প্রতি বছর অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় দেশের ৬৭ শতাংশ মানুষ। আর অসংক্রামক রোগের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানেই রয়েছে ক্যান্সার। ১২ শতাংশ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সার রেজিস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি এক লাখে ১১৪ জন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। এ হিসাবে দেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৩০ লাখের মধ্যে ক্যান্সারের রোগী আছে ১ লাখ ৯৭ হাজার ২০০ জন। এদিকে দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে এবং ২০৫০ সালে দেশে ২০২২ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হতে পারে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুঃখজনকভাবে এ রোগীর সংখ্যা ক্রমে বাড়লেও এর চিকিৎসাসেবা প্রদানের সক্ষমতা নেই দেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বেশির ভাগ সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেডিওথেরাপি দেয়ার যন্ত্রগুলো নষ্ট। রোগীর চাপ বাড়লেও সবাইকে চিকিৎসা দিতে পারছে না তারা। একদিকে নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম, অন্যদিকে নেই লোকবল। আবার কোথাও লোকবল থাকলেও যন্ত্রাংশের অভাবে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। আবার দেশে এর চিকিৎসা ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে বেশি। সব মিলিয়ে চিকিৎসার জন্য ভারত, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের ওপর নির্ভরতা দিনে দিনে বেড়েছে। বাংলাদেশ আউটবাউন্ড ট্যুর অপারেটরস ফোরামের (বিওটিওএফ) হিসাবে, প্রতি বছর গড়ে আট লাখ মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যায়, যাদের সিংহভাগই ক্যান্সার রোগী। তাদের বিদেশে যাওয়ার প্রধান কারণ দেশে রোগটির চিকিৎসার সুযোগ সীমিত।

আবার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা ব্যয়ে রয়েছে বড় ব্যবধান। যেখানে সরকারি হাসপাতালগুলোয় রেডিওথেরাপির খরচ ১৫-৩০ হাজার টাকা, সেখানে বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় এ খরচ পৌঁছায় ১-৩ লাখ টাকায়। সিটি স্ক্যানের মতো পরীক্ষার খরচও অনেক বেশি। তুলনামূলকভাবে ভারতে এ খরচ অনেক কম হওয়ায় রোগীরা সেখানে যেতে আগ্রহী হয়। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েনে ভারতের মেডিকেল ভিসা পেতেও এখন নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। এতে এক ধরনের দিশাহারা হয়ে পড়েছে রোগীরা। আটকে আছে অনেক রোগীর ফলোআপ।

অথচ দেশে সুলভে সুচিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ থাকলে ক্যান্সার রোগীদের বিদেশমুখিতার কোনো প্রয়োজনই পড়ত না। অবকাঠামোগত সংকট, জনবলের অভাব এবং উচ্চ ব্যয়ের কারণে সুচিকিৎসা পাওয়া থেকে রোগী বঞ্চিত হবে, এটি কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। তাছাড়া এ রোগে আক্রান্ত ও মৃতের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা বিবেচনায় উচিত দেশেই চিকিৎসার পর্যাপ্ত অবকাঠামো গড়ে তোলা। এর জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

শুরুতেই প্রয়োজন দেশের ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয়। কারণ প্রকৃত সংখ্যা জানা না গেলে ঠিক কী পরিমাণ অবকাঠামো ও জনবল প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা কঠিন হবে। আমাদের এখানে কেবল সরকারি-বেসরকারি কিছু হাসপাতালে ক্যান্সার রোগীদের তালিকা পাওয়া যায়। জাতীয় পর্যায়ে ক্যান্সার রোগীদের কোনো রেজিস্ট্রি এখনো তৈরি করা হয়নি। ফলে প্রকৃত সংখ্যা অজানা। বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির আনুমানিক হিসাবে দেশে ক্যান্সারের রোগী রয়েছে ১৩-১৫ লাখ। প্রতি বছর রোগীর সংখ্যা আড়াই-তিন লাখ বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য একটি ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র প্রয়োজন। সে হিসেবে বাংলাদেশে প্রায় ২০০ চিকিৎসা কেন্দ্র প্রয়োজন। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ৩০টি ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে। সুতরাং ক্যান্সার চিকিৎসার পরিধি কতটা বিস্তৃত করা প্রয়োজন তা বুঝতে জাতীয় রেজিস্ট্রির ব্যবস্থা করা আবশ্যক।

এরপর সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যয়ের ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে। অর্থাৎ বেসরকারি খাতে এর চিকিৎসা ব্যয় কমাতে হবে। একই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য চিকিৎসা বাবদ প্রণোদনার পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি ক্যান্সার রোগীদের পরিবহনসেবায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ের ব্যবস্থা করা যায়। তবে ব্যয় সাশ্রয়ের অন্যতম উদ্যোগ হতে পারে ক্যান্সারের রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ। তাহলে চিকিৎসার যাতায়াত ব্যয় বহুলাংশে কমে আসবে। তবে এর জন্যই অবকাঠমোগত উন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

তবে এ রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধে জোর দেয়া প্রয়োজন। এটি প্রতিকার ও প্রতিরোধে উভয় ক্ষেত্রেই সচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। দেশের অধিকাংশ মানুষ ক্যান্সারের উপসর্গ বিষয়ে সচেতন না হওয়ায় প্রাথমিক ডায়াগনোসিসে দেরি করে ফেলে এবং তাদের মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে দেশের কমিউনিটি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোয় ক্যান্সারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। এতে সচেতনতা বাড়বে, পাশাপাশি রোগীদের সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করা যাবে। এছাড়া রোগীকে তার চিকিৎসার জন্য যে প্রচলিত ব্যবস্থাগুলো রয়েছে, যেমন সার্জারি বা শল্যচিকিৎসা, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, হরমোন থেরাপি ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিতে হবে। যথাযথ কাউন্সেলিং ছাড়া রোগীর মনে ভীতি জন্মাতে পারে। ফলে রোগী মনোবল হারিয়ে ফেলবে। প্রতিটি চিকিৎসা ব্যবস্থার সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে রোগীকে ও তার পরিবারকে জানাতে হবে। এছাড়া রোগীর খাবারদাবার কেমন হবে, সে ব্যাপারেও সচেতন থাকা জরুরি। বলা বাহুল্য, সচেতনতার অভাবে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুহার বাড়ছে। অবশ্য এর সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মানের বিষয়টিও সম্পৃক্ত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নত দেশগুলোয় আক্রান্তদের সংখ্যা বেশি কিন্তু মৃত্যুহার কম। কারণ দেশগুলোয় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত। আর অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মান খুব বেশি উন্নত নয় বিধায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। কিন্তু দেরিতে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার সুযোগের অভাবে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে শনাক্তের হার কম এবং মৃত্যুর হার বেশি। তাদের গবেষণালব্ধ তথ্য জানাচ্ছে যে বিশ্বব্যাপী ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে সাড়ে তিন কোটিতে পৌঁছবে। অনুমান করা যায় যে ভবিষ্যতে আক্রান্ত মানুষের অধিকাংশ হবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের। সুতরাং ক্যান্সার প্রতিরোধে ও প্রতিকারে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মানুষকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। যেহেতু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় চিকিৎসা ব্যবস্থা অপ্রতুল।

ক্যান্সারের চিকিৎসার ক্ষেত্রে দেশের সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করতে না পারলে রোগীর সংখ্যা আরো বাড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এক্ষেত্রে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। মানুষকে স্বাস্থ্য ও আর্থিক দিক থেকে স্বস্তি দিতে দেশেই সাশ্রয়ী ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে তাই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের নীতিনির্ধারকদের এ ব্যাপারে মনোযোগ দেয়া বিশেষ প্রয়োজন।