ড. বদিউল আলম মজুমদার, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য। ছিলেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান। ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ (সুজন)-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তিনি একজন অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন কর্মী, রাজনীতি বিশ্লেষক, স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ। অতীতে ‘দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট’-এর গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। সংস্কার কমিশনে কাজের অভিজ্ঞতা, আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি মূল্যায়নসহ সাম্প্রতিক রাজনীতির নানা প্রশ্ন নিয়ে কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা

দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে আপনি কাজ করেছেন। শুরুতেই জানতে চাই এ কমিশনের সার্বিক কাজ নিয়ে আপনি কতটা সন্তুষ্ট?

আমি সন্তুষ্ট। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ছিলাম আমরা আটজন। তিন মাস আমরা সবাই কঠোর পরিশ্রম করেছি। দেশের একজন জ্যেষ্ঠ নাগরিক হিসেবে আমি জীবনে অনেক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। কিন্তু এ কমিশনে কাজ করা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অ্যাসাইনমেন্ট। কারণ একজন ব্যক্তির জীবনে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে পরিশীলিত করে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ সুগম করার সুযোগ পাওয়ার মতো ঘটনা খুব কমই ঘটে। তাই এ দায়িত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে আমরা মনে করেছি। এ কমিশনে যেমন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ ছিলেন, নবীনও ছিলেন। তরুণ-প্রবীণের সমন্বয়ে আমরা কাজ করেছি। কঠোর পরিশ্রম করেছি। সারা দেশ থেকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি এবং অংশীজনের মতামত নিয়েছি। আশা করি, মতামতের ভিত্তিতে যে সুপারিশগুলো করেছি সেগুলো বাস্তবায়ন হলে নির্বাচন ব্যবস্থা আরো পরিশীলিত ও পরিচ্ছন্ন হবে। এর মাধ্যমে আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ প্রশস্ত হবে।

যেসব সুপারিশ করা হয়েছে তার অনেকগুলো নিয়ে নানা ধরনের মতানৈক্য রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কতটুকু দেখছেন?

অনেকগুলো সুপারিশ বাস্তবায়নের ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত। আমরা কয়েকশ সুপারিশ উত্থাপন করেছি। এ সুপারিশগুলো দুইভাগে ভাগ করা যায়। কতগুলো সুপারিশ সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে কিংবা তাদের নি‍র্বাহী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে পারবে। এগুলোয় সংবিধান সংশোধন কিংবা রাজনৈতিক দলের মতামত নেয়ার তেমন প্রয়োজন হবে না। রাজনৈতিক দলগুলো এসব সুপারিশের বিষয়ে কোনো দ্বিমত করবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস। এগুলোর একটি তালিকা এবং অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করে সরকারকে দেয়া হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। এর মাধ্যমে অধিকাংশ সুপারিশ বা প্রস্তাবই আইনের মাধ্যমে বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বাস্তবায়ন হবে। আর এগুলো বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী, কার্যকর ও স্বাধীন করা। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। নির্বাচনকে সুষ্ঠু করার জন্য এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই এগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি। আমরা আশা করছি, সরকার এগুলো বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।

ঐকমত্য কমিশন ১৬৬টি সুপারিশের যে স্প্রেডশিট তৈরি করেছে সেখানে নির্বাচন কমিশন সংস্কারের ২৭টি সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত। এতে কতগুলো সুপারিশ রয়েছে যেগুলো বাস্তবায়নে সংবিধানের সংশোধন লাগবে। এগুলোর অধিকাংশই স্পর্শকাতর এবং রাজনৈতিক দলের মতামতের প্রয়োজন হবে। তবে আমাদের অধিকাংশ সুপারিশের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নীতিগতভাবে একমত। যেমন অনেকেই সংসদের উচ্চকক্ষ ও নারীর সংরক্ষিত আসন ১০০ করার বিষয়ে একমত। অনেকেই নারীর আসনে সরাসরি নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছেন। কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদ সীমিত করার বিষয়ে একমত। আবার কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রী একাধিক পদে না থাকার বিষয়ে একমত হয়েছেন। এ রকম অনেকগুলো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, রাজনৈতিক দলের গণতন্ত্রায়ণ, রাজনৈতিক দলের আর্থিক স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার বিষয়ে অনেকেই একমত হয়েছেন। আমরা আশা করছি, আলোচনার পরবর্তী ধাপে প্রায় সব গুরুত্বপূ‍র্ণ বিষয়েই ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

আপনারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা জোটের সঙ্গে আলাপে বসেছেন। যেসব প্রস্তাব বা সুপারিশ নিয়ে দ্বিমত আছে বা সমালোচনা আছে সেই আলাপের পরে কোনো অগ্রগতি হয়েছে?

আমরা ১৬৬টি সুপারিশ রাজনৈতিক দলের কাছে পাঠিয়েছি। এগুলো সম্পর্কে প্রায় সব দলই তাদের মতামত দিয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা জানার চেষ্টা করেছি, কোন প্রস্তাব বা সুপারিশের সঙ্গে তারা একমত বা দ্বিমত বা আংশিকভাবে একমত। যেগুলোর সঙ্গে তারা একমত সেগুলো নিয়ে আর আলোচনার প্রয়োজন নেই। যেগুলো সম্পর্কে তারা দ্বিমত বা আংশিক একমত, সেগুলো সম্পর্কে কেন তারা দ্বিমত বা আংশিক একমত এবং কোন বিবেচনায় আমরা সুপারিশ করেছি—এ রকম আলোচনা হয়েছে। আলাপ-আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক দলই তাৎক্ষণিকভাবে মত পরিবর্তন করে একমত হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে তারা বলেছে, তারা ফিরে গিয়ে তাদের দলের অন্যান্য নেতার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে আমাদের জানাবে। প্রাথমিকভাবে এ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখন আমরা দ্বিতীয় ধাপে কাজ শুরু করেছি।

যে বিষয়গুলো সম্পর্কে তাদের এরই মধ্যে নীতিগত ঐকমত্য আছে সেগুলো আলোচনার দরকার নেই। যেগুলো নিয়ে এখনো ঐকমত্য হয়নি সেগুলো সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করে ঐকমত্যে পৌঁছার চেষ্টা করছি আমরা দ্বিতীয় ধাপে।

রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা এ দেশের শুধু নাগরিকই নন, তারা দেশপ্রেমিক নাগরিকও। তারাও চান এ দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা, সংবিধান ও প্রতিষ্ঠানগুলোয় পরিবর্তন আসুক, স্বৈরাচারের আবার পুনরুত্থান না ঘটুক। শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন তখন তিনি একটি নির্বাচনের মাধ্যমে এসেছিল। তিনি ক্ষমতা দখল করে আসেননি। যদিও নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে শেখ হাসিনা স্বৈরাচারী শাসকে পরিণত হয়েছে। বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান, আইন কাঠামো ও বিদ্যমান নীতি পদ্ধতিই শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচারী শাসকে পরিণত করেছে। শেখ হাসিনা আইন-কানুনে আরো পরিবর্তন এনেছেন, কিছু নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়ন করেছিলেন এবং একই সঙ্গে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করেছেন। এর মাধ্যমে তার স্বৈরাচার হওয়া বস্তুত দানবে পরিণত হওয়া নিশ্চিত হয়েছে। আমরা শেখ হাসিনার সৃষ্ট কালাকানুনের সংস্কারের বিষয়েও নিবিষ্ট হব। শুধু নীতিগতভাবেই নয়, কীভাবে নির্বাচন হবে, কীভাবে এসব বাস্তবায়ন হবে, কোন প্রক্রিয়ায় ও কোন পদ্ধতিতে—এগুলোর বিষয়ে ঐকমত্য সৃষ্টির চেষ্টা করব। এর মাধ্যমে একটি জাতীয় সনদ তৈরি হবে, যেখানে সবার স্বাক্ষর থাকবে। আমরা আশা করছি, জুলাইয়ে জাতীয় সনদ তৈরি হবে এবং সব রাজনৈতিক দলগুলো এতে স্বাক্ষর করবে। কীভাবে এটি বাস্তবায়ন হবে সেই সিদ্ধান্ত তারা নেবে।

আমরা দেখেছি গত তিনটি নির্বাচনে প্রশাসনের প্রবল প্রভাব ছিল। প্রশাসনের প্রভাবমুক্ত হয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের যেসব প্রতিবন্ধকতা ছিল, সেগুলো নিরসনে কী প্রস্তাব করা হয়েছে?

অনেকগুলো প্রস্তাবের মধ্যে একটি হলো নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ করা। নির্বাচন কমিশন যদি স্বাধীন হয়, পক্ষপাতদুষ্ট বা কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগত না হয়, তাহলেই তারা নি‍র্বাচনী দায়িত্বে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেবে যারা পক্ষপাতদুষ্ট ও অনুগত হবে না। আমরা সুপারিশ করেছি কমিশন যেন তাদের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দেয়।

সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে আরেকটি বড় বাধা হলো নির্বাচনকালীন সরকার। নির্বাচনের সময় দলীয় সরকার থাকলে শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সুপারিশ করেছি। এ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে আমি নিজে আদালতে পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে মামলা দায়ের করেছি। আমরা আশা করছি যে শিগগিরই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে আসবে। আর নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার থাকলে তারা নিশ্চিত করতে পারবে যেন প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরপেক্ষতা বজায় রাখে।

এর বাইরে নির্বাচন কমিশনের দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের প্রস্তাবও করেছি। অতীতে আমাদের নির্বাচন কমিশনগুলো নির্বাচন অন্যায় ও জালিয়াতি নির্বাচন করেছে, দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়ে তা ভঙ্গ করেছে। কিন্তু এসবের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তাই অন্যায়কারীদের ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশও আমরা করেছি। নির্বাচনের পর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এ কমিশন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে কিনা তা সার্টিফাই করবে গেজেট প্রকাশের আগে। যদি সুষ্ঠু না হয়ে থাকে তাহলে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

আরো একটি ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা দরকার। যখন নির্বাচন কমিশন দায়িত্বে থাকে না, তখন কোনো অভিযোগ উঠলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায় না। এক্ষেত্রে একটি সংসদীয় কমিটি থাকবে অভিযোগ তদন্তের জন্য। তদন্ত প্রতিবেদন পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ পাঠানো হবে, যাতে রাষ্ট্রপতি সে মোতাবেক ব্যবস্থা নিতে পারেন।

সর্বোপরি নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে কমিশনের নিয়োগ রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে দেয়ার জন্য একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর বিপরীতে কমিশনের সদস্যদের নিয়োগে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের তিনটি অর্গানের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের, যেমন রাষ্ট্রপতি বা তার প্রতিনিধি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি বা তার প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের (এনসিসি) মাধ্যমে প্রদানেরও সুপারিশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে রাজপথের পরিব‍‍র্তে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের দেশে গড়ে উঠবে। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা তদন্তের জন্যও সংসদের উচ্চকক্ষের একটি সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিটি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ জমা দেবে। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের বহিরাগত চাপ থেকে রক্ষা করতে বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যেন নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। এসব উদ্যোগ যদি বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে নির্বাচন কমিশন আরো শক্তিশালী হয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারবে।

কয়েকটি রাজনৈতিক দলের অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন শেখ হাসিনা আমলের ফ্যাসিবাদী আইনি কাঠামো অনুযায়ী তৈরি। এ বিষয়ে আপনাদের বক্তব্য কী?

এটা সত্য যে ২০২২ সালে বিগত সরকারের আমলে তৈরি আইনি কাঠামো ব্যবহার করে নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আইনটির সীমাবদ্ধতার বিষয়ে আমরাও সোচ্চার ছিলাম। তবে যে অনুসন্ধানী কমিটির মাধ্যমে বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে সেটি নিরপেক্ষ ছিল। সেজন্য আমরা আশাবাদী যে বর্তমান নির্বাচন কমিশন তাদের কাজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে। তবে সময়ই বলে দেবে তারা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করছে বা করতে পারবে।

বিদ্যমান নির্বাচন কমিশন সর্বনিম্ন কত সময়ের মধ্যে নির্বাচন দিতে পারবে বা এক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সক্ষমতা কতখানি রয়েছে?

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার মূলত নির্দলীয় সরকার। দেশে যতগুলো সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে নির্দলীয় সরকারের অধীনেই হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে এ সরকারের অঙ্গীকারও রয়েছে। আশা করি তারা এক্ষেত্রে সফল হবে।

শুধু কি সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতের মাধ্যমে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ফিরে আসা আটকানো যাবে বা গণতান্ত্রিক চর্চার পথ প্রশস্ত হবে?

আমাদের সুপারিশগুলো কেবল নির্বাচনী অঙ্গনকে পরিচ্ছন্ন করা কেন্দ্রিক নয়। রাজনৈতিক অঙ্গনও প্রচণ্ড কলুষিত এখানে। তাই আমরা রাজনীতির পরিবেশ উন্নয়নের সুপারিশও করেছি। আর কেবল সুষ্ঠু হলেই যে গণতান্ত্রিক শাসন নিশ্চিত হবে, এমন নয়। মনে রাখা প্রয়োজন যে শেখ হাসিনাও নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি স্বৈরাচারী শাসক হয়ে উঠেছিলেন। সুতরাং প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্রের চর্চা ফিরিয়ে আনতে হলে আইনি, প্রশাসনিক ও কাঠামোগত কিছু সংস্কার প্রয়োজন। যে কারণে আমরা প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তাব করেছি। রাষ্ট্রপতি নিয়োগের ব্যাপারেও সুপারিশ করা হয়েছে। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা যেমন সম্ভব হবে, তেমনি গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ প্রশস্ত হবে বলে আমরা মনে করি।

ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সংস্কারে কী প্রস্তাব করেছেন?

রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের বিষয়ে কিছু সুদূরপ্রসারী সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথমত, আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর গণতন্ত্রায়ণের সুপারিশ করেছি। যেমন প্রত্যেক স্তরে রাজনৈতিক দলের নেতা বাছাই করা হবে সে দলের নেতাকর্মীদের গোপন ব্যালটের মাধ্যমে। এছাড়া বিভিন্ন দলের অভিযোগ ছিল যে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের প্রক্রিয়া বেশ জটিল ও ব্যয়বহুল। একাধিক জেলা ও উপজেলায় অফিস স্থাপনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা অনেক দলের জন্য চ্যালেঞ্জিং। এ বিষয়গুলোর সমাধানের জন্যও সুপারিশ করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলের সদস্যদের যোগ্যতা ও স্বচ্ছতাবিষয়ক সুপারিশ হলো রাজনৈতিক দলের সদস্যদের নাম প্রকাশ করা হবে এবং প্রতিটি দলের সদস্য তালিকা প্রতি বছর ওয়েবসাইটে আপডেট করা হবে।

অপরাধী বা দুর্বৃত্তরা যেন রাজনৈতিক দলে অন্তর্ভুক্ত হতে না পারে তা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেয়া হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর আয় ও ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ করা হবে। দলগুলোর বার্ষিক অর্থপ্রাপ্তির তথ্য, শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুদান ও অন্যান্য অর্থনৈতিক লেনদেন নিয়মিতভাবে অডিট করা হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনী ব্যয়ের হলফনামা যাচাই-বাছাই করে তার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।

তথ্য অধিকার আইন ও সংগঠন বিষয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে যে ছাত্র ও শিক্ষক সংগঠনগুলো নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে সরাসরি সম্পৃক্ত না হয়, যাতে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি গড়ে উঠতে না পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী প্রক্রিয়াও গোপনে করতে হবে। এসব সুপারিশ গৃহীত বা বাস্তবায়ন হলে রাজনৈতিক অঙ্গন পরিচ্ছন্ন হবে বলে মনে করি।

এরপর কী?

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এখন আলাপ-আলোচনা চলছে। অনেক বিষয়ে ঐকমত্য হলেও মৌলিক অনেক বিষয়ে এখনো দ্বিমত আছে। আমরা আশাবাদী যে অনেকগুলো মৌলিক বিষয়েও ঐকমত্যে পৌঁছা যাবে। আমরা আরো আশাবাদী যে জুলাইয়ের মধ্যে একটি ‘জাতীয় সনদ’ স্বাক্ষর করা যাবে। আর এর মধ্য দিয়েই আমরা আবু সাঈদ-মুগ্ধদের আত্মত্যাগের প্রতি যথাযথ স্বীকৃতি দিতে পারব।