মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সভ্যতা বিনাশের হুমকি’ এবং শেষ মুহূর্তের পিছু হটা ঘটনাটিকে শুধু সামরিক সংঘাতের পরিণতি হিসেবে নয়, বরং একটি কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের সূচনা হিসেবে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা ইঙ্গিত দিচ্ছে এ সংকটের ফলাফল সরল ‘জয়-পরাজয়’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বরং প্রশ্ন হলো কার হাতে এখন বেশি কার্যকর লিভারেজ জমা হয়েছে? এখন পর্যন্ত এর উত্তর নিশ্চিতভাবেই ইরান। কিন্তু এ লিভারেজের প্রশ্নটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয়। যে বাস্তবতায় ইরানের পাল্লা ভারী হয়েছে, সে একই বাস্তবতা এ সমঝোতার ভঙ্গুরতাকেও সামনে নিয়ে আসে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন সামনে এসেছে, তা কোনো সাময়িক সমঝোতায় মীমাংসার নয়, বরং সাম্প্রতিক শর্তগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে এটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ, যেখানে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে যেকোনো মুহূর্তে এ যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখা অপরিহার্য, অন্যদিকে ইরান এ সময়কে ব্যবহার করছে হরমুজকে কৌশলগত হাতিয়ারে পরিণত করার জন্য। ফলে এ যুদ্ধবিরতি কার্যত ‘স্ট্র্যাটেজিক বিরতি’ও হয়ে উঠতে পারে। যেখান থেকে উভয় পক্ষই পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি নেবে।
এছাড়া শক্তিশালী আন্তর্জাতিক জোটের অনুপস্থিতি এ সমঝোতাকে আরো অনিশ্চিত করে তুলেছে। অতীতের বড় সংঘাতগুলোর মতো এখানে মিত্রদের সমন্বিত অবস্থান দেখা যায়নি, যা যুদ্ধবিরতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারত। ইরান যুদ্ধে ইসরায়েলকে নিয়ে মূলত যুক্তরাষ্ট্র একাই লড়েছে। ন্যাটো মিত্ররা দূরত্ব বজায় রেখেছে, উপসাগরীয় দেশগুলো আক্রান্ত হলেও ইরানে পাল্টাহামলা চালায়নি। আর ইউরোপের অনেক নেতা সরাসরি বিরোধিতার পথে হেঁটেছেন। ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বড় মিত্রজোট গড়তে পেরেছিল। ২০১১ সালে লিবিয়ায় ন্যাটোর অভিযান ছিল তুলনামূলক সমন্বিত, কারণ আরব লিগ সমর্থন দিয়েছিল এবং জাতিসংঘের অনুমোদন ছিল। এর আগে ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবানবিরোধী অভিযানে ন্যাটোর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আর্টিকেল-৫ সক্রিয় করা হয়, ফলে অভিযানটি মিত্রদের বিস্তৃত সমর্থন পেয়েছিল। কিন্তু সিরিয়ায় ২০১৩ সালে রাসায়নিক হামলার পরও ওবামা প্রশাসন একক সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারেনি, কারণ ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। এবারের ইরান সংকটে পরিস্থিতি আরো প্রতিকূল ছিল। জাতিসংঘের অনুমোদন ছিল না। মিত্ররাও ট্রাম্পের পাশে ছিল না। মিত্ররা কেন যোগ দেয়নি, তার কারণ বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি সূত্র মেলে। প্রথমত, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি দীর্ঘদিন ধরে মিত্রদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করেছে। যে নেতা ন্যাটোর মূল্য নিয়েই প্রশ্ন তোলেন, তার নেতৃত্বে যুদ্ধে যোগ দিতে ইউরোপীয় দেশগুলো স্বাভাবিকভাবেই দ্বিধান্বিত ছিল। দ্বিতীয়ত, হরমুজ বন্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইউরোপ ও এশিয়াকে বেশি ভুগিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন তাদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই একতরফা পদক্ষেপ নিয়েছে। তৃতীয়ত, ইরাকের মতো পূর্ববর্তী যুদ্ধগুলোর তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে ইউরোপীয় দেশগুলো মনে করছে, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক হস্তক্ষেপের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য চুকাতে হয় অনেক বেশি।
এ মিত্রহীনতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে যুদ্ধবিরতি কার্যকরে। এবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছে, তা মূলত দ্বিপক্ষীয় এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতানির্ভর। এ দুর্বল ভিত্তি যুদ্ধবিরতির ফলে চুক্তি ভঙ্গের ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর বহুপক্ষীয় চাপও তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত। এছাড়া ইসরায়েলে এ যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে কিনা তা নিয়েও ব্যাপক সংশয় রয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতিকে সংঘাতের অবসান বলা যাচ্ছে না।
যুদ্ধবিরতির আওতায় ইরান হরমুজ প্রণালি ‘সম্পূর্ণ, তাৎক্ষণিক ও নিরাপদভাবে’ খুলে দিতে সম্মত হয়েছে বলে ঘোষণা আসে। তবে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত ১০ দফা শর্ত সামনে আসার পর স্পষ্ট হয় এ সমঝোতা কেবল নৌচলাচল পুনরুদ্ধারের বিষয় নয়; বরং এটি হরমুজকে কেন্দ্র করে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবের একটি নতুন কাঠামো প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দেয়। যেখানে কৌশলগত সুবিধা দৃশ্যত তেহরানের দিকে।
চুক্তির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ শর্তটি হলো হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী প্রতিটি জাহাজকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে ‘সমন্বয়’ করে চলতে হবে। বাস্তবে এ সমন্বয় একটি অনুমতিনির্ভর কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়, যেখানে নৌচলাচল আর স্বয়ংক্রিয় বা অবাধ থাকে না, বরং নির্দিষ্ট এক রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। যুদ্ধের আগে হরমুজ ছিল একটি উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক জলপথ; কিন্তু এ শর্ত কার্যকর হলে সেটি নিয়ন্ত্রিত করিডোরে রূপ নেবে, যেখানে প্রবেশ ও চলাচল নির্ভর করছে তেহরানের সম্মতির ওপর। বিষয়টি স্পষ্ট, যুদ্ধের আগে যে হরমুজ ছিল আন্তর্জাতিক মুক্ত জলপথ, যুদ্ধবিরতির পরে সেটি পরিণত হয়েছে ইরানের ‘চেকপোস্টে’।
এমনকি যুদ্ধবিরতির সময়কালেও ইরান ও ওমানের যৌথভাবে প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজ থেকে ট্রানজিট ফি আদায়ের পরিকল্পনা সামনে এসেছে, যা এ সমঝোতার অর্থনৈতিক মাত্রাকে স্পষ্ট করে। বৈশ্বিক তেল রফতানির প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল; সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরাকের মতো প্রধান রফতানিকারক দেশের জন্য এটি কার্যত একমাত্র সামুদ্রিক প্রবেশপথ। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এ করিডোর দিয়ে পরিবাহিত হয়। এ প্রবাহের ওপর আর্থিক শর্ত আরোপের অর্থ হলো হরমুজ কেবল একটি ট্রানজিট রুট নয়, বরং ধীরে ধীরে ইরান নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক গেটওয়েতে রূপ নিচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, ইরান প্রমাণ করেছে হার্ড-পাওয়ার (অস্ত্র) ধ্বংস করা গেলেও ভূকৌশলগত অবস্থানকে বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া সম্ভব নয়। হরমুজের ওপর ইরানের এ নতুন নিয়ন্ত্রণ মানে হলো এখন থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি দামের রিমোট কন্ট্রোল পরোক্ষভাবে তেহরানের হাতে চলে যাওয়া।
এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের অর্জন মূল্যায়ন দ্বৈত চিত্র সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সামরিক দৃষ্টিতে একটি বড় সাফল্য। তবে কৌশলগত মানদণ্ডে বিচার করলে ফলাফল তাদের জন্য হতাশাজনক হওয়ার কথা। কারণ মার্কিন ড্রোন বা মিসাইল হামলায় তেহরানের সামরিক সক্ষমতা ক্ষয় হয়েছে ঠিকই, বিপরীতে তারা অর্জন করেছে বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহের নাটাই। সামরিক অভিযানের মুখেও ইরান যেভাবে প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজের কব্জায় নিতে পেরেছে, তা মার্কিন হার্ড-পাওয়ারের সীমাবদ্ধতাকেই ফুটিয়ে তোলে। ফলে ইরানের সামরিক শক্তি আংশিকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও তাদের রাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত লিভারেজ বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা প্রকারান্তরে মার্কিন সামরিক বিজয়কে কৌশলগত পরাজয়ে রূপান্তরিত করেছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির রূঢ় বাস্তবতা হলো এটি প্রায়ই একটি ‘জিরো-সাম গেম’ হিসেবে কাজ করে। যেখানে এক পক্ষের অর্জন মানেই অন্য পক্ষের সমপরিমাণ বিসর্জন। ৪০ দিনের যুদ্ধ শেষে যখন ধুলোবালি থিতিয়ে এল, তখন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা যা হারিয়েছে, ইরান ঠিক ততটুকুই অর্জন করেছে। প্রশ্নের মুখে পড়েছে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ‘ডিটারেন্স’ বা ভীতি প্রদর্শনের ক্ষমতা, আর ইরান অর্জন করেছে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ধমনীর চাবিকাঠি। ফলে ইরান যুদ্ধ নিয়ে কার্যতই রাজনৈতিকভাবে আরো ব্যাকফুটে ডোনাল্ড ট্রাম্প। কংগ্রেস বা নিজ প্রশাসনের প্রচলিত প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরম হুমকি দেয়া এবং অল্প সময়ের ব্যবধানে অবস্থান পরিবর্তন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে একে একটি ‘প্যারাডক্সিক্যাল রিট্রিট’ বা বৈপরীত্যপূর্ণ পিছু হটা হিসেবে বর্ণনা করা যায়।
এ ধরনের আচরণে নির্বাহী নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি এ ‘প্যারাডক্সিক্যাল রিট্রিট’ আমেরিকার দীর্ঘদিনের মিত্রদের মধ্যে একটি গভীর ‘অ্যালায়েন্স ডিলেমা’ বা মিত্রতার সংকট তৈরি করতে পারে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ঘরোয়া রাজনীতিতে সমালোচনা শুধু বিরোধী শিবিরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; রিপাবলিকান দলের ভেতর থেকেও এ ধরনের কৌশল নিয়ে তীব্র আপত্তি এসেছে। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগের দাবি তুলেছে, যা সংকটটির রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিঘাতকে আরো স্পষ্ট করে।
এ পুরো প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামাবাদ যেভাবে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করে এ ‘অফ-র্যাম্প’ বা প্রস্থানের পথ তৈরি করে দিয়েছে, তা তাদের কূটনৈতিক বিচক্ষণতারই প্রমাণ। তবে এ সমঝোতা কতটুকু টিকবে, তা নির্ভর করছে আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া আলোচনার ওপর। যদি হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই থেকে যায়, তবে তা হবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয়গুলোর একটি, যা এই যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি করবে।
মাহফুজ রাহমান: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, বণিক বার্তা










