বাংলাদেশের বর্তমান ও ক্রমপরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে ভারতে সংখ্যালঘু হিন্দুদের নতুন করে ব্যাপক অভিবাসন বা দেশান্তরের সম্ভাবনা কম। ঐতিহাসিকভাবে অভিবাসন প্রধানত সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং অর্থনৈতিক সুযোগের প্রভাবে চালিত হয়। নিপীড়ন এখানে একমাত্র প্রভাবক নয়। সাম্প্রতিক সময় বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা কিছু সংকটে পড়লেও তা বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না। হিন্দু অভিবাসীদের প্রতি ভারতের স্পষ্ট রাজনৈতিক পছন্দ অতীতে বাংলাদেশ থেকে এ জনগোষ্ঠীকে নিজ দেশ ছাড়তে অনুপ্রাণিত করেছে।

মানুষ সাধারণত অন্য দেশে যায় যদি সেখানে তাদের পরিবারের সদস্যরা থাকে কিংবা সেই দেশটি সমৃদ্ধ হয় বা সেখানে অর্থনৈতিক সুযোগ বেশি থাকে। আমি অবাক হইনি যে কিছু হিন্দু বাঙালি বাংলাদেশ ছেড়ে এসেছে এবং আসামে থাকতে শুরু করেছে। এর পেছনে প্রধান ভূমিকা মূলত ভারতের প্রকাশ্য হিন্দু পক্ষপাতিত্ব। আমি এটাও বলছি না যে সংখ্যালঘু নিপীড়ন বাড়লে ব্যাপক হারে অভিবাসন হবে না। তবে এমন সম্ভাবনা ও প্রেক্ষাপট দেখছি না। বিশ্বজুড়েই অভিবাসনের কার্যকারণ নিয়ে অনুসন্ধান করেন অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা। সেখানে নিপীড়ন কখনই প্রাথমিক নির্ধারক নয়। তবু এ বিষয়ে চূড়ান্ত রায় দেয়ার আগে আমি আসলে কিছু ডাটা দেখতে চাইব।

আমার নতুন বই ‘‌ছাউঁক: অন ফুড, ইকোনমিক্স অ্যান্ড সোসাইটি’ সম্প্রতি প্রকাশ পেল। ছাউঁক বা চাউঙ্ক শব্দটি ভারতীয় রান্নায় গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুসঙ্গ। সরিষা ও অন্যান্য মশলা তেলে বা ঘি দিয়ে ভেজে রান্নার স্বাদ বৃদ্ধির জন্য একটি গার্নিশ। রান্না শেষে স্যুপ, তরকারি ইত্যাদিতে যোগ করা হয়। এটা আসলে রান্নাবান্না নিয়ে ভিন্ন ধাঁচের একটি বই। ‘ছাউঁক’ আংশিক স্মৃতিকথা, আংশিক রান্নার বই। এখানে অনেকটা খেলার ছলে খাদ্যের মাধ্যমে অর্থনীতি, সমাজ ও ভারতকে অন্বেষণ করা হয়েছে। এ বইয়ে কিছু অপ্রত্যাশিত সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। যেমন শামি কাবাবের সঙ্গে সঞ্চয় ও বাঙালি খাবার ‘ঘন্টো’র সঙ্গে নারী মুক্তির সংযোগ দেখানো হয়েছে। বইয়ের কভারেও এ বিষয় তুলে এনেছি। ফরাসি চিত্রশিল্পী চায়েন ওলিভিয়ার বইয়ের প্রয়োজনীয় অলংকরণ করেছেন। এর আগে ‘কুকিং টু সেভ ইয়োর লাইফ’ বইয়ের কভার করেছিলেন তিনি। আমার স্ত্রী এস্থার ডাফলোর ‘পুওর ইকোনমিকস ফর কিডস’-এর অলংকরণও করেছিলেন তিনি। নতুনই বই ‘ছাউঁক’-এ আমাদের দেশী রেসিপিগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক প্রসঙ্গের সংযোগ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যেন অনেকটা কোনো খাবারে একটু-আধটু মসলা দিয়ে খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে দেয়া। বড় বড় ইস্যুর আলোচনা সরল করার ক্ষেত্রে আসলে খাদ্য বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করি।

অভিবাসন নিয়ে যেটা বলছিলাম, ঢাকা থেকে অভিজাত হিন্দুদের অভিবাসন ঢাকা শহরের খাদ্য সংস্কৃতিকে পরিবর্তন করেছে। ঠিক যেমন কলকাতার মতো একটি শহরেও ভারতীয় বাঙালি পরিবারে পরিবর্তন এনেছে। উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। যদিও তার বেশির ভাগই ফিরে গিয়েছিল। ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগের সময় প্রায় ২২ লাখ বাঙালি হিন্দু পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে গিয়েছিল। একইভাবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ১৯ লাখ বাঙালি মুসলমান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাল্টা অভিবাসনের শিকার হয়েছিলেন।

দেশ ভাগের ৭৭ বছর পর বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা ২২ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে। মূলত বিভিন্ন ঐতিহাসিক পালাবর্তে ও নিপীড়নের আশঙ্কায় হিন্দুদের এ অভিবাসন হয়েছে।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি স্থলসীমান্ত রয়েছে। এর অর্ধেকেরও বেশি পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে। বাকি অংশ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও মিজোরামের সঙ্গে।

১৯৭১ সালে বড় আকারের অভিবাসনের পেছনে বহু জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্র যুদ্ধের ভূমিকা রয়েছে। আমি মনে করি না, বাংলাদেশ বর্তমানে এ ধরনের কোনো সংকট আছে। তাই সে ধরনের বড় আকারের অভিবাসনের সম্ভাবনা নেই।

ফের যদি বইয়ের আলাপে ফেরত যাই, তাহলে বলতে হবে ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করার একটি মাধ্যম হিসেবে খাদ্য ব্যবহারে তুলনামূলকভাবে ব্যর্থ হয়েছে ভারত। উদাহরণস্বরূপ পশ্চিমের কথা যদি বলি, হোক সেটা ইউরোপ কিংবা আমেরিকা; জাপানি রান্নার কৌশল ব্যাপকভাবে গৃহীত ও ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ ভারতীয় রন্ধনশৈলী শুধু অল্প ক’জন অ-ভারতীয় শেফ ব্যবহার করেন, তাও আবার যুক্তরাজ্যের অল্প কিছু জায়গায়।

অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়: এমআইটির ফোর্ড ফাউন্ডেশন ইন্টারন্যাশনাল প্রফেসর অব ইকোনমিকস। ২০১৯ সালে অর্থনীতিতে যৌথভাবে নোবেলজয়ী।

[ষোড়শ এপিজে কলকাতা সাহিত্য উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে নিজের সর্বশেষ বই ‘ছাউঁক: অন ফুড, ইকোনমিকস অ্যান্ড সোসাইটি’ বই প্রকাশ নিয়ে পিটিআইকে দেয়া একটি এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে]

abhijit_banerjee-with-the-illustrator

নতুন প্রকাশিত বই ‘ছাউঁক’ -এর আলংকারিক ফরাসি চিত্রশিল্পী চায়েন ওলিভিয়ারের সঙ্গে লেখক ছবি: দ্য উইক