ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশে (টিসিবি) তিন সপ্তাহ ধরে দায়িত্ব পালন করছি। স্বল্প সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে এত গুণীজনদের সামনে খাদ্যপণ্যের যৌক্তিক দাম শীর্ষক আলোচনায় কথা বলা একটু চ্যালেঞ্জিং। তবে টিসিবি সম্পর্কে কিছু বলতে এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে সংস্থাটি কীভাবে কাজ করছে, সে সম্পর্কে ধারণা দিতে চেষ্টা করব।
বিশেষ একটি উদ্দেশ্য নিয়ে দেশে ১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি টিসিবির যাত্রা শুরু হয়। আপনারা অনেকেই জেনে থাকবেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রথম রফতানিকারক টিসিবি। পরবর্তী সময়ে সরকার ও জনগণের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুসারে টিসিবির কার্যক্রমের ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। দেশের মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকায় চাল, ডাল, চিনি ও তেল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। রমজানে এর সঙ্গে ছোলা ও খেজুর যুক্ত হয়।
সরকারের নির্দেশনায় টিসিবি এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাধারণ ভোক্তা ও কিছু কিছু সুবিধাভোগীর কাছে স্মার্ট কার্ড ও খোলাবাজারে ট্রাকের মাধ্যমে বিক্রি করে। এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সংগ্রহ করে জরুরি ভিত্তিতে বাফার স্টক গঠন করে টিসিবি। এগুলো পরবর্তী সময়ে ডিলারের মাধ্যমে উপকারভোগী ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে বিতরণ করাই প্রধান কাজ।
প্রায় এক কোটি পরিবারের জন্য এক কোটি স্মার্ট কার্ড তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৬৩ লাখ স্মার্ট কার্ড এরই মধ্যে প্রস্তুত এবং বাকি ১৫ লাখ কার্ড বিতরণের জন্য পাইপলাইনে রয়েছে। স্মার্ট কার্ড তৈরি ও বিতরণে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন স্থানীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে টিসিবি যে বাফার স্টক গঠন করে তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। এ মুহূর্তে টিসিবির কাছে ১৫ হাজার টন চিনি, ১২ হাজার টন ডাল ও ৪ হাজার ৫০০ টন ভোজ্যতেলের মজুদ রয়েছে। প্রতি বছর ২ দশমিক ৫ লাখ টন ভোজ্যতেল ও ডাল এবং ১ দশমিক ৫ লাখ টন চিনি বাজার থেকে সংগ্রহ করি। ক্ষেত্র বিশেষে আমরা আলু ও চিনি কিনি। রমজানে ছোলা ও খেজুরসহ অন্যান্য পণ্যও কেনা হয়। এছাড়া পরিস্থিতি অনুযায়ী পেঁয়াজ ও আলু ক্রয় ও বিতরণ করা হয়েছে। তবে এসব পণ্য ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করা হয়। গত বছর ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। এ বছর টিসিবি সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার পণ্য কিনবে।
এসব পণ্য ক্রয়ে টিসিবি প্রধানত ওটিএম (ওপেন টেন্ডার মেথড) এবং ডিপিএমের (ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড) মাধ্যমে টেন্ডারিং করে থাকে। আমাদের টেন্ডারিং প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্বচ্ছ। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে দরপত্র খোলা হয়। এরপর টেকনিক্যাল কমিটির মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়। যেখানে টিসিবি ছাড়াও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সদস্যরা থাকেন। পরবর্তী সময়ে বোর্ড অব ডিরেক্টরস, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও উপদেষ্টামণ্ডলীর কমিটির মাধ্যমে টেন্ডার অনুমোদিত হয়ে থাকে। যদিও আমরা চাই ওটিএমের মাধ্যমে টেন্ডারিং হয়ে আসুক। ক্ষেত্র বিশেষে আমরা ডিপিএমেও গিয়ে থাকি। তবে ডিপিএমে পণ্য ক্রয় নিরুৎসাহিত করা হয়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় টিসিবির আটটি আঞ্চলিক শাখা কার্যালয় ও ছয়টি ক্যাম্প কার্যালয় রয়েছে। সেখানে পণ্য মজুদ করা হয়। এছাড়া টিসিবির ৩১টি নিজস্ব ও ভাড়া করা গুদামে রয়েছে যেখানে প্রায় ৫০ হাজার টন পণ্য সংরক্ষণ করা হয়। ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে পণ্য বিতরণ করা হয়। ২০২১ সালের নীতিমালা অনুসারে ডিলার নিয়োগ করা হয় এবং বর্তমানে নতুন একটি নীতিমালা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। ডিলার নিয়োগ একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ।
টিসিবির মাধ্যমে পণ্য ক্রয়, মজুদ ও বিতরণ মূল্য নিয়ন্ত্রণের একটি প্রয়াস। বাজার নিয়ন্ত্রণে টিসিবির ভূমিকা আপাতদৃষ্টিতে ক্ষুদ্র মনে হলেও কিছু পণ্যের মার্কেট শেয়ার আছে। ভোজ্যতেলের টিসিবির মার্কেট শেয়ার প্রায় ১০-১২ শতাংশ। মসুর ডালে প্রায় ৫০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার আছে। রমজানে ছোলা ও খেজুরের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে মার্কেট শেয়ার করে।
বাজার তদারকির জন্য টিসিবির একটি কমিটি রয়েছে যারা প্রতিদিন ঢাকা শহরের বিভিন্ন বাজারে গিয়ে প্রতিটি পণ্যের দাম পর্যবেক্ষণ করে। সংগৃহীত তথ্য টিসিবির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোয় পাঠানো হয়। কোন পণ্যের দাম কমল বা বাড়ল সে বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
টিসিবির কিছু সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা আছে। প্রথমত, টিসিবির সঙ্গে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের মধ্যে একটি দূরত্ব আছে। আমাদের প্রচারণায় যে ঘাটতি আছে, তা দূরীভূত করতে হবে। টিসিবির চেয়ারম্যান ও পরিচালকরা প্রেষণে আসেন। তারা একটি নির্দিষ্ট সময় থাকার পর চলে যান। এর ফলে টিসিবি কীভাবে কাজ করবে এবং কীভাবে টিসিবিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে তার পরিকল্পনা থাকে, কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পর চলে যাওয়ার পর সেই পরিকল্পনা পুরোপুরি আর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। এটিও টিসিবির একটি বড় দুর্বলতা। আমরা একটি সরকার প্রতিষ্ঠান। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সহজাত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে যায়। যেহেতু মন্ত্রণালয় ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা থেকে যায়।
টিসিবির সরবরাহ চেইন অনেক দীর্ঘ। আমরা টেন্ডারের মাধ্যমে পণ্য ক্রয়ের পর সেগুলো মজুদ করা হয়, টিসিবি কিংবা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সেগুলো বিতরণ করা হয়। এরপর ডিলারের মাধ্যমে ভোক্তাদের কাছে বিতরণ করা হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ দীর্ঘ সরবরাহ চেইন অনেক জটিলতা তৈরি করে।
এসব সীমাবদ্ধতা থাকার পরও বলব, আপনারা আমাদের সঙ্গে ব্যবসা করেন। টিসিবির সঙ্গে কেন ব্যবসা করবেন? কারণ এর সঙ্গে ব্যবসা করা সুবিধাজনক। এটি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ও ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরবরাহ করে। টিসিবির সঙ্গে ব্যবসা করে আপনারা নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারবেন। টিসিবিতে ২৪/৭ ভার্চুয়ালি যোগাযোগের সুবিধা রয়েছে। টিসিবির বিনিয়োগ শতভাগ গ্যারান্টেড। আপনারা টিসিবির সঙ্গে ব্যবসা করে টাকা পাবেন। পেমেন্ট সিস্টেম দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য—পাঁচ থেকে সাতদিনের মধ্যে পেমেন্ট নিশ্চিত করা হয়। মানবসেবাই সবচেয়ে বড় সেবা। টিসিবির সঙ্গে ব্যবসা করে দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত থাকুন।
ব্রি. জে. মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ: চেয়ারম্যান, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘খাদ্যপণ্যের যৌক্তিক দাম: বাজার তত্ত্বাবধানের কৌশল অনুসন্ধান’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]










