এ চাপ আরো বেড়ে যায় যখন প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন করা হয় বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে। তখন ঋণের পাশাপাশি সুদও পরিশোধ করতে হয়। দুঃখজনকভাবে দেশের বেশির ভাগ মেগা প্রকল্প বর্তমানে বোঝা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। এর পেছনে বড় দায় রয়েছে অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির। এ কারণে দেশে বাস্তবায়িত মেগা প্রকল্পের মোট ব্যয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশই অপচয় হচ্ছে বলে সম্প্রতি চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের এক গবেষণায়ও উঠে এসেছে।
দেশে বাস্তবায়ন করা হয়েছে বা কাজ চলমান রয়েছে এমন মেগা প্রকল্পের সিংহভাই নেয়া হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে। প্রকল্পগুলোর বেশির ভাগের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে কেবল। তাতে জনজীবনের প্রতিফলন কদাচিৎ পাওয়া যায়। এগুলো অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক নয়। বরং এ সরকারের সময় উন্নয়ন প্রকল্পের নামে প্রায় পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকা অপচয় বা নষ্ট হয়েছে। আর এ সময় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাধ্যমে খরচ করা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, যার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত তছরুপ করা হয়েছে বলে সদ্য বিদায়ী সরকার প্রণীত অর্থনীতিবিষয়ক শ্বেতপত্রে উল্লেখ রয়েছে। মূলত রাজনৈতিক চাঁদাবাজি, ঘুস এবং বাড়তি খরচ দেখিয়ে বিপুল অংকের টাকা লোপাট করা হয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রের উন্নয়নের নামে নেয়া হলেও এসব প্রকল্প হয়ে উঠেছিল দুর্নীতি ও লুটপাটের অন্যতম মাধ্যম। প্রাক্কলিত বাজেটের বেশি অর্থ ব্যয় ও মেয়াদ বাড়িয়ে পরিকল্পিতভাবে দুর্নীতি করা হয়েছে অভিযোগ রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতির পাশাপাশি প্রকল্প পরিকল্পনা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ত্রুটি, জমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতার অভাব, ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, বাস্তবায়নে বিলম্ব প্রভৃতি কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নেও বাড়তি ব্যয় হয়েছে। অন্যদিকে অনেক প্রকল্প আশানুরূপ ফল বয়ে আনতে পারেনি। উল্টো জনবিমুখ ও ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলো দেশের অর্থনীতির জন্য কালক্রমে বিষফোড়ায় পরিণত হয়েছে। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অভাবে প্রকল্পগুলো আর্থিক লোকসানের কারণ হয়ে উঠেছে এবং অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে।
এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তী সরকার ওই সরকারের আমলে নেয়া প্রকল্পগুলোর পুনর্মূল্যায়ন করবে এবং জনবিমুখ ও ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়াবে। পাশাপাশি তারা মেগা প্রকল্পের পথে হাঁটবে না। এমনকি এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার আশ্বস্তও করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিগত প্রকল্পগুলো ঘিরে কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ নিতে পারেনি। উল্টো এ সরকারের মেয়াদের শেষ সময়েও এমন কিছু প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যেগুলো মেগা প্রকল্প ঘিরে থাকা পুরনো বিতর্ক ফের সামনে এনেছে। এক্ষেত্রে ‘ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্প একটি উদাহরণ মাত্র।
অন্তর্বর্তী সরকারের সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দের শেষ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৪৫ হাজার ১৯১ কোটি ২৭ লাখ টাকার ২৫টি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে বরাদ্দের অর্থায়নে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১০ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা, প্রকল্প ঋণ ৩২ হাজার ১৮ কোটি এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ২ হাজার ২৯১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। আর অনুমোদিত প্রকল্পের মধ্যে নতুন প্রকল্প ছিল ১৪টি, সংশোধিত প্রকল্প ছয়টি ও মেয়াদ বৃদ্ধি প্রকল্প পাঁচটি।
এমন পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারের উচিত অনুমোদিত সব প্রকল্পের পুনর্মূল্যায়ন করা। প্রকল্পগুলোর ব্যয়সহ পুরো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন। এতে তারা প্রকল্পগুলো সাশ্রয়ী করতে পারবে। এছাড়া ভবিষ্যতে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের অনেক ত্রুটি এড়ানো সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা যেতে পারে। কারণ দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। এছাড়া খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, প্রায় সব মেগা প্রকল্প বিদেশী পরামর্শক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তাই নিরীক্ষার কাজও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কোনো নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন। জনগণের কর ও বৈদেশিক ঋণে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর অনিয়ম-অপচয় তদন্তের উদ্যোগ না নেয়া হলে এগুলোর দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যাবে না। সেই সঙ্গে এগুলোকে আর্থসামাজিকভাবে লাভবানও করা কঠিন হয়ে উঠবে।
অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ ও দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রকল্প কীভাবে ব্যয় সাশ্রয়ী ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা যাবে, সেগুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে।
উন্নয়নের নামে অর্থ অপচয়, দুর্নীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। নজরদারি ও মূল্যায়নের অভাবে দেশের প্রায় প্রতিটি খাতেই দুর্নীতির বহুমুখী চর্চা হয়েছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় না আনাসহ প্রশাসনে জবাবদিহি না থাকায় দুর্নীতির বিস্তার রোধ করা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার এক বছরে বেসরকারি ব্যাংক, আর্থিক খাতের অলিগার্কসহ বেসরকারি খাতের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত ও নিরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে বিদ্যমান মেগা প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে যথাচিত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। উল্টো তারাও বিভিন্ন বিতর্কিত প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। বর্তমানে নির্বাচিত সরকাকে বিদ্যমান সব প্রকল্পের পুনর্মূল্যায়ন করা সমীচীন হবে। আর ভবিষ্যতে কোনো প্রকল্প অনুমোদনের আগে অবশ্যই বাস্তব চাহিদা ও সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে।









