বাংলাদেশও সেই ক্ষয়ের মাঝপথে দাঁড়িয়ে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন এক্ষেত্রে একটি বৈজ্ঞানিক দলিলই নয়, জরুরি সতর্কসংকেতও। এসআরডিআই সম্প্রতি দেশের ৫০টি উপজেলার প্রায় ২৯ হাজার মাটির নমুনা বিশ্লেষণ করেছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, পর্যবেক্ষণে দেশের কৃষিজমির প্রায় ৪০ শতাংশ তীব্র অম্লীয়তায় আক্রান্ত; ৫৮ শতাংশের বেশি জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বিপজ্জনকভাবে কম। এছাড়া ৭৩ শতাংশেরও বেশি কৃষিজমিতে নাইট্রোজেন সংকট, ৪৩ শতাংশে সালফারের ঘাটতি এবং প্রায় ৩৪ শতাংশে জিংকের অভাব। অম্লীয় মাটি ও জৈব পদার্থের অনুপস্থিতি তাই সামগ্রিকভাবে কৃষি সংকট। কারণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সিলেটের ৭৭ শতাংশ জমি তীব্র বা অত্যন্ত তীব্র অম্লীয়। রংপুরে তা ৬৭ শতাংশ। এ দুই বিভাগই দেশের চাল ও চা উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে ভবিষ্যৎ কৃষি উৎপাদনের কথা বিবেচনা করে কৃষিজমির উর্বরতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বিজ্ঞানসম্মত ও জাতীয় নীতিমালা তৈরি করার বিষয়টিকে জোর দিতে হবে।

অম্লীয় মাটির সমস্যার মূলে রয়েছে রাসায়নিক সারনির্ভর উচ্চ ফলনের পেছনে ছোটা। অতিরিক্ত ইউরিয়া ও সালফার সার ব্যবহার এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে ক্ষারীয় উপাদানের অপচয় মাটির অম্লতার মূল কারণ। তবে এ সমস্যা বাংলাদেশের একার নয়। বিশ্বের অধিকাংশ কৃষি অর্থনীতিনির্ভর দেশের জন্যই এটি বড় সমস্যা। এক্ষেত্রে চীন সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক উদাহরণ। কৃষিজমিতে মাত্রাতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার ব্যবহার করায় ১৯৮০-২০০০ সালের মধ্যে চীনের কৃষিজমির পিএইচ গড়ে শূন্য দশমিক ৫ ইউনিট কমে যায়। পরবর্তী সময়ে বেইজিং ‘মৃত্তিকা দূষণ কার্যপরিকল্পনা ২০২৬’ ঘোষণা করে। এর আওতায় জৈব সারে ভর্তুকি এবং প্রত্যেক গ্রামীণ অঞ্চলে মাটি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। এক দশকের মধ্যে চীনের কৃষিজমিগুলোর উর্বরতা ও উৎপাদন আগের অবস্থায় ফিরতে শুরু করে। জাপান অবশ্য আরো আগেই বিষয়টি অনুধাবন করেছে। ১৯৫০ সালে দেশটি ভূমি সংরক্ষণ আইনের পর ‘বোকাশি’ পদ্ধতির জৈব সার ব্যবহার ও মাটি স্বাস্থ্য কার্ড ব্যবস্থা চালু করে। কৃষকদের মৃত্তিকা পরিচর্যার উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এভাবে দেশটি সীমিত চাষযোগ্য জমিতেও উচ্চ উৎপাদনশীলতা ধরে রেখেছে। ভারতেও সয়েল কার্ড কর্মসূচি রয়েছে। ১৪ কোটি কৃষককে মাটির পুষ্টি পরিস্থিতি জানিয়ে কার্ড দেয়া হয়েছে, যাতে কৃষক ঠিক কতটুকু কী সার দেবেন, তা বুঝতে পারেন। এ কর্মসূচির ফলে অপ্রয়োজনীয় সার ব্যবহার কমেছে এবং উৎপাদন খরচ হ্রাস পেয়েছে।

কৃষিজমিতে অনিয়ন্ত্রিত সার প্রয়োগের ফলে সারের কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন ফলন কম হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বেড়ে কৃষকের কাঙ্ক্ষিত লাভ তো হচ্ছেই না, অনেক ক্ষেত্রেই লোকসানের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ফসফরাস অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রয়োগের ফলে ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ফলন কমতে পারে। সুতরাং কৃষি খাতের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে মাটির গুণাগুণ ধরে রাখা অতি জরুরি। এজন্য দরকার টেকসই মাটির উর্বরতা ব্যবস্থাপনা। উন্নত দেশগুলো মাটির উর্বরতা সঠিক রাখতে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিলেও তা থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। বিশ্বের অনেক জায়গায় মাটির উর্বরতা ধরে রাখার জন্য জমিকে পতিত রেখে বিশ্রাম দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে একদিকে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কম, অন্যদিকে অধিক জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ করা কষ্টসাধ্য বিধায় ভৌগোলিক এবং আবহাওয়াগত সমস্যা ছাড়া জমিকে বিশ্রাম দেয়া সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের জন্য মাটির উর্বরতার পরিস্থিতি বিশেষভাবে কঠিন। মাথাপিছু কৃষিজমির পরিমাণ এরই মধ্যে বিশ্বে সবচেয়ে কম দেশগুলোর মধ্যে একটি। প্রতি বছর নগরায়ণ ও শিল্পায়নে হারাচ্ছে কয়েক হাজার হেক্টর কৃষিজমি। এ অবস্থায় যতটুকু জমি আছে, তার উর্বরতাই আমাদের খাদ্যের একমাত্র ভরসা। একটি জমিতে বছরে তিন-চারটি ফসল ফলানো হচ্ছে, যা মাটির পুনরুদ্ধারের সুযোগ দিচ্ছে না। ক্ষুদ্র কৃষকরা স্বল্পমেয়াদি ফলনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘমেয়াদি মাটির ক্ষতির পথে হাঁটছেন। অনেকটা জমি থেকে ঋণ নিয়ে শোধ না করার মতো। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে উপযুক্ত নীতিমালা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রবর্তন জরুরি। কৃষিবিদদের অভিমত, মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণেও অম্লীয় মাটি বেড়ে চলেছে। দেশে সারের চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ হয় আমদানির মাধ্যমে। আমদানি করা রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় সার কারখানাগুলোর উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষত জৈব ও মাটিবান্ধব সার উৎপাদনের জন্য সরকারি প্রণোদনা বাড়ানো জরুরি। সার আমদানিতে সরকার এমনিতেই প্রচুর অর্থ ভর্তুকি দিয়ে থাকে। বৈশ্বিক বাস্তবতায় এ আমদানিনির্ভরতা এড়িয়ে আমাদের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে জোর দিতে হবে। এক্ষেত্রে সার সরবরাহে সংশ্লিষ্টদের অনিয়ম-দুর্নীতিরও অভিযোগ রয়েছে। সেগুলো খতিয়ে দেখে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।

কৃষক ও কৃষির স্বার্থ রক্ষায় সরকার এরই মধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে কৃষি কার্ড অন্তর্ভুক্ত। কৃষি কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের আর্থিক সহযোগিতা দেয়ার পাশাপাশি ভারতের আদলে সয়েল হেলথ কার্ডের সুবিধা দেয়া যেতে পারে। প্রতি ইউনিয়নে মাটি পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি জাতীয় মৃত্তিকা স্বাস্থ্য কর্মসূচিকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। মাঠপর্যায়ের গবেষণা, নিরীক্ষণ বাড়াতে এসআরডিআইয়ের কার্যপরিধি ও জনবল বিস্তার করাও জরুরি। গবেষকদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতি তিন বছরে হেক্টরপ্রতি এক টন চুন প্রয়োগ মাটির অম্লতা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। এ চুন কেনার জন্য দরিদ্র কৃষকদের সরাসরি ভর্তুকি এবং সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। গোবর সার, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ও ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারে কর প্রণোদনা এবং রাসায়নিক সার ব্যবহারে স্তরভিত্তিক শুল্ক আরোপ বিবেচনা করা যেতে পারে। ধান কাটার পর খড় জমিতে পচানোর সংস্কৃতি কৃষক পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে প্রচারাভিযান বাড়াতে হবে। চীন ও জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (ব্রি) বায়োচার গবেষণায় বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে। কৃষিজমি রক্ষার জন্যও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া জরুরি। নগরায়ণ ও শিল্পায়নে কৃষিজমি হ্রাস বন্ধে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং ‘ভূমি ব্যবহার জোনিং’ নীতিমালার দ্রুত বাস্তবায়ন ছাড়া মাটি রক্ষার সব প্রয়াস অর্থহীন হয়ে পড়বে। এ মুহূর্তে রাসায়নিক সার আমদানির ক্ষেত্রেও সংযত হতে হবে। তার বিকল্প হিসেবে জৈব ও আধুনিক পন্থায় উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে জোর দিতে হবে। মৃত্তিকা স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে এখন থেকেই যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়নে মনোযোগ বাড়াতে হবে।