জুলাই আন্দোলনের এক বছর পূর্ণ হলো। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দানা বাঁধে গত বছরের জুলাইয়ে। এ আন্দোলন দমাতে সরকার শুরু থেকেই কঠোর পথ অনুসরণ করে। জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে নিহত হন রংপুরের আবু সাঈদ। এতে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সব শ্রেণী-পেশার মানুষ যুক্ত হতে থাকে। সারা দেশের নাগরিক শক্তির এক অসাধারণ ও দুঃসাহসী ঐক্য গড়ে ওঠে। পুলিশ ও দলীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে নিরীহ আন্দোলনকারীদের ওপর সরকার নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে প্রাণ হারিয়েছে সহস্রাধিক মানুষ। হাত, পা, চোখ হারানোসহ আহত হয়েছে অন্তত ২০ হাজার ছাত্র-জনতা। সেই আত্মত্যাগে বিজয়ী হয় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান, জনজোয়ারে ভেসে যায় ক্ষমতার দম্ভ। গত বছরের ৫ আগস্ট পতন ঘটে দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান স্বৈরশাসক।

গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসকের পতনের পর প্রত্যাশা করা হয়েছিল, দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র গড়ে উঠবে। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত হবে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন আসবে, যাতে আর কখনো কোনো ধরনের স্বৈরতন্ত্র-ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে না পারে।

স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, সেই ঐক্যে ফাটল দৃশ্যমান। যে আশা ও স্বপ্ন নিয়ে তরুণরা বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, এক বছরে তার কতটা বাস্তবায়ন হলো তা নিয়ে খোদ আন্দোলনকারীদের মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে। বৈষম্য ও অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে তরুণরা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই গত এক বছরে নানা বিতর্কে জড়িয়েছেন। এমনকি আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী তরুণরা নানা গ্রুপ-উপগ্রুপে বিভক্তও হয়ে পড়েছেন।

এদিকে গত এক বছরে সরকারের কর্মকাণ্ড বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কার্যক্রমের মধ্যেই সীমিত রয়ে গেছে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে ও সর্বজনীন মতৈক্য প্রতিষ্ঠায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্যে কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে সংবিধান, নির্বাচন, পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনসহ মোট ১১টি কমিশন গঠন হয়। এসব সংস্কার কমিশন এরই মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেই প্রতিবেদনের আলোকে রাজনৈতিক ঐকমত্য গঠন করতে বৈঠক শুরু করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। কমিশনের এসব বৈঠকে কোনো কোনো বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হচ্ছে, কোনোটিতে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারছে না রাজনৈতিক দলগুলো।

অভ্যুত্থানের এক বছর পর সংস্কার কার্যক্রম কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে কিছু অগ্রগতি হলেও কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত পরিবর্তন হয়নি। বৈষম্য, দুর্নীতি ও আমলাতন্ত্রের দাপট এখনো কমেনি। নিহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা কিংবা পুনর্বাসন কার্যক্রম এখনো অসম্পূর্ণ। জুলাই সনদ এখনো ঘোষণা করা হয়নি। স্বৈরশাসকের পতন হলেও এখনো বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা পুরনো বন্দোবস্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে আঁকড়ে থাকা ঘুস, দুর্নীতি ও আমলাতন্ত্রেরও অবসান হয়নি এখনো। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছে, যা আগের মতোই গতানুগতিক। বাজেট প্রণয়নসহ অর্থনীতির নীতি-কৌশল প্রণয়নে এখনো প্রাধান্য পাচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপিয়ে দেয়া শর্ত। এ শর্ত পূরণ করতে গিয়ে দেশে ব্যাংক ঋণের সুদহার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বেকারত্ব, বৈষম্য ও দারিদ্র্য আরো জেঁকে বসছে।

প্রায় ১১ মাস হতে চললেও এখনো গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণের মতো দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। শিক্ষার্থীরা এখনো পুরোপুরি পড়ার টেবিলে ফিরে যায়নি। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের কাছে সবচেয়ে মৌলিক দাবি ছিল জুলাই আন্দোলনে নিহতদের তালিকা তৈরি, যথাযথ ক্ষতিপূরণ, আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। কিন্তু মৌলিক এ দাবি এখনো পূরণ করতে পারেনি সরকার। আন্দোলনের সময় নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়েও নানা মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। এ বছরের ১৫ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে জারীকৃত গেজেট অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৮৩৪। আর জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে ৮২০ জন নিহতের কথা বলা হয়েছে। যদিও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে এ সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি।

ডলারের বাজারের স্থিতিশীলতা, রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণে ভর করে রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে। তবে দেশের অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। গত মে মাসেও দেশের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষ এখনো স্বস্তির বার্তা পায়নি। সরকারের অন্যতম মূল কাজ ছিল মূল্যস্ফীতি কমিয়ে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেয়া। কিন্তু এ কাজে সরকার এখন পর্যন্ত সফল হতে পারেনি। ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী কষ্টে আছে। এদিকে সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সুদহার বাড়িয়েছে। কিন্তু তার সুফল মিলছে না। আবার সুদহার বাড়ানোয় বেসরকারি খাত বিনিয়োগে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হারও এখন মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, যা মুদ্রানীতিতে ঘোষিত লক্ষ্যের তুলনায় অন্তত আড়াই শতাংশ কম। অর্থনীতির মতো বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে রাজনীতিও। জাতীয় নির্বাচন ও আগামীর রাষ্ট্রক্ষমতার ধরন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বিভাজন ক্রমে বাড়ছে। সচিবালয়ে বিক্ষোভ, আন্দোলনের পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডেও (এনবিআর) নজিরবিহীন বিক্ষোভ ও কর্মবিরতি দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক বছর ধরেই দেশের অর্থনীতিতে নানামুখী সংকট চলছিল। ডলার সংকট, রিজার্ভের ক্ষয়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ খরা, রাজস্ব ঘাটতি, সরকারের ঋণের বোঝা, ব্যাংক খাতের দুর্দশা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের লুটপাট, অব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন সংকটে অর্থনীতিতে ক্ষত তৈরি হয়েছিল।

বাংলাদেশের মতোই তরুণদের নেতৃত্বে গণ-আন্দোলনের মুখে তিউনিসিয়া ও শ্রীলংকার কর্তৃত্ববাদী শাসকদের পতন ঘটেছিল। যদিও দুই বছরের মধ্যেই তীব্র প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে সফলতার সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ানোর এক বড় নজির হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রীলংকা। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে শ্রীলংকা ঘুরে দাঁড়াতে পারলেও গণ-অভ্যুত্থানের পর এক যুগেও ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরোতে পারেনি তিউনিসিয়া। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তিউনিসিয়ার প্রায় কাছাকাছি চিত্র লক্ষ করা যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। গত ১১ মাসে শ্রীলংকার মতো সফলতার কোনো লক্ষণ দেশে দৃশ্যমান হয়নি। বরং তিউনিসিয়ার মতো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকেই। কেউ কেউ বলছেন, শ্রীলংকায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় হলেও সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী ছিল। কিন্তু ১৫ বছরে বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানই ধ্বংস হয়ে গেছে। এ কারণে এখানে সরকারের যেকোনো উদ্যোগের ফল পেতে সময় লাগবে।

অভ্যুত্থানের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে যে গতি ও ঐক্য দরকার ছিল, তা এখনো অনুপস্থিত। এ পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ‘‌জুলাই অভ্যুত্থান’-এর অঙ্গীকার ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। তাই প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠার দৃঢ় পদক্ষেপ এবং জনগণের চাওয়া অনুযায়ী একটি স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। সর্বোপরি বৈষম্যমুক্ত দেশ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারে বৃহত্তর ঐক্য হোক জুলাইয়ের অঙ্গীকার।