ট্রেনগুলোর ক্ষেত্রেও শিডিউল বিপর্যয় ওইভাবে দেখা যায়নি। বিপত্তি বেঁধেছে অন্যখানে। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় ঈদে সড়কে একটু বেশি চাপ থাকে। এ সময়েই কর্মক্ষেত্র দীর্ঘ ছুটিতে যায় এবং সড়ক অর্থনীতি নতুন করে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। বাড়তি এ চাপ সামলানোর মতো অবকাঠামোগত দক্ষতা আমাদের নেই এমনটি বলা যাবে না। মূলত সড়কে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম রয়েছে। এ অব্যবস্থাপনাগত জটিলতার কারণে সড়ক যাত্রীদের জন্য ভোগান্তি এবং অনেক ক্ষেত্রে পথচারীদের জন্য উদ্বেগের। দুই লেনের মহাসড়ক চার লেনে রূপান্তরের পরও দুর্ঘটনা কমানো যাচ্ছে না। পরিকল্পনা ও পলিসি পর্যায়ে ঘাটতি কারণে এমন হচ্ছে। অথচ সড়ক ব্যবস্থাপনা মসৃণ করার ক্ষেত্রে আমাদের প্রকৌশলগত দক্ষতা কম নয়। দেশে সড়কের বেহাল ইকোসিস্টেম প্রকৌশলগত সংকট না, বরং রাজনৈতিক। নীতিগত পর্যায়ে এখনো সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা যায়নি। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও নীতিগত ব্যর্থতাই বেশি দায়ী।
বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, এবারের আটদিনের ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় ২০৪ জন নিহত এবং ছয় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। এগুলো প্রাথমিক তথ্য। এখন ছুটি শেষে যখন কর্মক্ষেত্র চালু হয়েছে, তখন আরো তথ্য পাওয়া যাবে। সংস্থাটির প্রতিবেদন বলছে, ঈদযাত্রার অধিকাংশ দুর্ঘটনাই রোড বাইক, বাইক দুর্ঘটনা। এছাড়া বড় কিছু মর্মান্তিক দুর্ঘটনাও ঘটেছে। ঈদের ছুটির আগে সড়কে আমরা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক দেখলেও ফিরতি যাত্রায় এমন ভয়াবহ চিত্র কেন দেখা যায়? কারণটি বোঝা জরুরি। ঈদের আগে সরকারের নজরদারি এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর যে কঠোরতা সড়কে থাকে, তা ঈদের পর দেখা যায় না। হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএ ও স্থানীয় প্রশাসনে সরকারের দায়িত্বশীলরা ঈদযাত্রার মধ্যে বাড়ি যাওয়ার সময়ই বেশি গুরুত্ব দেন। ঈদের পর থেকে ফিরতি যাত্রার সময়ে ছুটির আমেজটা গাঢ় হয়ে যায়। এ সময়ে মানুষের ফেরার পরিকল্পনায় হেরফের ঘটে আর মানুষের মধ্যে বাড়তি তাড়া দেখা দেয়। এবারো ব্যতিক্রম হয়নি। সড়কে সমন্বিতভাবে নিয়ন্ত্রণ না থাকায় আমরা যাত্রী ভোগান্তির নিরিখে দুর্ঘটনা ঘটতে দেখেছি। ট্রেন দুর্ঘটনা অতীতের তুলনায় অনেক বেশিই বলা যায়। বিশেষত উত্তরবঙ্গের ট্রেন পরিষেবায় যাত্রীদের অনেকটা ‘বাদুরঝোলা’ হয়ে যেতে হয়েছে। উত্তরবঙ্গের রেল অবকাটামোটাই এমন। যাত্রী ভোগান্তি এড়ানোর ক্ষেত্রে কঠোর তদারকির প্রয়োজন ছিল। বিশেষত আমাদের রেলগুলো জরাজীর্ণ। শিডিউল বিপর্যয় এড়ানোর বিষয়টি আমাদের মূল সমস্যা নয়। জরাজীর্ণ অধিকাংশ রেলের ধারণ সক্ষমতা কম। তাছাড়া রেললাইন ও পারিপার্শ্বিক অনেক কিছুতে সমস্যা আছে। এসব সমস্যা নিয়ে ভাবতে হবে এবং কাজ করতে হবে। কারণ সামনে আরেকটি ঈদ। সে সময়ও যেন এসব দিক মোকাবেলা করা যায় তা ভাবতে হবে। আমাদের জন্য রেল একটি ভালো মাধ্যম। ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তার উদাহরণ টানা যেতে পারে। জাকার্তায় ঈদের সময় প্রায় দেড় কোটি মানুষ শহর ত্যাগ করে। ওই সময়ও বিপুল চাপ তৈরি হয়। কিন্তু যাত্রীসেবার পরিসর ও নজরদারি ভালো থাকায় উন্নত অবকাঠামোর পূর্ণ সুবিধা আদায় করা যায়।
এবার সড়কে আরো দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি থাকায় জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি দেখা গেছে। প্রতি বছর ঈদযাত্রায় মানুষ মোটরসাইকেলে যাতায়াত করে। জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি থাকায় এবার বাইক তুলনামূলক কম ছিল। এমনকি সড়কে প্রচুর অটো ও ইজিবাইক রয়েছে। এসব ছোট যান যখন মহাসড়কে যাতায়াত করে, তখন সামান্য ভারসাম্য হারালেও নিশ্চিত মৃত্যু। এসব ছোট যানের জন্য মহাসড়কের পাশে সার্ভিস রোড চালু করা দরকার। মহাসড়কে উচ্চগতির যান চলাচল করবে এমনটিই স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে মিক্সড ট্রাফিক চলাচল করে। এমনটি যান চলাচলে বহু প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এবারো ঈদে বহু ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যান চলাচল করেছে। এসব যানও ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করে। অবকাঠামো উন্নত হলেও গাড়ির যান্ত্রিক মান উন্নত হয়নি। বিশেষ করে ঈদের সময় কয়েক দশকের পুরনো ও ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো রাস্তায় নামানো হয়, যা হাইওয়ের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারায়। সড়কে বিভিন্ন যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ জরুরি। ঈদে যাত্রী চাহিদা দেখে সবচেয়ে বেশি সুযোগ নিতে চায় মালিক-পরিবহন সমিতির একাংশ। সার্বিকভাবে এটি একটি অর্থনীতিও বটে। তবে আমাদের দেশের জনসংখ্যা বিবেচনায় যানবাহনের সংখ্যা অনেক কম।
সড়কে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম একদিনে তৈরি হয়নি। যারা সড়ক নিরাপদ রাখবেন, নিয়ন্ত্রণে রাখবেন, তারা যদি শুরু থেকে মহাসড়কে নজরদারি ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতেন, তবে আজকের পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। আবার যাত্রী, পথচারী ও যানবাহনসংশ্লিষ্টরাও কঠোরভাবে আইন মেনে যানবাহন চালালে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কম থাকে। এক্ষেত্রে কেউই সতর্ক নন। দক্ষ চালকের অভাব, চালকদের শারীরিক সক্ষমতার অভাব, চালকদের কাজের নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। আমাদের সড়কগুলো এখন উচ্চগতির উপযোগী করে নির্মিত হচ্ছে, কিন্তু সেখানে চলাচলকারী যানবাহনের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। একই লেনে দ্রুতগতির বাসের পাশাপাশি ধীরগতির নসিমন-করিমন বা রিকশা চলায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। পাশাপাশি ঈদে যাত্রীর তুলনায় যান থাকে কম। দেশে দক্ষ চালকেরও অভাব আছে। শুধু ঈদের সময়ই কিছু জরাজীর্ণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ বাসকে অটোমোবাইল শপে কিছুটা সারিয়ে পথে নামানো হয়। এসব বাস বা যান অদক্ষ চালকদের দেয়া হয়। মহাসড়কে চালানোর অভিজ্ঞতা না থাকা এসব চালকের একটানা গাড়ি চালাতে হয়। তাদের পেশাদারত্ব ও ক্লান্তি থেকেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। একজন চালক সাধারণত একটানা ৪-৫ ঘণ্টা গাড়ি চালালে তার পারসেপশন টাইম কমে। এটি এক ধরনের ক্লান্তি। বিকল্প চালক কিছু হাইওয়ে বাস ফ্র্যাঞ্জাইজি ব্যবহার করে। কিন্তু অধিকাংশ বাসের ক্ষেত্রেই তা নেই। চালকদের সুযোগ-সুবিধার নিশ্চিত করে তাদের দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ আমাদের সড়ক অবকাঠামো উন্নত হওয়াই সব না। এখানে সড়ক আইনও যে মন্দ এমন নয়। তবে এ আইনের প্রয়োগ সুষ্ঠুভাবে হয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ম দেখা যায়। আমরা এখনো ম্যানুয়াল পদ্ধতির ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টে নির্ভরশীল। অথচ সড়কে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম প্রয়োগ করার সুযোগ আমাদের রয়েছে। ম্যানুয়াল নজরদারির কিছু ঝুঁকি থাকে। যেমন উৎসবের সময় ছুটির আমেজে সড়ক নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও অনেকটা লোকসংকটে থাকে। এজন্য নজরদারিও শিথিল হয়। অবকাঠামো যতই উন্নত হোক, সড়কে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য না থাকলে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ে। দেশে বাসরুটের আধুনিকায়ন ও সেবার পরিসর বেশি হয়েছে। এজন্য এ ক্ষেত্রের চাহিদাই বেশি। কিন্তু টেকসই জোগান এখানে কম। মানুষ ঈদের সময় পিঁপড়ের মতো ঘুরমুখো হলে এসব উন্নত অবকাঠামো ধারণক্ষমতার বেশি চাপ নেয়। তাতে অবকাঠামোর ক্ষতিও হয়। এজন্য নৌপথ ও রেলপথের বিকল্প রুটগুলোকে বহুমুখী করা জরুরি। এমনকি ঈদের সময় ভাড়ার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেয়া জরুরি। অনেক সময় অনানুষ্ঠানিকভাবে বাড়তি ভাড়া আদায় হয়। মুদ্রাস্ফীতির চাপে থাকা অনেকে তাই সবচেয়ে ভালো যাত্রীসেবাটি নিতে পারেন না। এজন্য সড়কযাত্রায় যাত্রীদের যেন বাড়তি ভাড়া দিতে না হয়, সেজন্যও কঠোর তদারকি জরুরি। যাত্রীসেবার বিষয়টিকে আমরা এখনো তেমন গুরুত্বের সঙ্গে নিতে পারিনি। অন্তত বৃহৎ পরিসরে তো নয়।
সড়ক উন্নয়ন মানে শুধু পিচ ঢালাই নয়, বরং একটি নিরাপদ ইকোসিস্টেম তৈরি করা। যতক্ষণ পর্যন্ত গণপরিবহনে শৃঙ্খলা না আসবে এবং ছোট যানবাহনের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকবে, ততক্ষণ কোনো মেগা প্রকল্প আমাদের নিরাপদ গন্তব্যের নিশ্চয়তা দিতে পারবে না। আইটিএস (ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক সিস্টেম) ব্যবহার করে গাড়ির গতি ও অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। লক্কড়-ঝক্কড় বাস তুলে দিয়ে বড় কোম্পানির অধীনে মানসম্মত গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করা। বাংলাদেশের বিআরটির সম্ভাবনা অনেক। এটিকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা জরুরি। অবকাঠামোর পাশাপাশি আমাদের পলিসির পরিবর্তন দরকার। যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করাটা প্রকল্পভিত্তিক সমাধান না। সেটা হলো সমস্যাভিত্তিক সমাধান। যানবাহন নিয়ন্ত্রণ না করে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। অবাধে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে যানবাহন চলাচলের সুযোগ দেয়া হয়েছে। শুধু বড় অবকাঠামো না বানিয়ে সে অবকাঠামো সার্বিক সড়কের সঙ্গে কতটা খাপ খাওয়াতে পারে, সেটি পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যাচাই করে দেখতে হবে। যেকোনো উৎসবের যাত্রা শুধু মহাসড়কে সীমাবদ্ধ না। নগরের ভেতরের যাত্রীসেবা থেকে শুরু করে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত। এজন্য নীতিগতভাবে পরিবর্তন আনতে হবে। সড়ক অবকাঠামো নিয়ে ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ বিশেষজ্ঞদের দিয়েই সড়ক অবকাঠামোর পরিকল্পনা করে। এজন্য দেশগুলো সফল। কিন্তু বাংলাদেশে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সড়ক ব্যবস্থাপনায় তাই বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। একটি টেকসই ও সমন্বিত সড়ক ব্যবস্থাপনা সারা বছরই জরুরি। কিন্তু তার পরীক্ষা ও সফলতা আমরা যাচাই করতে পারি উৎসবের সময়ে।
ড. হাদিউজ্জামান: অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। সাবেক পরিচালক, দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট, বুয়েট










