চলমান সংঘাতের ফলে কৃষি কর্মকাণ্ডের জরুরি অনুষঙ্গ ইউরিয়া সারের সরবরাহ নিয়ে উৎকণ্ঠা বেড়েই চলেছে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকরা দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন। শিল্প খাতের চালিকাশক্তি জ্বালানি এবং কৃষি খাতের প্রাণকেন্দ্র সারের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বরাবরই আমদানিনর্ভর। বাংলাদেশ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা তথা ডলারের বিনিময়ে নিজস্ব চাহিদার প্রায় ৮০ ভাগ রাসায়নিক সার আমদানি করে। কেবল সার নয়, বোরো আবাদের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান ডিজেল ও কীটনাশকের দামও এখন নাগালের বাইরে। পাম্প থেকে সরাসরি ডিজেল না পাওয়ায় বাইরে থেকে চড়া দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। তিন-চার বছরে কীটনাশকের দাম বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। দেশে সার আমদানি বাবদ বর্তমান দামে ব্যয় হয় বছরে প্রায় ১৯ হাজার কোটি ডলার।
কৃষি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সার। দেশে ডলার সংকট ও গ্যাসের অভাবে সার উৎপাদন এবং আমদানি দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাহত হচ্ছে। এতে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে সার সরবরাহে। অথচ দেশের চলমান বোরো মৌসুম ও আসন্ন রবি মৌসুমে উচ্চ ফলনের জন্য প্রয়োজন নির্বিঘ্ন সার সরবরাহ। দেশে সবচেয়ে বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদন হয় এ সময়ে। আশঙ্কা রয়েছে সারের অপর্যাপ্ত মজুদের কারণে খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার। এ ঝুঁকি এড়াতে এখন সরকারের প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন সারের মজুদ বাড়ানোয় এবং অব্যাহতভাবে পণ্যটির সরবরাহ নিশ্চিত করায়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশের সরকারি গুদামগুলোয় সারের মজুদ আছে প্রায় ১৮ লাখ টন। যেখানে দেশের চলতি অর্থবছরে সারের মোট চাহিদা হতে পারে ৬৯ লাখ টন। দেশে কৃষি চাষাবাদ ও ফসল উৎপাদনে মোট রাসায়নিক সারের ৭০ শতাংশেরও বেশি ব্যবহার হয় শুধু বোরো ও রবি মৌসুমে। এরই মধ্যে দেশের পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে তিনটির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে গ্যাসের অভাবে। দেশে সারের মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পূরণ হয় আমদানির মাধ্যমে। তবে এখন আমদানিতেও দেখা দিয়েছে মন্থরগতি। ফলে আসন্ন রবি ও বোরো মৌসুমে সারের প্রয়োজনীয় জোগান নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ইউরিয়া সারের চাহিদা প্রায় ২৭ দশমিক ৫০ লাখ টন। মোট চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশই ব্যবহৃত হবে চলতি বোরো মৌসুমে। এ নির্ভরতা দেশের জন্য বড় সংকট। বিশেষত উৎপাদনশীল মৌসুমগুলোকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধাবমান জটিলতাগুলো আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও কার্যক্রমকে নানাভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। বণিক বার্তার প্রতিবেদনটি যেমন বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া সারের দাম ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের কৃষি কার্যক্রমে। দেশে রাসায়নিক সার আমদানি হয় মূলত বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) মাধ্যমে। ইউরিয়া সারের পুরোটাই আমদানি করে বিসিআইসি। সরকারি প্রতিষ্ঠান দুটি বছরের যেকোনো সময় চাইলে সার আমদানি করতে পারে। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের কেবল মে মাসে দরপত্রে অংশ নেয়ার মাধ্যমে সার আমদানি করতে পারে। সরকারি দরপত্রে অংশ নিয়ে আমদানিকারকরা বিশ্ববাজার থেকে সার আমদানি করেন আর বিক্রি করেন সরকার নির্ধারিত দামে। বাড়তি খরচ ভর্তুকি হিসেবে দেয় সরকার। সারের মধ্যে দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় ইউরিয়া। আর দেশে এর উৎপাদনও হয় বেশি। গ্যাসের মাধ্যমে উৎপাদন করা যায় বলে অন্যান্য সারের তুলনায় ইউরিয়া উৎপাদনে বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা বিসিআইসির অধীন বর্তমানে পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানা রয়েছে। তবে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ না হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে ক্রমেই বাড়ছে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম। এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু কৃষি উপকরণ, তেল সংকট ও পরিবহন ব্যবস্থার জটিলতায় সীমাবদ্ধ নয়। জ্বালানি তেল সংকটে সেচ ব্যবহারও বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। মধ্যপ্রাচ্যে কৃষক ও খাদ্য উৎপাদনকারীদের কাঁচামাল আহরণ এবং সার সংগ্রহের ক্ষেত্রে ‘বিপুল পরিমাণে’ খরচ বাড়ছে। যখন প্রাথমিক পর্যায়ে এসব কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয় তার প্রভাব পড়ে খাদ্যনিরাপত্তায়। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের দরুন গোটা বিশ্বে, বিশেষত দক্ষিণ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্য এমনকি কৃষি উপকরণ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। যা সরবরাহ হচ্ছে তার ব্যবস্থাপনাগত ঝুঁকি বিবেচনা করে কৃষক ও খামারিদেরই বাড়তি অর্থ অপচয় করতে হচ্ছে। অর্থনীতির ভাষায় এমন সংকট অনেকাংশে ‘মূল্যস্ফীতির পরের চক্রের শুরু।’ বর্তমানে যেভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, সেখানে উৎপাদক পর্যায় থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত বাড়তি অর্থ খরচের সুযোগ সীমিত। এ কথা সত্য, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতকে ওই অর্থে দীর্ঘমেয়াদি বলা যায় না। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি না থাকলেও দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুদ এবং তা মানুষকে পৌঁছে দেয়ার সদিচ্ছার ঘাটতি এক্ষেত্রে বড় সমস্যা। শুধু যে সারের দাম বেড়েছে এমন নয়। কীটনাশক ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বাড়ায় অনেক কৃষক আবাদ কমাচ্ছেন। এমনটিকে শুধু কৃষকের অসহায়ত্ব বলে বিবেচনার সুযোগ নেই। কারণ আবাদ কমে গেলে জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়বে।
সরকারি হিসাবে সারের কোনো সংকট নেই। এদিকে বিএডিসি জানিয়েছে, গুদামে সার রাখার পর্যাপ্ত জায়গাও নেই। তবে মাঠ পর্যায়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। সরকার নির্ধারিত এক বস্তা ইউরিয়া সারের দাম ১ হাজার ২৫০ টাকা হলেও কৃষকদের গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৪৬০ টাকা। ডিএপি সারের ক্ষেত্রেও চিত্র একই—বস্তাপ্রতি ২০০ টাকা বেশি নেয়া হচ্ছে। এ অতিরিক্ত মুনাফা কার পকেটে যাচ্ছে? কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা সারের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন। সংবাদমাধ্যমের দেয়া তথ্যানুযায়ী, কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি ইউরিয়া ২৭ টাকা ও ডিএপি সার ২৫ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সার সংগ্রহ করে অন্তত ৬০ শতাংশ ভর্তুকি দেয়ার পরও কেন কৃষকের কাছে ইউরিয়া পৌঁছাচ্ছে না সেটি একটি বড় প্রশ্ন। সমস্যা হলো সরকার দাম নির্ধারণ করলেও এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী সরবরাহ শৃঙ্খলের বেহাল দেখে বস্তাপ্রতি সারের দাম বাড়াচ্ছে। এগুলোও কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে। বাজারে সার নিয়ে যারা অপতৎরতা চালায় তাদের প্রতিবিধান নিশ্চিত করা জরুরি। তবে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পক্ষদের উদাসীনতা কৃষি উৎপাদনে এক ধরনের স্থবিরতা গড়ে রেখেছে। বিএডিসি বলছে, দাম দেখার দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের। আবার কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ বলছে তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগতই নয়। এ সংস্কৃতি থেকে বেরোতে হবে। নতুন সরকারের কাছে এটিই প্রত্যাশা, কৃষকরা যেন উৎপাদন মৌসুমে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ পান।










