ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কাঠামোগত এবং চোখধাঁধানো দৃশ্যমান উন্নয়ন অনেক সময়ই জনতুষ্টি তৈরি এবং কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিস্ট শাসন ব্যবস্থাকে দীর্ঘায়িত করার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা ও সুশাসনের বিশ্বজনীন ধারণা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে মানবিক মর্যাদা, মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতাকে পাশ কাটিয়ে কেবল বস্তুগত অবকাঠামোর ওপর ভর করে কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বিগত দেড় দশকের বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এবং বৈশ্বিক রাজনীতির বিভিন্ন ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তের আলোকে এ প্রবন্ধে বিনীতভাবে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা হয়েছে—কেন মেগা প্রকল্পের বাহ্যিক উজ্জ্বলতা কোনো স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্ধকার অধ্যায়কে চিরতরে আড়াল করতে পারে না এবং কেন ঋণের ওপর ভরসা করে গড়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত ‘উন্নয়ন বিলাস’ শেষ পর্যন্ত গভীর সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি করে।
তাত্ত্বিক কাঠামো: বৈধতা, উন্নয়ন ও সুশাসন
কোনো শাসন ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির খতিয়ানের ওপর নির্ভর করে না, বরং তা নির্ভর করে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতার ওপর। এ সত্যটি রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতির বেশকিছু প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বের মাধ্যমে অনুধাবন করা সম্ভব:
এক. ম্যাক্স ওয়েবারের ‘বৈধতার সংকট’ ও হেবারমাসের তত্ত্ব
সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার কর্তৃত্বের বৈধতার যে তিনটি উৎসের (ঐতিহ্যগত, ক্যারিশম্যাটিক ও আইনগত-যৌক্তিক) কথা বলেছেন, আধুনিক রাষ্ট্রে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনগত-যৌক্তিক বৈধতা (লিগ্যাল-র্যাশনাল লেজিটিমিসি)। যখন কোনো শাসন ব্যবস্থা জনগণের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার, ভোটাধিকার ও আইনের শাসনকে সংকুচিত করে, তখন তার বৈধতার মূল মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিটিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
পরবর্তী সময়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের দার্শনিক ইয়ুর্গেন হেবারমাস তার বৈধতার সংকট তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা যদি নিজের কাঠামোগত ও গণতান্ত্রিক ঘাটতিকে আড়াল করার জন্য কেবল অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা বা দৃশ্যমান বস্তুগত সাফল্যকে (পারফর্ম্যান্স লেজিটিমিসি) ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তবে তা সাময়িক হতে বাধ্য। রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের দীর্ঘস্থায়ী অভাব সমাজে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত ক্ষোভ তৈরি করে, যা মেগা প্রকল্পের আলো দিয়ে চিরকাল ঢেকে রাখা যায় না।
দুই. ইনক্লুসিভ বনাম এক্সট্রাক্টিভ ইনস্টিটিউশন (অ্যাসেমোগ্লু ও রবিনসন): অর্থনীতিবিদ ড্যারন অ্যাসেমোগ্লু এবং জেমস রবিনসন তাদের যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘হোয়াই ন্যাশনস ফেইল’-এ দেখিয়েছেন যে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান’ অপরিহার্য, যা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করে। বিপরীতে, কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থায় প্রায়ই ‘শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান’ গড়ে ওঠে, যা সমাজে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা গুটিকয়েক সুবিধাভোগী মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত করে।
এ ধরনের ব্যবস্থায় মেগা প্রকল্পগুলো অনেক সময় ‘রেন্ট-সিকিং’ বা নীতিহীন অর্থনৈতিক মুনাফা লোটার প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয়। এখানে প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বাজেট নির্ধারণ করে একধরনের ‘মেগা দুর্নীতি’র ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়, যার মাধ্যমে জাতীয় সম্পদ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পকেটে চলে যায় (এলিট ক্যাপচার) এবং দেশের অর্থনীতি ক্রমান্বয়ে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ে।
তিন. বুদ্ধিজীবী, গণমাধ্যম ও ‘ম্যানুফ্যাকচার্ড কনসেন্ট’
নোয়াম চমস্কি এবং এডওয়ার্ড এস হারম্যান তাদের বিখ্যাত ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, কীভাবে ক্ষমতাশালী শাসকগোষ্ঠী তথ্য নিয়ন্ত্রণ এবং অনুগত বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমের সহায়তায় নিজেদের পক্ষে একধরনের কৃত্রিম জনসম্মতি তৈরি করে। কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায় একদল সুবিধাভোগী ও ভাড়াটে বুদ্ধিজীবী অনবরত মেগা প্রকল্পের দৃশ্যমান সুফল এবং অবাস্তব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বয়ান (ন্যারেটিভ) প্রচার করে সুশাসনের অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক পচন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে আড়াল করতে চায়। ফরাসি দার্শনিক লুই আলথুসার যাকে আইডিওলজিক্যাল স্টেট অ্যাপারেটাসেস’ বা মতাদর্শিক রাষ্ট্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্র বলেছেন—এ বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যম মূলত সেই ভূমিকা পালন করে স্বৈরাচারকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে।
বিশ্ব ইতিহাসের শিক্ষা: পতন ও পুনরুত্থানের অসম্ভাব্যতা
ইতিহাসের একটি নির্মম সত্য হলো ভূগোল বা সময়কাল যাই হোক না কেন, গণ-আকাঙ্ক্ষাকে দমন করে কেবল বস্তুগত অবকাঠামোর আড়ালে নিজেদের টিকিয়ে রাখার চেষ্টা অতীতে বহু শাসকই করেছেন, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। নিচে বিশ্ব ইতিহাসের কিছু সুনির্দিষ্ট ও তাত্ত্বিক দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো—
এক. ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোস (১৯৬৫-১৯৮৬)
১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে ফিলিপাইনে মার্কোস সরকার প্রচুর দৃশ্যমান অবকাঠামো, কালচারাল সেন্টার ও মহাসড়ক গড়ে তুলেছিল। রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে সেগুলোকে ফিলিপাইনের ‘সোনালি অধ্যায়’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা হতো। কিন্তু পর্দার আড়ালে ছিল ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং করদাতাদের অর্থের বিপুল অপচয়। বৈদেশিক ঋণের বোঝা যখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং রাজনৈতিক অধিকার সম্পূর্ণ কেড়ে নেয়া হয়, তখন ১৯৮৬ সালের ‘পিপল পাওয়ার রেভল্যুশন’ বা ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সেই শাসনের অবসান ঘটে।
দুই. রোমানিয়ার নিকোলাই চসেস্কু (১৯৬৫-১৯৮৯)
চসেস্কুর শাসনামলে বুখারেস্টে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ও ব্যয়বহুল প্রশাসনিক ভবন ‘পিপলস প্যালেস’সহ বহু বড় বড় নগরায়ণ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল। এ উন্নয়ন বিলাসের জন্য নেয়া বৈদেশিক ঋণ শোধ করতে গিয়ে দেশের সাধারণ মানুষকে তীব্র শীত, খাদ্য সংকট এবং বিদ্যুৎহীনতার মতো চরম অর্থনৈতিক কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। বাহ্যিক অবকাঠামোর দেদীপ্যমানতা তার পতন ঠেকাতে পারেনি; বরং ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরের গণবিক্ষোভে তার নির্মম পতন ঘটে।
তিন. শ্রীলংকার রাজাপাকসে পরিবার (২০০৫-২০১৫, ২০১৯-২০২২): দক্ষিণ এশিয়ার সমসাময়িক ইতিহাসে শ্রীলংকার রাজাপাকসে ভাইদের শাসনকাল এ তত্ত্বের অন্যতম নিখুঁত উদাহরণ। গৃহযুদ্ধ, পরবর্তী সময়ে তারা হাম্বানটোটা বন্দর, মত্তলা রাজাপাকসে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (যা পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অন্যতম জনমানবহীন বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিতি পায়) এবং কলম্বো পোর্ট সিটির মতো বিশাল ও ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প হাতে নেন। অনুগামী বুদ্ধিজীবীদের মাধ্যমে এ প্রকল্পগুলোকে ‘সিংহের অর্থনৈতিক জাগরণ’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু পর্দার আড়ালে ছিল ব্যাপক স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ এবং বিশাল অংকের অনুৎপাদনশীল বৈদেশিক ঋণ। অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার মাশুল হিসেবে ঋণের ফাঁদ ও রিজার্ভ সংকট যখন দেশের সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে আঘাত হানে, তখন ২০২২ সালে এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের (‘আরাগালয়া’) মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।
চার. ভেনিজুয়েলা ও কঙ্গোর উদাহরণ: তেলসমৃদ্ধ ভেনিজুয়েলায় হুগো চ্যাভেজ ও নিকোলাস মাদুরোর আমলে বিশাল সব মেগা প্রকল্প ও আবাসন প্রকল্পকে শাসনের প্রধান কৃতিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। কিন্তু বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং গণমাধ্যমকে সম্পূর্ণ দলীয়করণ করে একদলীয় কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করায় জবাবদিহিহীন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কদর্য রূপটি বেরিয়ে আসে, যা দেশটিকে ভয়ংকর হাইপার-ইনফ্লেশন বা অতি মূল্যস্ফীতির দিকে ঠেলে দেয়।
একইভাবে আফ্রিকার কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের মবুতু সেসে সেকো তিন দশকের শাসনামলে পশ্চিমা ঋণ ও অনুদানের ওপর ভর করে বিশাল অবকাঠামো ও বাঁধ প্রকল্প (যেমন ইন্গা বাঁধ) নির্মাণ করেছিলেন। অথচ বাস্তব ক্ষেত্রে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে এক চরম ‘ক্লেপ্টোক্রেসি’ (চোরতন্ত্র বা লুণ্ঠনমূলক শাসন) কায়েম করা হয়েছিল, যেখানে রাষ্ট্রের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার শাসকের ব্যক্তিগত বিদেশী ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাচার হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৯৭ সালে তার করুণ পতন ঘটে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: উন্নয়ন বয়ান বনাম অর্থনৈতিক সংকট
বিশ্ব ইতিহাসের এ ধারাক্রমের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বরং তথাকথিত উন্নয়নের নামে বাংলাদেশে অপশাসনের এক ধ্রুপদী উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। বিগত দেড় দশকের শাসন ব্যবস্থায় মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেল এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নকে শাসনের মূল কৃতিত্ব এবং রাজনৈতিক বৈধতার একমাত্র হাতিয়ার (ডেভেলপমেন্ট ন্যারেটিভ) হিসেবে বারবার উপস্থাপন করা হয়েছে। রাষ্ট্র একটি অসৎ-অদক্ষ (klepto-kakistocracy) সরকারের হাতে পড়ে যায়। যারা দেশের চেয়ে গোষ্ঠীস্বার্থকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দেয়। জনগণকে মূল্যহীন জড়বস্তুতে পরিণত করে।
মেগা প্রকল্প ও ঋণের ফাঁদ: অর্থনীতিবিদ ডেনিস রড্রিকের মতো গবেষকরা মনে করেন, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত না করে নেয়া বড় ঋণ সামষ্টিক অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলে। বাংলাদেশে এ প্রকল্পগুলোর পেছনে যে বিপুল পরিমাণ ব্যয় দেখানো হয়েছে, তার বড় অংশই এসেছে অভ্যন্তরীণ ও বিপজ্জনক শর্তের বৈদেশিক ঋণ থেকে। অনেক স্বাধীন অর্থনীতিবিদের মতে, এ প্রকল্পগুলোর প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বাজেট নির্ধারণ করে একধরনের ‘মেগা দুর্নীতি’ ও অর্থ পাচারের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছিল।
ফলস্বরূপ বাংলাদেশের সামগ্রিক ঋণ-হার এবং ঋণের বোঝা (ডেট টু জিডিপি রেশিও) বর্তমানে এমন এক বিপজ্জনক সীমায় পৌঁছেছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। সাধারণ মানুষ অর্থনীতির জটিল হিসাব-নিকাশ বা জিডিপির মারপ্যাঁচ হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে বোঝে না, কিন্তু ঋণের টাকা যখন উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না হয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পকেটে চলে যায়, তখন তার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হয় সাধারণ জনগণকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ সংকট এবং নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দামের মাধ্যমে।
অন্ধকার অংশকে আড়াল করার ব্যর্থতা: ফেসবুক, সংবাদপত্র এবং রাষ্ট্রীয় প্রচার যন্ত্রের মাধ্যমে মেগা প্রকল্পের দৃশ্যমান উজ্জ্বলতাকে সামনে এনে জনগণের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার হরণ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অনুপস্থিতি, গুম, খুন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মতো অন্ধকার দিকগুলোকে অনবরত আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার তীব্র সংকট এবং অধিকারহীনতার বাস্তব অভিজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত সব সূক্ষ্ম ও সাজানো প্রোপাগান্ডাকে ধূলিসাৎ করে দেয়। এসব বিষয়ে যাদের বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার কথা ছিল সেই বুদ্ধিজীবীদের একাংশ বা বৃহদাংশ জনগণের স্বার্থবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিহীনতা ও ‘গনিমিয়া সিনড্রোম’
বিখ্যাত ইতালীয় রাজনৈতিক চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসি তার ‘কালচারাল হেজিমনি’ (সাংস্কৃতিক আধিপত্য) তত্ত্বে দেখিয়েছেন কীভাবে শাসকগোষ্ঠী বুদ্ধিজীবীদের ব্যবহার করে শোষিত মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে শোষিতরা নিজেদের শোষণকে ‘উন্নয়ন’ বা ‘নিয়তি’ বলে মেনে নেয়। এ মনস্তত্ত্বকে সরল বাংলায় ‘গনিমিয়া সিনড্রোম’ বা উন্নয়ন বিলাসের অন্ধত্ব বলা যেতে পারে, যেখানে নাগরিকরা নিজের অধিকার হারানোর বেদনা ভুলে কেবল দৃশ্যমান কাঠামোর প্রশংসায় মেতে থাকে।
পতন ঘটার পর এ সিনড্রোমে আক্রান্ত বুদ্ধিজীবী বা প্রচারমাধ্যমের একাংশ যদি অতীত উন্নয়নের গুণগান গেয়ে পতিত শক্তিকে পুনর্বাসনের সূক্ষ্ম চেষ্টাও করে, তবু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—একবার যখন কোনো স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থার হিংস্রতা ও নিপীড়নের চিত্র জনগণের সামনে উন্মোচন হয়ে যায় এবং গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার মূলোৎপাটন ঘটে, তখন আদর্শিক বা রাজনৈতিকভাবে সেই হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করা আর কখনই সম্ভব হয় না। সচেতন জনস্মৃতিতে (কালেক্টিভ মেমরি) গেঁথে থাকা অন্যায়ের ক্ষত ও অধিকার হরণের বেদনা সব ধরনের রাজনৈতিক পুনর্বাসনকে চিরতরে প্রত্যাখ্যান করে।
ইতিহাসের অবধারিত শিক্ষা এই যে কোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি ও স্থায়িত্ব কেবল ইট, বালু, পাথর আর সিমেন্টের কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, আইনের শাসন এবং জনগণের মৌলিক রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারের সুরক্ষার ওপর। মেগা প্রকল্পের জাঁকজমকপূর্ণ আবরণে মেগা দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সাময়িকভাবে ঢেকে রাখা সম্ভব হলেও তা স্থায়ী রূপ পায় না। বাংলাদেশসহ বিশ্ব ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় বিনীতভাবে আমাদের এ শিক্ষাই দেয় যে জনআকাঙ্ক্ষা ও অধিকারকে অবজ্ঞা করে ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেয়া কোনো স্বৈরতান্ত্রিক উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না এবং ইতিহাস সাক্ষী—উৎপাটিত স্বৈরাচার কখনই আর ফিরে আসতে পারে না।
শামীম আল মামুন: সাবেক সচিব










