিলছে? উত্তরটি সুখকর নয়।
দেশে এলপিজি গ্যাস বিপণনের সুষ্ঠু অবকাঠামো নেই, এ অভিযোগ বহু পুরনো। উন্নত অনেক দেশে পাইপলাইনের মাধ্যমেই এলপিজি সরবরাহ করা হয়। পাইপলাইনের মাধ্যমে বিকল্প জ্বালানিও সরবরাহ করা যায়। কিন্তু দেশে এখনো সিলিন্ডারে এলপিজি বিক্রি করা হয়। এলপিজির নিজস্ব টার্মিনাল ও সংরক্ষণ অবকাঠামোও নেই। খাতটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠাননির্ভর হওয়ায় ভোক্তা পর্যায়ে সরাসরি বিক্রির সুযোগ সীমিত। এর সঙ্গে সমস্যা হিসেবে যুক্ত হয়েছে, বাজার নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা। তদারকির অভাব থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিক হারে পণ্যের দাম ও সরবরাহ নির্ধারণ করছেন। তাতে বিপাকে পড়ন ভোক্তারা।
একজন ব্যবসায়ী মুনাফা করবেন তাতে আমাদের আপত্তি নেই। আমরাও চাই ব্যবসায়ীরা যেন নিরাপদ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ পান। কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই জনজীবনে দুর্ভোগের কারণ না হয়, এ নৈতিক অবস্থানও আমরা ব্যবসায়ীদের কাছে প্রত্যাশা করি। আমরা এও মনে করি, এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ী, সরকার ও নিয়ন্ত্রক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অংশীজন—সবারই অংশগ্রহণ প্রয়োজন। জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর যে ধরনের কঠোর তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথা ছিল, তা মাঠপর্যায়ে অদৃশ্য। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নীরবতাও এখানে প্রশ্নবিদ্ধ বলে আমরা মনে করি।
আমরা মনে করি, এলপিজি বাড়তি দামে বিক্রি হওয়ার বিষয়টি তদারকি প্রতিষ্ঠানের বড় ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতার দায় সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষই এড়াতে পারেন না। আমরা দেখেছি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেশন কমিশনের (বিইআরসি) তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুধু কাগজে-কলমে দাম নির্ধারণের গৎবাঁধা দায়িত্ব পালন করে থাকে। কিন্তু সেই দাম বাজারে কার্যকর হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করে বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ বা সক্ষমতা কোনোটিই দৃশ্যমান হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিঠি দিয়ে দায় সারে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। এ অবস্থার পরিবর্তন আনা জরুরি। তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু দাম নির্ধারণ করবে না। প্রতিষ্ঠানগুলো যেন প্রকৃতপক্ষেই দাম নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে সে বিষয়ে মনোযোগ বাড়াতে হবে। বাজারে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যেন অপতৎপরতা চালাতে না পারে সেজন্য সাঁড়াশি অভিযান চালাতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, তদারকি প্রতিষ্ঠান বিইআরসি, ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় করে এসব অভিযান পরিচালনা করা যেতে পারে। যে অসাধু ব্যবসায়ী নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করছেন তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার অচিরেই ভোক্তার ভোগান্তি দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।









