ড. কাজী মারুফুল ইসলাম, অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন। জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি এবং বার্গেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেছেন। রাষ্ট্র, শাসন ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি বিষয় তার গবেষণায় অগ্রাধিকার পেয়েছে। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার জন্য একাধিক গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং সক্ষমতা উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন তিনি। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের সংস্কার কমিশন ও তাদের প্রস্তাবিত সুপারিশমালা নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অনেকগুলো সংস্কার কমিশন গঠন হয়েছে। সেগুলোর মধ্য থেকে চারটি কমিশন সম্প্রতি তাদের প্রস্তাবিত সুপারিশমালা প্রদান করেছে। তার মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের বেশকিছু প্রস্তাব ঘিরে রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে নাগরিক সমাজের মধ্যে নানা ধরনের বিতর্ক, সমালোচনা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলো নিয়ে আপনার সার্বিক মূল্যায়ন জানতে চাই।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলোর সার্বিক মূল্যায়নের জন্য এটাকে সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সামগ্রিকভাবে মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল তা শুধু একজন শাসকের পরিবর্তনের মাধ্যমেই পূরণ হবে না। আমাদের ৫৩ বছরের ইতিহাসে আমরা দেখেছি যে আমরা শুধু শাসকই বদলেছি। কখনো কখনো নির্বাচিত ব্যবস্থার মধ্য দিয়েও শাসক বদলেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় আসা শাসকরা একটি স্বৈরাচারী ভূমিকাতেই পরিণতি পেয়েছে। এ অভিজ্ঞতা ও আকাঙ্ক্ষাগুলো থেকে পরবর্তী সময়ে সংস্কারের দাবি উঠেছে।

সেই পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের দায়িত্ব পালন শুরু করেছে, দায়িত্ব পালন করেছে এবং কোথাও কোথাও নেতৃত্ব পরিবর্তন করেছে। কিন্তু নেতৃত্ব পরিবর্তন করা সত্ত্বেও এ পুরো ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত যে ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থা ও প্রবণতা রয়েছে, সেই ব্যবস্থা ও প্রবণতাগুলো রাতারাতি উপড়ে ফেলা মুশকিল। তবে উপড়ে ফেলার একটা প্রাথমিক ধাপ হচ্ছে কোথায় কোথায় আমাদের সমস্যা আছে, কী কী আমাদের বদলাতে হবে, সেগুলো আমাদের চিনতে পারা। সুতরাং সংস্কার প্রতিবেদনগুলোও সেভাবেই হতে হবে।

যদি সামগ্রিক ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনটি দেখি, এখানে যেসব সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান নির্বাচন ব্যবস্থাসংক্রান্ত নীতিমালার পার্থক্য কোথায়? আমাদের নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার যত জায়গা আছে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থার প্রবর্তন যদি এ কমিশনের পরিবর্তনের মূল ক্ষেত্র হয়ে থাকে তাহলে বলতে হয়, নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব যতটা সম্ভব জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এ কমিশন সেই পরিবর্তনগুলো চিহ্নিত করেছে। চিহ্নিত করার কাজটি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ও অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে যে দৃশ্যমান পার্থক্য দেখা দিয়েছে বা নাগরিক সমাজের মধ্যেও যে মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে পার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়, এটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভালো চর্চা। কিন্তু সমস্যা হলো, মতবিরোধ সত্ত্বেও চূড়ান্ত নীতিমালায় কোন প্রস্তাবগুলো থাকবে বা পরিবর্তন হবে—সেটা করার মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে কিনা সেটা নিয়ে। আমার কাছে মনে হয় সেই পরিবেশ রয়েছে। সুতরাং সব পক্ষ আলোচনায় আসুক।

আলোচনায় বসার প্রক্রিয়াটি কেমন হওয়া প্রয়োজন?

এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণের অপেক্ষা না করে আমাদের উচিত যার যার জায়গা থেকে সেই আলোচনায় যুক্ত হওয়া, আলোচনার জায়গাকে আরো সম্প্রসারিত করা। পাশাপাশি একটি চাপ তৈরি করতে পারি জনগণের মাধ্যমে যেটি সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্ব না দেয়ার কোনো কারণ থাকবে না। সুতরাং মূল কাজ হলো আমরা যত বেশি যুক্ত হতে পারব তত বেশি আলোচনার মঞ্চ তৈরি হবে এবং ক্রমে ধারণাগুলো আরো স্পষ্ট হবে। প্রস্তাব বাস্তবায়নের ভালো-মন্দ, সুবিধা-অসুবিধার জায়গাটি স্পষ্ট হবে এবং এ দেশের নাগরিকদের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে।

বর্তমানে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সংস্কার আগে নাকি নির্বাচন আগে। আমাদের রাজনীতির বড় বড় অংশীজনদের অনেকে চান আগে নির্বাচন পরে সংস্কার, আবার কেউ কেউ চান আগে সংস্কার পরে নির্বাচন। এদিকে অন্তর্বর্তী সরকার বলে আসছে, জনগণ যা চাইবে সেটাই করা হবে। এক্ষেত্রে আসলে সমাধান কীরূপ হতে পারে?

বিতর্কটি এখনো যে পর্যায়ে রয়েছে, সেখান থেকে আমি বলব না যে এটি একটি প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার মতে, এটা অন্যতম প্রধান একটি প্রবণতাই দৃশ্যমান হচ্ছে, তবে সেটা এখনো সমস্যায় রূপান্তরিত হয়েছে বলা যায় না। তবে এ নির্বাচন এবং সংস্কার দুটো ব্যাপারকেই সম্পূর্ণ বিপরীতমুখীভাবে বিবেচনা করে ব্যাখ্যা করতে চাইলে সেটা একটা সমস্যাসংকুল অবস্থা বলেই মনে করি।

একটি কার্যকর নির্বাচন অবশ্যই লাগবে আর সেখানে কারো কোনো দ্বিধা আছে বলে মনে করি না। কারণ যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য যে গ্রহণযোগ্যতা প্রয়োজন, যেটাকে আমরা বৈধতা বলি, সেটা নির্বাচন ব্যতীত অন্য কোনোভাবে পাওয়া খুব মুশকিল। আমরা বিভিন্নভাবে বৈধতা দাবি করতে পারি। কিন্তু নির্বাচনটাই হলো একমাত্র প্রকাশ্য ঐকমত্যের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি, যেখানে মানুষ বলতে পারে যে আমরা এটার পক্ষে আছি, এ নীতি আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য। নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। নির্বাচন আমাদের লাগবেই। কিন্তু নির্বাচন কোনো লক্ষ্য নয়, এটা হলো একটা মাধ্যম যেটার মধ্য দিয়ে আমরা একটা লক্ষ্য অর্জন করতে পারি। সেই লক্ষ্যটা হলো বৈষম্যহীন বাংলাদেশ, একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।

সেই বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে একটা নির্বাচনের ভূমিকা কীরূপ হতে পারে? একটা নির্বাচন করলেই কি আমরা সেই লক্ষ্যের কাছাকাছি যেতে পারছি? একটা নির্বাচন কখনই সেখানে যাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। এটা আমাদের নিজেদের ইতিহাসেই বারবার প্রমাণিত। ১৯৯১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে, আমরা নির্বাচিত সরকার পেয়েছি। কিন্তু ফ্রিডম হাউজ বলে যে আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংক আছে তারা বাংলাদেশের এ পুরো সময়কালকে চিহ্নিত করেছে অনুদার গণতন্ত্র হিসেবে। তার মানে, আমরা এ দেশে নির্বাচনী গণতন্ত্র পেয়েছি ঠিকই, তবে তা কোনোভাবেই গণতন্ত্রের বাকি শর্তগুলো পূরণ করে না। তাহলে বাকি সব শর্ত পূরণের জন্য যে ব্যবস্থার প্রয়োজন, সেটি পূরণ করতে যদি কোনো ঐকমত্যে পৌঁছতে সমর্থ না হই তাহলে শুধু নির্বাচন দিয়ে আমরা কীভাবে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছতে পারি?

এখন পর্যন্ত নির্বাচনই আমাদের দেশে একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেন নির্বাচন দিলেই সব দায়িত্ব শেষ। কিন্তু নির্বাচন হওয়া উচিত প্রকৃত গণতন্ত্রে পৌঁছানোর প্রাথমিক শর্ত।

সেই গন্তব্যে পৌঁছতে আমাদের সাহায্য করবে সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো যে এ জায়গা আমরা কেমন দেখতে চাই। এগুলো প্রস্তাব মাত্র। কিন্তু সংস্কারকর্ম তো করতে হবে। পদক্ষেপ নিতে হবে। সেই পদক্ষেপ নেয়ার মূল কাজ আসলে নির্বাচিত সরকার করবেন, কিন্তু সেই পদক্ষেপের ন্যূনতম কতগুলো শর্ত আছে যার জন্য কতগুলো পদক্ষেপ আমাদের এখনই নেয়া দরকার। অর্থাৎ নির্বাচিত সরকার আসার আগেই নেয়া দরকার। কারণ যারা নির্বাচিত হন নির্বাচনের আগে ও পরে, তাদের আচরণের পার্থক্য তৈরি হয় বা পুরো পাল্টে যায়। সুতরাং তাদের কাছে বা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে মানুষ যেন আবার জিম্মি না হয়ে যায় সেটার ন্যূনতম নিশ্চয়তা তৈরির জন্য আমাদের কিছু প্রাথমিক সংস্কার আসলে নির্বাচনের আগেই করা দরকার। এ সংস্কারগুলো না করে নির্বাচনে গেলে আমি নিশ্চিত না যে বাংলাদেশের ওই কাঙ্ক্ষিত ও পরিবর্তিত সমাজ গড়ে উঠবে কিনা!

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রায় ছয় মাস হতে চলেছে, প্রয়োজনীয় সংস্কারের দিকে সরকার কতটুকু অগ্রসর হতে পেরেছে বলে মনে করছেন?

সার্বিক দায়িত্বের জায়গা নিয়ে যদি বলি, আমার প্রত্যাশার জায়গা থেকে কিছু হচ্ছে না। আমি যতটুকু আশা করেছিলাম এবং যেটা দেখছি—দুটোর মধ্যে তফাৎ অনেক বেশি। নাগরিক হিসেবে বা অভিজ্ঞানের ভিত্তিতে আমি সমাজে বিশেষ রকমের অবস্থানে আছি। কিন্তু যদি দেশের একেবারে সাধারণ কোনো মানুষের কথা চিন্তা করি যাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত আমার দেখা-সাক্ষাৎ হচ্ছে, তাদের অভিজ্ঞতার আলোকেও যদি বলি, একই রকম প্রত্যাশা তাদেরও ছিল এবং তারাও একই হতাশা ব্যক্ত করছেন। আর ক্রমে হতাশাগুলো শক্তিশালী হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এখানে আমি দুটো স্তরকে আলাদা করছি। একটা হলো আমরা নিরাশাহত এবং হতাশ, বিরক্ত এবং বিরক্ত থেকে আমরা বিক্ষুব্ধ। এখন আমি হতাশ, কিন্তু অনেক মানুষের মধ্যে দেখছি তারা বিরক্ত। অর্থাৎ হতাশার পরের ধাপটায় গিয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি এখনো এমন হয়নি যে এ বিরক্তি বিক্ষোভে রূপান্তরিত হবে। কিন্তু সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো এখন পর্যন্ত হতাশামোচনের দিকে যাচ্ছে না। বরং তাদের কর্মকাণ্ড আমাদের আরো বিরক্তিতে ফেলছে। অর্থাৎ আমি যে প্রবণতাগুলো দেখছি, বিশেষত, বাজার ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সরকারি আমলাতন্ত্রের পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক দলগুলো ও অন্তর্বর্তী সরকার ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে যে সমন্বয়ের অভাব; মোটাদাগে এ চার জায়গা থেকে যদি আমি দেখি, তাহলে ক্রমে আমার হতাশা বাড়ছে এবং বিরক্তিও বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও আমি এ ধরনেরই প্রবণতা দেখছি।

সম্প্রতি বিবিএসের জাতীয় নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে। যেখানে উঠে এসেছে, সিংহভাগ মানুষের প্রত্যাশা হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে হোক। কিন্তু বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি এটি চাচ্ছে না। বিএনপির চাওয়া উপেক্ষা করে কি প্রথমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্ভব? এমন ভিন্ন চাওয়ার সংকট থেকে উত্তরণ কীভাবে হতে পারে?

স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে আমার নিজের কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। যার মধ্যে আমি ঢাকা ও ঢাকার বাইরে জেলাপর্যায়ে ১৬টির মতো মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছি। ঢাকার যে রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং মাঠপর্যায়ের যে রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সে অনুসারে এ জায়গাগুলোয় বসবাসকারী মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা ও আগ্রহ—এ দুই জায়গার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। নিশ্চিতভাবে জনসমর্থনের দিক দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দেশের অন্যতম বড় একটি রাজনৈতিক দল। ফলে তাদের মতামত অস্বীকার বা উড়িয়ে দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

কিন্তু আমি রাজনীতি বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে এটাও জানি যে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধানতম আগ্রহ হচ্ছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ক্ষমতায় যাওয়া। যেকোনোভাবে ক্ষমতারোহণই তাদের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য। যে দেশে আইন-কানুন কাঠামো অনেক শক্তিশালী থাকে সেখানে তাদের আইন-কানুন মেনে যেতে হয়। আর যেখানে আইনের শাসন কাঠামো দুর্বল সেখানে তাদের অনেক সুযোগ থাকে আইনকে ফাঁকি দেয়ার। সুতরাং ক্ষমতায় যাওয়াটাই তাদের মূল লক্ষ্য। ফলে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিএনপির যে অবস্থান সেটাকে অস্বাভাবিক ভাবার কিছু নেই।

কিন্তু যদি মানুষের প্রয়োজন বা চাহিদার দিকে লক্ষ করি, দেখা যাবে গত ৫ আগস্টের পর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের হয় অপসারণ করা হয়েছে কিংবা তারা পালিয়ে গেছে। এ জায়গাগুলোয় বিরাট একটা শূন্যতা বিরাজ করছে। ফলে জন্মনিবন্ধন, মৃত্যুনিবন্ধন, সম্পত্তির ওয়ারিশনামা, ট্রেড লাইসেন্স, জাতীয়তার সনদপত্রসহ একেবারেই প্রয়োজনীয় সেবাগুলো মানুষ পাচ্ছে না। একেবারেই যে পাচ্ছে না এমন নয়, পাচ্ছে তবে চরম ভোগান্তি ও সময়ের অপচয় হচ্ছে অনেক। তাই জরুরিভিত্তিতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা এবং তাদের সেবাগুলো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এদিকে জুলাই আন্দোলন মূলত ছাত্রদের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছে। তাদেরকে সাধারণ মানুষ সমর্থন দিয়ে আন্দোলনের চূড়ান্ত বিজয় এনেছে। যেটা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের স্থানীয় মানুষজন, রাজনৈতিক ও নির্বাচিত নেতারা আন্দোলনে অতটা যুক্ত ছিল না। সুতরাং আন্দোলনটা হয়েছে তরুণদের মধ্যে ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে। ফলে রাজনীতিবিদরা যারা আছেন তারা এ আন্দোলনের উত্তাপ থেকে অনেকটা দূরে ছিলেন। এ বাস্তবতা আমাদের মানতে হবে। কিন্তু এখন যখন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তখন এই স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ক্ষমতার ভাগ নেয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তাদের কাছে এমপি বা মন্ত্রী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নেই। তারা কেউ চেয়ারম্যান হতে চায়, কেউ কাউন্সিলর হতে চায়। সুতরাং এসব রাজনৈতিক নেতাদেরও আকাঙ্ক্ষা হলো স্থানীয় পর্যায়ে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন হয়ে যায় তত ভালো।

সুতরাং জাতীয় পর্যায়ে বিএনপি নেতৃত্বের যত আগ্রহই থাকুক না কেন, সাধারণ জনগণ এমনকি স্থানীয় পর্যায়ের বিএনপি নেতারা ও অন্যান্য দলের যে নেতারা আছেন, তাদের মধ্যে একটা বিপুল আগ্রহ আছে যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনটা যত দ্রত সম্ভব হয়ে যাক। কারণ তারা জানে যে যদি জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচন হয়ে যায় তাহলে সেই নির্বাচনে যারা বিজয়ী হবেন তাদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ একটা প্রভাব স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মনোনয়ন থেকে শুরু করে নির্বাচনের ফলাফলের ওপর পড়বে। ফলে এখন একটা নিরপেক্ষ অবস্থা আছে, অনেকের সম্ভাবনা আছে, তারা সেই সম্ভাবনাটাকে যাচাই করে দেখতে চান এ নিরপেক্ষ গণ্ডির মধ্যে। সুতরাং তাদের মধ্যে বিপুল আগ্রহ আছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন যত দ্রুত সম্ভব হয়ে যাক।

বর্তমান সরকারের সক্ষমতার দিক থেকে এবং বাস্তব সম্ভাব্যতার বিচারে আপনার কতটুকু মনে হয় যে এতটুকু পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে?

আমার কাছে মনে হয় যে এখন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটামুটি একটা স্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে এসেছে। আমাদের পুলিশ-বিজিবি ও আনসার এ বাহিনীগুলো মোটামুটি সক্রিয় হয়েছে। আর স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেহেতু আমরা একদিনেই করি না, এটা ধাপে ধাপে করা হয়, অর্থাৎ একেকটা অঞ্চলে একেকভাবে করা হয়। ফলে এ নির্বাচন করার যে ব্যবহারিক দিক, অর্থাৎ এটা আমরা করতে পারব কিনা, সেই সম্ভাবনার বিচারে সেই সক্ষমতা অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি হয়েছে। এটা করে ফেলা সম্ভব। কিন্তু রাজনৈতিক সক্ষমতার বিষয়ে আমি বলব যে এখনো ঘাটতি আছে। এটা করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের একটা শক্তিশালী অবস্থান নেয়া দরকার যে এটা আমরা করব, সে অনুযায়ী সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনায় বসবে। এসব ক্ষেত্রে তাদের অবস্থানটা অনেক দুর্বল দেখছি। কিন্তু মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা বিচারে আমার মনে হয় যে তারা এটি বাস্তবায়ন করতে সক্ষম।