দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। পণ্যবাহী জাহাজ বহির্নোঙর থেকে জেটিতে আনা, টাগবোট সার্ভিস, পানি সরবরাহ, ক্রেন চার্জ, জাহাজ ভেড়ানো, জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানো কিংবা ওঠানো, পণ্য ডেলিভারিসহ নানা ধরনের কার্যক্রম চলে এখানে। এসব সেবার জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট হারে ট্যারিফ বা মাশুল আদায় করে। সম্প্রতি বন্দরসেবায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত মাশুল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেয়েছে এবং আইন মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি অনুমোদন দিলে বন্দরসেবায় বাড়তি মাশুল কার্যকর হবে।

বাড়তি মাশুল কার্যকর হলে আমদানি-রফতানিকারক ও ভোক্তার ওপর আর্থিক চাপ বৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কেননা বন্দরসেবার ব্যয় বৃদ্ধির অর্থ হলো আমদানি-রফতানি ব্যয় বেড়ে যাবে। আমদানি-রফতানিতে বাড়তি খরচ হলে তার প্রভাব স্বাভাবিকভাবে পণ্যের বাজারদরেও পড়বে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বন্দরের মাশুল আদায়ের প্রধানতম খাত হলো জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানো। এ খাতে প্রতি ২০ ফুট লম্বা কনটেইনারের মাশুল হচ্ছে ৪৩ ডলার ৪০ সেন্ট। এ মাশুল বাড়িয়ে ৭০ ডলার ১১ সেন্ট করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। যদি এ ব্যয় বাড়ে তাহলে পণ্যের দাম বাড়িয়ে সেটি ভোক্তার পকেট থেকেই নেয়া হবে। অর্থাৎ ভোক্তা পর্যায়েও ব্যয়ও বাড়বে। অর্থাৎ বন্দরসেবায় বাড়তি মাশুল কার্যকর হলে একদিকে ব্যবসা ব্যয় বাড়বে এবং দিনশেষে ভোক্তাকে সেই বাড়তি ব্যয় পরিশোধ করতে হবে। অথচ টানা তিন বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে ভোক্তারা। আর দেশে এমনিতেও বাণিজ্য সম্প্রসারণের অন্যতম অন্তরায় কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস (ব্যবসা ব্যয়)। অন্য দেশের তুলনায় এ দেশে ব্যবসা ব্যয় বেশি, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মূল্যস্ফীতির কারণে আরো বেড়েছে। অন্যদিকে রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনার ওঠানোয় ব্যয় বাড়লে সেক্ষেত্রেও রফতানি পণ্যের ব্যয় বাড়বে, যা বিদেশের বাজারে পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমাবে। প্রতিযোগী দেশ যদি একই পণ্য স্বল্প দামে রফতানি করে ক্রেতারা সেদিকেই ঝুঁকবে এটা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তাছাড়া বাংলাদেশী পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত উচ্চ শুল্কহার কমানোর আলোচনায় কোনো অগ্রগতি এখনো পরিলক্ষিত হচ্ছে না। যদি যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কহার কমানো না যায় তাহলে রফতানি বাণিজ্য আরো বাধার সম্মুখীন হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দেশের বৃহৎ রফতানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্ক নিয়ে উদ্বেগ—এমন পরিস্থিতিতে বন্দরসেবার মূল্য একেবারে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হতাশাজনক।

বন্দরের মাশুল বাড়ানো নিয়ে সরকারের ভাষ্য, পৃথিবীর যেকোনো দেশের বন্দরসেবার তুলনায় চট্টগ্রাম বন্দরের সেবার মূল্য অনেক কম, যা বর্তমান সময়ের চাহিদা ও ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এছাড়া বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে ১৯৮৬ সালের পর এবারই প্রথম ট্যারিফ বাড়ানো হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবিও করা হয়েছে, প্রস্তাবিত ট্যারিফ কাঠামো সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে যুগোপযোগী এবং বাস্তবসম্মতভাবে গঠন করা হয়েছে। অথচ বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, বন্দরসেবার ট্যারিফ ধাপে ধাপে না বাড়িয়ে একবারে বাড়ানোয় অসন্তোষ প্রকাশ করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, একবারে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি না করে ধাপে ধাপে ট্যারিফ বাড়ালে তাদের ওপর চাপ পড়ত না। এমনকি তারা ১০ থেকে ২০ শতাংশ মাশুল বৃদ্ধির বিষয়ে মতও দিয়েছিলেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে হঠাৎই মাশুল ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এমনিতেও তারা ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় ও চাহিদা সংকটের কারণে চাপের মধ্যে আছেন। পাশাপাশি হ্যান্ডলিং টাইম, ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া, কনসেশন ইত্যাদি সমস্যার সমাধান ছাড়া মাশুল বৃদ্ধি কতটা গ্রহণযোগ্য সেসব প্রশ্নও তুলছেন ব্যবসায়ীদের অনেকে। তবে সরকার ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষই ১৯৮৬ সালের পর থেকে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ব্যবসা ও বন্দরের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে আলোকপাত করে মাশুল বৃদ্ধির পক্ষে ও বিপক্ষে মতামত দিয়েছে।

এ কথা সত্য যে প্রায় চার দশক ধরে পুরনো ট্যারিফ কাঠামোয় চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সর্বশেষ ১৯৮৬ সালে নির্ধারণ করা ট্যারিফ কাঠামো দিয়ে বর্তমানে সব সেবার মাশুল আদায় হচ্ছে। তবে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে পাঁচটি সেবার মাশুলে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। আর ২০১৩ সালে বন্দর ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তবে সেই সময় তা স্থগিত হয়। ট্যারিফ কাঠামো যুগোপযোগী করতে নতুন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ প্রশংসনীয়। নতুন প্রস্তাবে জটিলতা কমাতে বন্দরের ট্যারিফ লাইনে বিদ্যমান ৫২টি খাত কমিয়ে ২৩টি খাতে আনা হয়েছে। পাঁচটি নতুন খাত যুক্ত করা হয়েছে আর ব্যবহার না থাকায় চারটি খাত বাদ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের উদ্বেগও উপেক্ষা করা যায় না। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে কেবল ব্যবসায় ব্যয় বেড়েছে এমন নয়। দেশে ব্যবসা সম্প্রসারণে নানা প্রতিবন্ধকতা, যেমন জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সংকটও রয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা যে পরিমাণ চাপে রয়েছেন সে তুলনায় চট্টগ্রাম বন্দর বর্তমানে লাভজনক প্রতিষ্ঠান। কেবল গত অর্থবছর সব খরচ মিটিয়ে ২ হাজার ৯১২ কোটি টাকা বাড়তি আয় করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। তাই বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর নামে সেবার মাশুল ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক সেটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠাও স্বাভাবিক। বিশেষত যখন বন্দরের অনেক সেবার মানও পুরনো ট্যারিফ কাঠামোর মতোই প্রাচীন; সেবার মানোন্নয়ন ঘটেনি। তাই মাশুল বাড়ালেই যে সেবার মান বাড়বে সে নিশ্চয়তাও নেই।

অবস্থানগত কারণে চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেল পলিপ্রবণ হওয়ায় এখানে নাব্য সংকট একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিয়মিত ড্রেজিং করলে বন্দর চ্যানেলে জোয়ারের সময় সর্বোচ্চ সাড়ে নয় মিটার গভীরতা পাওয়া যায়। ভাটার সময় গভীরতা নেমে আসে ছয়-সাত মিটারে। এ নাব্য সীমাবদ্ধতায় বন্দরে বড় জাহাজ ভিড়তে পারে না। আবার চট্টগ্রাম বন্দরে একটি কনটেইনার খালাসে গড়ে সময় লাগে ৭-১০ দিন। অথচ ভিয়েতনামের বন্দরে দিনে দিনেই পণ্য খালাস হয়। শ্রীলংকার কলম্বো বন্দরে পণ্য খালাসে গড়ে সময় লাগে তিনদিন। সিঙ্গাপুরে দুইদিনের মধ্যেই কাস্টমস, ক্লিয়ারিং, ডেলিভারির মতো কাজ শেষ হয়ে যায়। এছাড়া কাস্টমস কার্যক্রমের দুর্বলতা এবং দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর ভালো সংযোগ না থাকাও এ বন্দরের অন্যতম সমস্যা। এসব সমস্যা সমাধানে বরং সরকারের মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। সেই সঙ্গে মাশুল বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে সব অংশীজনের মতামতকে প্রাধান্য দেয়া দরকার। মাশুল বাড়ানোর হার যতটা সম্ভব যৌক্তিক করতে হবে।