শিক্ষা মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের একটি, যা নবীন মানসকে গড়ে তোলে ও পরিশীলিত করে। এটি আয় ও সম্পদের বৈষম্য কমিয়ে মানুষকে সুখী, সমৃদ্ধ সমাজের ভিত্তি হিসেবে, একসঙ্গে থাকতে, সমাজে যুক্ত হতে এবং অর্থনীতিতে অবদান রাখতে প্রস্তুত করে। এর রয়েছে জাতীয় ও বৈশ্বিক ভূমিকাও। শিক্ষা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগকারী দেশগুলো জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রসরমাণ এবং প্রতিনিয়তই নতুন পণ্য ও উদ্ভাবন বাজারে আনছে। এ বিনিয়োগ বৈশ্বিক প্রতিযোগ্যতা ও উদ্ভাবনের মূল ভিত্তি। শিক্ষা সর্বচারী ও সময়াতীত হলেও এ নিয়ে ব্যবসাও বাড়ছে। প্রচলিত বিদ্যালয়, অনলাইন শিক্ষাক্রম, ব্যক্তিগত পাঠদান, পেশাগত প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা বা বিশেষ দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষা-সম্পর্কিত পণ্য—সবই বর্তমানে একেকটি লাভজনক খাত।

বাংলাদেশে শিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। উন্নত সুযোগ-সুবিধা, সম্পদ ও প্রযুক্তি ব্যবহারে এগুলো শিক্ষার্থীদের উপকারে আসতে পারে। কিন্তু উদ্ভাবন, বৈচিত্র্যায়ণ বা বিশেষ চাহিদা মেটানোর বদলে অনেক কয়টি এখন শুধুই শিক্ষার্থী সংখ্যা ও আয় বৃদ্ধিতে মনোযোগী। সরকার শিক্ষার চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় বেসরকারি খাত মানসম্পন্ন সেবা দেয়ায় এগিয়ে এসেছে; তবে ব্যয় বাড়াতে নিম্ন আয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ সীমিত হলে সমাজে অসমতা বাড়বে। এছাড়া উদ্বেগজনকভাবে লক্ষ্যহীন পুরনো পাঠ্যক্রম অনুসরিত হচ্ছে, যা যুগের প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ। অবশ্য শিক্ষা একটি ব্যবসা নাকি একটি জনসেবা—তা নির্ভর করে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকারের ওপর। বেসরকারি বিনিয়োগে লাভ করা আর জনদায়িত্বকেও গুরুত্ব দেয়া একটি ভারসাম্যপূর্ণ পন্থাই সবার জন্য সমতাপূর্ণ ও মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে।

শিক্ষা খাত শুরু হয়েছিল মানবসেবার অঙ্গীকার নিয়ে, একটি দক্ষ ও উৎপাদনমুখী জনশক্তি তৈরি করে মানুষের জীবনমান উন্নত করতে। বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার শুরুতে বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচানোর যুক্তি দেয়া হয়েছিল। তবে এখন সবাই চাহিদার কথাই বলে। ব্যবসার লক্ষ্য ও অনুশীলন শিক্ষার চেয়ে আলাদা হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় করপোরেট মনোভাব অনুপ্রবেশ করছে। শিক্ষা কোনো স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ নয়, এর অবদান দৃশ্যমান হতে সময় লাগে। শিক্ষাগারের জন্য দানের ধারা স্বল্পমেয়াদি সমাধান দেয়; তবে অনুদান ও দাতব্য সহযোগিতার ওপর নির্ভরতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে না টিকিয়ে বরং উদ্ভাবনও বাধাগ্রস্ত করে। এর পরিবর্তে সামাজিক উদ্যোগের ধারাটি দীর্ঘস্থায়ী বিকাশের চালিকা হতে পারে। সামাজিক পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম আমাদের তরুণদের প্রস্তুত করতে সহায়তা করবে। যখন ব্যবসার মূল্যবোধ সমাজ গঠনের ভিত্তিকে প্রভাবিত করে, তখন ব্যবসার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য পুনর্নির্ধারণ প্রয়োজন। ব্যবসা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমান্তরাল অস্তিত্ব পুঁজিবাদকে একটি বৃহত্তর, মহত্তর ও তৃপ্তিদায়ক কারণ জোগায়। পুঁজিবাদ বিশ্ববাণিজ্যকে গতিশীল করে সমাজের উপকার করছে, তবে এর সুফল সবাই পায় না। এটা বিশ্বজুড়ে প্রসার লাভ করে অনেককেই সমৃদ্ধ করলেও তা দারিদ্র্য সম্পর্কিত সামাজিক সমস্যা দূর করতে পারেনি।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস সামাজিক ব্যবসাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এমনভাবে যা সামাজিক বা পরিবেশগত সমস্যার সমাধানে রপ্ত এবং সমাজে ইতিবাচক প্রভাব রাখে। সামাজিক ব্যবসা দারিদ্র্য দূরীকরণ (সম্পদে প্রবেশাধিকার, কর্মসংস্থান ইত্যাদি) এবং সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে মানুষের সেবা করে; আর কেবল মুনাফার পেছনে না দৌড়ে (পুনর্বিনিয়োগ, সামাজিক প্রভাব) প্রচলিত ধারাকে প্রশ্ন করে (অন্তর্ভুক্তি, ক্ষমতায়ন ইত্যাদি)। এসব কাজে ক্ষতি নেই, লাভের হিসাবও নেই—বরং উদ্বৃত্ত অর্থের পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে এক বা একাধিক সামাজিক, যেমন সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা বা আবাসন, পয়ঃজল সরবরাহ, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রচলন, দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ ইত্যাদি লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা হয়। এ ধারায় পুনর্বিনিয়োগ হবে সামাজিক অগ্রাধিকার খাতে, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, পুষ্টি, শিক্ষা, পরিবেশ সমস্যা সমাধানে। একটি কল্যাণমুখী মনোবৃত্তি হলো এ ধরনের বিনিয়োগের প্রধান চালক, যার সাফল্য মাপা যাবে মানুষের বা পরিবেশের ওপর প্রভাব দেখে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যবর্তী এ ধারা পণ্য ও সেবা বিক্রি এবং আংশিক অনুদানের মাধ্যমে খরচ চালায়।

এক ধরনের ব্যবসা আছে কেবল সামাজিক লক্ষ্যে কাজ করে। আরেকটি লাভজনক ধরন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মালিকানায় চলে, যাতে তারা পরোক্ষ উপকার পায়। যেমন কৃষকদের একটি দল সেচের অবকাঠামো গড়ে তুলল। ক্ষুদ্র ঋণই একমাত্র সামাজিক ব্যবসা নয়। ডানোন দই, গ্রামীণ চক্ষু হাসপাতাল, বিএএসএফের মশারি উদ্যোগ অথবা যুদ্ধোত্তর অঞ্চলের পণ্য নিয়ে কোলিভের মতো উদ্যোগগুলো এ রকম কাজের দৃষ্টান্ত, যা সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি গরিব ও সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টিকারী এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক। এ ধরনের উদ্যোগ এমন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে যারা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চান।

সামাজিক ও পরিবেশগত লক্ষ্যে কাজ করা সামাজিক উদ্যোগগুলো কয়েক দশক ধরে কার্যকর পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। মানুষের জীবনমান উন্নত করার লক্ষ্যে পৃথিবীকে আরো বসবাসযোগ্য করে তুলছে। মূলত সামাজিক ব্যবসা হলো একটি পদ্ধতি, যা তাৎক্ষণিক ও গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধানে সাহায্য করে টেকসই সমাজ গড়ে। সামাজিক উদ্যোগ ও সামাজিক ব্যবসার মাঝে অনেক সাদৃশ্য থাকলেও দ্বিতীয়টি একটি ভিন্ন সত্তা, যা প্রথমটির একটি দৃশ্যমান উপাদান। একটি উদ্যোগ জনগণ বা সরকারের কাছ থেকে অনুদান নিতে পারে, কিন্তু একটি সামাজিক ব্যবসা তা পারে না—বঞ্চিতরা তার সাফল্যের অংশীদার হলেও। যেমন বন্ধকবিহীন ক্ষুদ্র ঋণ, যা দরিদ্রদের মুক্তবাজারে অংশগ্রহণের এবং আত্মনির্ভর হওয়ার সুযোগ করে দেয়।

শিক্ষা যে কাউকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার সক্ষমতা দেয়, বেকারত্ব হ্রাস করে, দারিদ্র্য দূর করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। শিক্ষিতরা নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করে এবং উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনে—যা একটি দৃঢ় ও অভিযোজিত অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তোলে। ইউনেস্কোর মতে, শিক্ষায় বিনিয়োগ ১০-১৫ গুণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটিয়ে উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা ও গুণগত মান বাড়ায়। কিন্তু বাংলাদেশ শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের দিক থেকে খুব কৃপণ। যে দেশগুলো শিক্ষায় ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করেছে, তারাই বিজ্ঞানে, জ্ঞানে ও প্রযুক্তিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। এমনকি আফ্রিকার কিছু দেশ সিকি ভাগ পর্যন্ত বরাদ্দ রাখছে। শিক্ষা একটি দেশকে দ্রুত সামাজিক, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে এবং বাংলাদেশের মতো যুব জনসংখ্যাধিক্য দেশে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আশা দেয়।

একইভাবে শিক্ষা একটি দক্ষ জনবলের উদ্যোক্তা মানসিকতা গড়ে তোলে। শিক্ষিতদের মাঝে বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক কম। চাকরির সুযোগ বাড়লে আয়ও বাড়ে। অধিকসংখ্যক মানুষের কর্মজীবনে অংশগ্রহণে উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়। এতে দারিদ্র্য বিমোচন হয়ে সামাজিক বৈষম্য কমে। শিক্ষিত সমাজ নৈতিক ব্যবসা ও দায়িত্বশীল সম্পদ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলে। তারা উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে নেতৃত্ব দেয়, যা বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ায় এবং একটি স্থিতিশীল, পরিবেশবান্ধব রাষ্ট্র গড়তে সহায়তা করে। এটি শ্রমবাজার পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে এবং শিল্প ও অর্থনীতির বিকাশে অবদান রাখতে মানুষকে তৈরি করে। শিক্ষা সমাজের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়িয়ে একটি সমতাপূর্ণ গতিশীল সমাজ গড়ে তুলে একটি উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত করে।

যে সমাজে শিক্ষার হার বেশি, সেখানে মানুষ সাধারণভাবে সুস্থ এবং সামাজিক সমতাসম্পন্ন হয়। শিক্ষা জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা ও বোঝাপড়া তৈরি করে। শিক্ষিতরা স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারঙ্গম, ভালো স্বাস্থ্যগত অভ্যাস গড়ে তোলে এবং এলাকাব্যাপী স্বাস্থ্য উদ্যোগে অংশগ্রহণ করে। এছাড়া শিশুদের বেঁচে থাকার হার, মাতৃস্বাস্থ্য, গর্ভকালীন যত্ন, টিকা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও পরিচ্ছন্নতা—সবকিছুর সঙ্গেই শিক্ষা সরাসরি সম্পর্কিত। শিক্ষিত মানুষ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার প্রতি মনোযোগী। গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষিতের মাঝে দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কম থাকে; তারা তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর ও দীর্ঘ জীবনযাপন করে। সামাজিক সংহতি ও স্থিতিশীলতা গঠনে শিক্ষা সহনশীলতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মানবোধ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের মতো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক টানাপড়েনের দেশে শিক্ষা সামাজিক সম্প্রীতির প্রদায়ক। এটি সংলাপ ও সংঘর্ষ সমাধানের সুযোগ তৈরি করে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে সহায়তা করে। বিশ্বশান্তির ভিত্তি গড়ে দেয় শিক্ষা। কফি আনান বলেছিলেন, ‘শিক্ষা আসলে শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্য নাম’। শিক্ষাগত বৈষম্য দূর করার মাধ্যমে সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব। ইউনেস্কোর এক পরিসংখ্যান দেখায় যে স্কুলগামীর অনুপাত দ্বিগুণ করলে সংঘাতের ঝুঁকি অর্ধেক কমে যায়। শিক্ষা সমাজে ঐক্য, আস্থা ও সম্প্রীতি গড়ে তুলে কল্যাণ নিশ্চিত করে; আর একে অন্যের পাশে দাঁড়িয়ে, দুর্বলদের সহমর্মী হতে সহায়তা করে। শিক্ষা মানুষকে ক্ষমতায়িত করে, তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ায় ও নাগরিক অংশগ্রহণে উৎসাহিত করে। এর শেখানো সহানুভূতি ও নৈতিক মূল্যবোধ অপরাধ কমায়। গড় শিক্ষার স্তর এক বছর বাড়লে গ্রেফতারের হার ১১ শতাংশ কমে। এছাড়া শিক্ষা নারী সহিংসতা হ্রাস করতে পারে, সমতা প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে, বাল্যবিবাহ ও মাতৃমৃত্যুর হার কমায়। যত বেশি শিক্ষা, তত বেশি সুযোগ—আর ততই কেউ সমাজে হয় আর্থিক নয় অভিজ্ঞতাভিত্তিক অবদান রাখতে পারে। শিক্ষা মানুষকে সমাজের জন্য ইতিবাচক অবদান রাখতে উৎসাহিত করে এবং গঠনমূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায়।

শিক্ষা একটি দেশের প্রতিযোগ্যতা এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক। বাংলাদেশের মতো দেশকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতামুক্ত করতে এটি সর্ব উপযোগী। শিক্ষিত মানুষ জীবিকা উন্নত করে পরিবারের জন্য একটি ভালো ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে। শিক্ষা আত্মোপলব্ধি বাড়ায়, মানুষকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে এবং আত্মবিশ্বাসী করে। বিশেষ করে নারীরা শিক্ষার মাধ্যমে আত্মবিশ্বাসী হয়ে চাকরি, সম্পর্ক বা ব্যক্তিগত উন্নয়নে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এভাবে শিক্ষা একটি ব্যক্তিকে জীবনোপযোগী করে জটিল পথচলার জন্য প্রস্তুত করে। এটি শিক্ষা জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলে। শিক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশের বিশাল ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সচেতনতা ও সহনশীলতা বাড়িয়ে প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা ও পরিবেশবান্ধব কাজে উদ্বুদ্ধ করা যাবে। শিক্ষিত কর্মীবাহিনী তাদের জলবায়ুঘটিত জ্ঞানকে বাস্তব কাজে প্রয়োগ করে ক্ষতি কমাতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষা উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে লাগসই উন্নয়নের পন্থা তৈরি করতে পারে।

শিক্ষা আগামীতেও ব্যক্তি ও অর্থনীতির জন্য সুযোগ তৈরির মূল চালিকাশক্তি হয়ে থাকবে। দুঃখজনকভাবে”শিক্ষা মানেই উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি এ বোঝাপড়া বাজেটে শিক্ষাকে প্রাধান্য দেয়াতে পারেনি। এখন দরকার নতুন দৃষ্টিতে শিক্ষা, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা খাতের মধ্যে আলোচনার। শিক্ষায় বিনিয়োগকে শান্তি বিনির্মাণ, নারীর ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্রকাঠামোর দুর্বলতা দূরীকরণের সঙ্গে মেলাতে হবে। শিক্ষা জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতির আলোচনার অংশ হওয়া উচিত। শিক্ষা সর্বান্তঃকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক খাত, যার অন্য খাতে প্রভাব সর্বব্যাপী। আর তাই শিক্ষাকে সামাজিক ব্যবসা হিসেবে চিন্তা করার বিকল্প নেই। এতে শুধু শিক্ষা খাতে বিনিয়োগই বাড়বে না, আমরা একটা চৌকস পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ করব। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা-সহায়ক কার্যাবলির, যেমন গবেষণা, বৃত্তি, ইত্যাদি খাতে ব্যয় বরাদ্দের অসুবিধা কাটিয়ে উঠবে। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ ধরনের খরচ জোগাড় করে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুদান থেকে; অন্যদিকে দাতব্য প্রতিষ্ঠান পায় আয়কর সুবিধা। তেত্রিশ বছর ধরে আমরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দেখছি যেখানে কদাচিৎ এমন উদ্যোগ দেখা যায়। এখন সময় ব্যাপকভাবে এটা আমাদের অভ্যাস হোক, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মুখে ফুটাবে হাসি আর দেশকে বানাবে সেরা।

মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান: উপ-উপাচার্য, আহ্ছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়