এর পেছনে বহুমাত্রিক কারণ রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, মার্কিন শুল্কনীতি ও রফতানিতে চীন-ভারতের আগ্রাসী কৌশল ইত্যাদি কারণে বিশ্ববাজারে এক ধরনের মন্দাবস্থা তৈরি হয়েছে। উপরন্তু সম্প্রতি যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত। এর প্রভাব পড়ছে দেশের তৈরি পোশাক রফতানিতে। আর তৈরি পোশাক দেশের প্রধান রফতানি পণ্য হওয়ায় এর নিম্নমুখিতা পুরো রফতানি খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এ নিম্নমুখী প্রবণতা দীর্ঘায়িত হতে পারে।
পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে একক দেশ হিসেবে দেশের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। মোট রফতানীকৃত পোশাকের প্রায় ২০ শতাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রে। তবে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে দেশটিতে পোশাক রফতানি হয়েছে প্রায় ৫০৩ কোটি ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৫০৬ কোটি ৭৫ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পোশাক রফতানি কমেছে দশমিক ৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোয় চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে পোশাক রফতানি কমেছে ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এ সময়ে দেশগুলোয় পোশাক রফতানি হয়েছে ১ হাজার ২৬৮ কোটি ৬৩ লাখ ডলার মূল্যের, যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ১ হাজার ৩৪২ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের পণ্য। এর বাইরে কানাডা ও যুক্তরাজ্য এবং কিছু অপ্রচলিত বাজারে তৈরি পোশাক রফতানি প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নিম্নমুখী।
এসব মিলিয়ে টানা আট মাস ধরে সামগ্রিক রফতানি প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী। এ সময় রফতানি ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ কমেছে বলে ইপিবির তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। এতে আগে থেকে বহুমুখী চাপে থাকা দেশের অর্থনীতিতে ঝুঁকি বাড়ছে। কেননা দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের অন্যতম উৎস হলো রফতানি আয়।
টানা আট মাস ধরে রফতানি অব্যাহতভাবে নিম্নমুখী হওয়ায় একটি বিষয় অন্তত স্পষ্ট যে রফতানি খাতের প্রতিবন্ধকতা ক্রমেই বাড়ছে। আর এর কেন্দ্রে রয়েছে তৈরি পোশাক খাত। দেশের মোট রফতানির সিংহভাগ নির্ভর করে এ খাতের ওপর। ফলে যুক্তরাষ্ট্র বা ইইউভুক্ত দেশগুলোয় এর চাহিদা কমে গেলে পুরো রফতানি খাতই চাপের মধ্যে পড়ে।
এর সঙ্গে নতুন করে যোগ দিয়েছে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। লোহিত সাগর ও সুয়েজ করিডোর ঘিরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন তৈরি হওয়ায় পরিবহন সময় ও ব্যয় বাড়ছে। বিকল্প পথে পণ্য পরিবহনে সময় বেড়ে যাওয়ায় ফাস্ট ফ্যাশনভিত্তিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যে অস্থিরতা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা রফতানিকারকদের জন্য আরেকটি বড় চাপ।
তবে সংকটের উৎস কেবল বৈশ্বিক নয়। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতাও সমানভাবে দায়ী। উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং এলসি নিষ্পত্তিতে ধীরগতি শিল্প সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বন্দর ও লজিস্টিক ব্যবস্থার অদক্ষতা দীর্ঘ লিড টাইম তৈরি করছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অন্যতম বড় দুর্বলতা। এ পরিস্থিতিতে রফতানি খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ার কারণ হলো একক পণ্য ও সীমিত গন্তব্যভিত্তিক রফতানি কাঠামো। দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকনির্ভরতা বাংলাদেশের রফতানিকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। বৈশ্বিক চাহিদা কমলেই বা বাজারে সামান্য পরিবর্তন এলেই এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে। অথচ সম্ভাবনাময় খাত—চামড়া, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, আইটি সেবা বা কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য রফতানি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি। এ বাস্তবতা পর্যালোচনায় নীতিনির্ধারকরাও দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে রফতানি পণ্য ও গন্তব্যে বৈচিত্র্য আনা আবশ্যক। যদিও এর বাস্তবায়নে তেমন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ লক্ষণীয় না। বলা বাহুল্য, এ পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে দেশের অর্থনীতি বারবার বিদ্যমান ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। আর নতুন করে রফতানি কাঠামো গড়তে হলে কয়েকটি পদক্ষেপ আবশ্যক।
প্রথমত, স্বল্পমেয়াদে রফতানিকারকদের জন্য আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা জোরদার করতে হবে। ব্যাংকিং প্রক্রিয়া সহজ, প্রতিযোগিতামূলক সুদে অর্থায়ন নিশ্চিত এবং জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা জরুরি। দ্বিতীয়ত, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিক দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে লিড টাইম কমাতে হবে—এটি এখন প্রতিযোগিতা সক্ষমতার মূল নির্ধারক। আর দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে রফতানি পণ্য ও গন্তব্যে বৈচিত্র্য আনা। এমন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যেগুলোর চাহিদা বৈশ্বিক সংকটেও স্থিতিশীল থাকে, যেমন সেবা খাত। একই সঙ্গে নতুন বাজারে প্রবেশের জন্য বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করতে হবে, যাতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিনির্ভরতা কমানো যায়।
সব মিলিয়ে বর্তমান রফতানি পতনকে সাময়িক ধাক্কা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও বৈশ্বিক ঝুঁকির সম্মিলিত প্রতিফলন। এ ঝুঁকি মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ কী হতে পারে তা এখনই বিবেচনায় নিতে হবে। নয়তো এ চাপ আরো গভীর হবে। বাংলাদেশের রফতানি খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় তাই দ্রুত, বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী নীতি নেয়া অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।










