সমগ্র জাতির জন্য খুবই শোকের দিন। আমরা আমাদের সবার নেত্রীকে হারিয়েছি। দেশের জন্য, মানুষের জন্য তার যে অবদান, তা অল্প কথায় বর্ণনা করা সম্ভব না। তার সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এ সুবাদে তার কাছ থেকে অনেক উপদেশ ও দিকনির্দেশনা পেয়েছি। অনেক কিছুই শিখেছি। সরকারপ্রধান হিসেবে খালেদা জিয়া ছিলেন অদ্বিতীয়া। একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে যেসব গুণাগুণ থাকা দরকার, তার সবই ছিল। তার প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টি ছিল অতুলনীয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় তার সৃজনশীলতা ও আত্মনির্ভরশীলতা ছিল। তাকে হারিয়ে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।

প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা হিসেবে আমি দেখেছি, তিনি সবসময় কিছু বিষয়ের দিকে খুবই দৃষ্টি দিতেন। যেহেতু আমি অর্থ সচিব ছিলাম, অর্থ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তার সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। আমার চার বছরের দায়িত্বকালে দেখেছি, তিনি সব সময় চেয়েছিলেন বাংলাদেশ আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠুক। পরনির্ভরশীলতা তিনি পছন্দ করতেন না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুযোগে যাতে কোনো বৈষম্য না থাকে, সেটিও তিনি হৃদয় দিয়ে চাইতেন।

আমরা যখন বাজেট প্রণয়ন করতাম, তখন প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে মিটিংয়ে আমাকে নিয়ে যেতেন। মিটিংয়ে খালেদা জিয়া অনেক কারিগরি বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। তার প্রশ্ন ও পরামর্শ শুনে আমরা আশ্চর্য হতাম। তিনি অনেক অভিজ্ঞ ছিলেন। বাজেট নিয়ে তিনি সময়োপযোগী পরামর্শ দিতেন। বিস্তর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা না থাকলে তিনি এ ধরনের পরামর্শ দিতে পারতেন না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে উন্নতির যে ধারা তার শাসনামলে শুরু হয়েছিল, সেটি পরবর্তী সময়ে আমরা সেভাবে চালাতে পারিনি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে প্রথম সুযোগগুলো তৈরি করে দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে কী রেখেছি, সে বিষয়ে বারবার জানতে চাইতেন। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অর্থ কোথায় কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে ও কীভাবে খরচ হবে—সব বিষয়ে খোঁজখবর রাখতেন। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো যায় কিনা, সে বিষয়ে পরামর্শ নিতেন ও খেয়াল রাখতেন।

আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে আমাদের গড়ে তুলতে খালেদা জিয়া বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছিলেন। সেসব সংস্কারের ফল এখন আমরা পাচ্ছি। শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর খাতে সংস্কারের প্রভাবগুলো সুদূরপ্রসারী হয়েছে।

বেগম জিয়ার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তার সততা ও দেশপ্রেম। তিনি শুনতেন বেশি, বলতেন কম। মাঝে মাঝে আমরা ভাবতাম, আমরা বোধ হয় সবকিছু বলে ফেলছি। কিন্তু তারপর দুই-এক সময় তিনি এমন প্রশ্ন করতেন যে আমাদের ফিরে গিয়ে আবার ওই প্রশ্নের জবাব তৈরি করতে হতো। তার প্রশ্নের ধরন ও জানার আগ্রহ আমাদের বিস্মিত করত। অনেক জটিল বিষয়ে তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। যতদিন আমি তার সঙ্গে কাজ করেছি, তিনি কখনো গোষ্ঠীস্বার্থে বা ব্যক্তিস্বার্থে কোনো সিদ্ধান্ত দিতেন না। তিনি সবসময় এসব স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে কাজ করেছেন।

ব্যক্তিগত সততা ও দৃঢ় দেশপ্রেমের পাশাপাশি নৈতিকতা ছিল তার সবচেয়ে বড় গুণ। তার নৈতিকতার দৃষ্টান্ত দেখে যে কেউ মুগ্ধ হয়ে যেত। আমরা যদি তার কর্মময় জীবন, তার দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ ও আদর্শবোধ থেকে শিক্ষা নিই, বাংলাদেশপন্থী নীতি গ্রহণ করি, তাহলে বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাব। বেগম জিয়ার প্রয়াণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে, তা দীর্ঘদিন পূরণ হওয়ার নয়।

জাকির আহমেদ খান: পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান; সাবেক অর্থ সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান