সম্প্রতি অমর একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বাংলা ভাষার প্রচার-প্রসার ও সংকট ঘিরে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা
ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট বিচারে বর্তমানে বাংলা ভাষার অবস্থান বা পরিস্থিতি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট কী ছিল, কিংবা পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এই আন্দোলন অনিবার্য হয়ে উঠল কেন, এগুলো আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংখ্যাগুরু মানুষের মুখের ভাষা ছিল বাংলা। ফলে, বাংলার পক্ষে দাবি তো অযৌক্তিক ছিল না। কিন্তু সেটা শাসকগোষ্ঠী সহজে মেনে নিতে চায়নি, তাদেরকে মেনে নিতে বাধ্য করতে হয়েছে। তাছাড়া নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হয়; তারা লক্ষ করে, উর্দু আর ইংরেজির যদি একতরফা অধিকার থাকে, তবে চাকরির বাজারে তারা পিছিয়ে পড়বে। ফলে অর্থনৈতিক অধিকারের প্রশ্নেও এই আন্দোলন অনিবার্য ছিল। ভাষা আন্দোলন পূর্ববাংলার বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে জাতিগত মর্যাদাবোধ তৈরি করে। আর এ আন্দোলনের সফলতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছে।
কিন্তু বাংলা ভাষার বর্তমান অবস্থা নিয়ে কি আপনি সন্তুষ্ট?
১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়া হয়। কিন্তু ওই স্বীকৃতি পর্যন্তই। তখন এর সঙ্গে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, পরের দুই দশকে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রের ব্যবহার-উপযোগী করে তোলার জন্য ‘উন্নয়ন’ করতে হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬২ সালে কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হলো। এখান থেকে বাংলা পরিভাষার কাজ শুরু হলো, উচ্চস্তরের বাংলা পাঠ্যপুস্তক তৈরি হতে লাগল। কিন্তু তারপর? তারপর থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাংলাদেশ পর্বে এমন বিশেষ কিছু হয়নি যা দেখে সন্তুষ্ট হওয়া যায়।
‘বিশেষ’ বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন?
আমরা বলি সর্বস্তরে বাংলা চাই। ভালো কথা। কিন্তু সেজন্য কি কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে? আদালতে কেমন করে বাংলার ব্যবহার হবে, যখন ছাত্ররা আইন পড়ে ইংরেজিতে? সরকারি কাজকর্মেও তো বাংলা সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও ইংরেজিই এখন শিক্ষকের ক্লাস লেকচার আর শিক্ষার্থীর উত্তর লেখার মাধ্যম।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শব্দের ব্যবহার বেড়েছে। যেমন ন্যায়বিচারের পরিবর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে ইনসাফ। বিপ্লবের পরিবর্তে ইনকিলাব। একটি আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য আন্দোলন থেকে বিদেশী ভাষার শব্দের এরূপ প্রচার-প্রসার কি বাংলার চর্চায় বড় পরিবর্তন আনবে আগামীতে?
ভবিষ্যতে বাংলা ভাষার ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সেটা এখানে আলোচনা করা কঠিন। তবে সাম্প্রতিক ভাষা ব্যবহারের যে প্রসঙ্গ আপনি তুললেন, সেটা যতটা না ভাষার সমস্যা, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষের সমস্যা। শব্দের ‘ইসলামাইজেশন’ ঘটার সুযোগ তো রাজনীতির মধ্যেই করে রাখা হয়েছিল। এতদিন দাড়ি-টুপি আর ইসলামকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে রাখা হয়েছিল। এখন সেই সংকুচিত পক্ষ কিছু বিশেষ শব্দ ব্যবহার করে নিজের ভাষা তৈরি করতে চাচ্ছে। আসলে, আগের বিভাজন-প্রক্রিয়া যেমন ভালো ছিল না, তেমনি নতুন বিভাজনের রাজনীতিও ভালো ফল দেবে না। এগুলো হিংসা-আর প্রতিহিংসার ভাষাই তৈরি করে।
বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৩০ কোটির বেশি মানুষ বাংলায় কথা বলেন। এর পরও কি আগামীতে অন্য ভাষার প্রভাবে বাংলার অস্তিত্ব ঝুঁকিতে পড়তে পারে, বিশেষ করে ইংরেজির প্রভাবে, যার ব্যবহার ও চর্চা ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে ও বেড়ে চলেছে?
ইংরেজি ভাষার প্রভাব ও আধিপত্যের কাছে পৃথিবীর ছোট-বড় সব ভাষাই শঙ্কার মধ্যে পড়েছে। তবে লক্ষ করুন, বাংলা ভাষা প্রায় দুশো বছর ব্রিটিশ উপনিবেশের মধ্যেও টিকে ছিল। বাংলাভাষী বিপুল জনগোষ্ঠী এবং আমাদের বিস্তৃত সাহিত্যভাণ্ডার আমাদের শক্তি জুগিয়েছে। এজন্য আত্মতৃপ্তিতে ভুগলে হবে না। ভবিষ্যতের জন্য বাংলা ভাষাকে প্রস্তুত করতে হবে। এখন করার কাজ মোটা দাগে দুইটা। প্রথমত, ডিজিটাল ও অনলাইন মাধ্যমে বাংলা ভাষার ব্যবহার-যোগ্যতা বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষার সুযোগ বাড়াতে উদ্যোগ নেয়া।
এ উদ্যোগ কে নেবে?
অবশ্যই সরকারিভাবেই নিতে হবে।
অন্য ভাষার আধিপত্যের বাইরে বাংলা ভাষার প্রচার-প্রসারে আর কী কী চ্যালেঞ্জ দেখছেন?
চ্যালেঞ্জ তো অনেক। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, ভাষা নিয়ে কাজ করার মতো পণ্ডিত লোক নেই। এখন ভাষাদক্ষ কোনো প্রজন্মও তৈরি করতে পারছি না আমরা। স্কুল পর্যায় থেকেই দেখুন, বাংলা বই ঠিকমতো বাংলা পড়তে, লিখতে শেখায় না। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দেখুন, বাংলা বিভাগগুলোয় ভাষা বিষয়ক কোর্স নেই। নিজের মতো করে কেউ কেউ বাংলা ভাষায় সাধারণ দক্ষতা অর্জন করছে। প্রাতিষ্ঠানিক বা একাডেমিক কোনো উদ্যোগ নেই।
সাহিত্য ভাষার প্রচার-প্রসারে সহায়তা করে। বাংলাদেশের বেশির ভাগ লেখক ও প্রকাশকের মধ্যে একুশে বইমেলাকেন্দ্রিক সাহিত্যকর্ম প্রকাশের প্রবণতা দেখা যায়। এ বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
মাসজুড়ে যদি বাড়তি বই কেনাবেচা হয়, তাতে সমস্যা দেখি না। ধারাবাহিক ও নিয়মিত উদ্যোগ যদি কিছু নিতে হয়, সেটি সরকারিভাবেই নিতে হবে। তার জন্য বাজেটেও বরাদ্দ রাখতে হবে।
বাংলা একাডেমি অমর একুশে বইমেলার বাইরে আর কী করতে পারে, যা বাংলা ভাষার প্রসারে বা উৎকর্ষে ভূমিকা রাখতে পারে?
বইমেলার সূত্রে সবাই বাংলা একাডেমিকে চেনে। কিন্তু বইমেলা করা এটা তো বাংলা একাডেমির মূল কাজ নয়। বাংলা একাডেমিকে ভাষা গবেষণাতেই মনোযোগ দিতে হবে, যদি বাংলা ভাষার প্রসার আমরা চাই। অনতিবিলম্বে বাংলা একাডেমির সব অভিধান ডিজিটাল করা দরকার। বাংলা একাডেমি পুরনো পুঁথি নিয়ে কাজ শুরু করেছে। ভাষা, উপভাষা, সাহিত্য, লোকসাহিত্য, পুরনো সাহিত্য ইত্যাদি নিয়ে বৃহৎ পরিসরে পরিকল্পনা করেই উদ্যোগ নিতে হবে।... বাংলা একাডেমিতে রাজনীতি ঢুকে গেছে বেশি, এটাকে রাজনীতি মুক্তও করা দরকার।
বর্তমানে ইংরেজির পাশাপাশি হিন্দি, তুর্কি এসব ভাষার চর্চার প্রসারে বড় ভূমিকা রেখেছে সিনেমা, নাটক, সিরিজ ইত্যাদি। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বাংলা ভাষার প্রযোজনা কি বাংলার প্রচার-প্রসারে সহায়ক হতে পারে?
অবশ্যই পারে। হিন্দি, তুর্কি, ইরানি, ইংরেজি, আরবি, কোরিয়ান এসব নাটক, সিরিজ, মুভি মানুষ কেন দেখছে? সেগুলো ভালো হচ্ছে বলেই তো দেখছে। আপনিও বাংলা ভালো মুভি বানান, সারা পৃথিবীর মানুষ দেখবে। ভাষার বিস্তার বা আধিপত্য সরাসরি কেবল ভাষা দিয়ে হয় না। এ কারণেই একটি দেশে মুক্ত সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ ও পরিবেশ রাখতে হয়।
সামগ্রিকভাবে বাংলা ভাষা চর্চা ও ব্যবহারকে আরো সুসংহত করা যায় কীভাবে?
ওই যে বললাম দুটি উদ্যোগের কথা—ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাকে রূপান্তর করুন, আর মেডিকেল-ইঞ্জিনিয়ারিংসহ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার ব্যবহার বাড়ান। উচ্চশিক্ষায় বাংলা পাঠ্যবই দরকার, ক্লাসলেকচার বাংলায় দরকার; এগুলো করা হলে শিক্ষার্থীরাও পরীক্ষার খাতায় বাংলায় লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। এছাড়া বাংলা ভাষার ডিজিটাইজেশন গুরুত্বপূর্ণ। এর আওতা বাড়ানো সম্ভব হলে ভয়েস টু টেক্সট, টেক্সট টু ভয়েস, অনুবাদ, অভিধান ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার সহজ হবে। ...কী বলব, মানুষ কেন কাগজের বই পড়ে না, এটা নিয়ে এখনো কথা বলে যাচ্ছি আমরা! এখন তো প্রকাশকদের উচিত বই বিক্রি না করে ডিজিটাল বুক-রিডার বিক্রি করা, যেখানে তার প্রকাশনীর ১০০টা বই বিনামূল্যে থাকবে। এছাড়া অনলাইনে ন্যূনতম টাকা পরিশোধ করে পাঠক নতুন নতুন বই পড়ার সুযোগ পাবে।









