বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে শোকাবহ সকাল ছিল ৩০ ডিসেম্বর। কারণ এ জনপদের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, সেই সংগ্রামের যৎসামান্য যেটুকু রূপান্তর এবং দীর্ঘ স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট শাসন শেষে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখা ও ত্যাগ স্বীকারকারী খালেদা জিয়া মহাকালে যাত্রা করেছেন।
বেগম জিয়া রক্ত-মাংসের মানুষ ছিলেন। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তিনিও দোষ-ত্রুটি/ভুল-ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে ছিলেন না। বিশেষ করে ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলার যথাযথ তদন্ত না হওয়া ও ২০০৬ সালে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর-সংক্রান্ত জটিলতা তার সামগ্রিক রাজনৈতিক জীবনের বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
তবে সব সীমাবদ্ধতা ছাপিয়ে বাংলাদেশের মতো একটি তৃতীয় বিশ্বের মুসলিম অধ্যুষিত রক্ষণশীল দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তিনি কিছু অনন্য উদাহরণ স্থাপন করে গেছেন; যা বাংলাদেশে তো বটেই পুরো দক্ষিণ এশিয়া এমনকি বিশ্বের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। কোনো রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান না হয়েও নিছক গৃহবধূ থেকে ভীষণ প্রতিকূল স্বৈরাচারী শাসনামলে দলের হাল ধরে বলতে গেলে তার একক ও আপসহীন নেতৃত্বে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন করেছেন। নিজে পুরো মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রীর আসন অলংকৃত করেছেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
দেশের নারীদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু, প্রাথমিক শিক্ষকতায় নারীদের আলাদা করে কোটা প্রবর্তন এবং শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে তিনি নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে যে যুগান্তকারী সীদ্ধান্ত নিয়েছিলেন; তা তাকে অবিস্মরণীয় করে রাখবে। শুধু তাই নয়; নারীর প্রতি সহিংসতা রুখতে ও তাদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতকল্পে তার সরকার ধর্ষণ ও যৌতুকের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড এবং অ্যাসিড সন্ত্রাসের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের বিধান প্রবর্তন করে।
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে সংস্কারের যুগ তার শাসনামলেই সূচিত হয়। তার সময়ে গৃহীত অর্থনৈতিক উদারীকরণ নীতির ওপর দাঁড়িয়েই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় প্রবেশ করে। বিশেষ করে কর ব্যবস্থা ও বাণিজ্যনীতির সংস্কার এবং আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিনিয়োগ ও শিল্পনীতি ঘোষণা দেশের স্থবির অর্থনীতিতে গতি আনে। এ ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানকে বেগম জিয়া কাজ করার ক্ষেত্রে সর্বাত্মক স্বাধীনতা প্রদান করেন। যার সুফল বাংলাদেশ অচিরেই পেতে শুরু করে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে"ইমার্জিং টাইগার অভিধায় ভূষিত হয়ে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তার দলের রাজনীতি ও রাজনৈতিক আদর্শ মধ্য ডানপন্থী রক্ষণশীল ঘরানা বলে পরিচিত হলেও তিনিই প্রথম এর সত্যিকার মধ্যপন্থার স্বরূপ নির্দেশ করেন এই বলে যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের অবস্থান ঠিক ডানের বামে এবং বামের ডানে। তিনি আপ্ত বাক্য হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি না আওরালেও সহজাতভাবেই রাজনীতিতে ধর্ম ও রাষ্ট্রের আধুনিক সীমারেখা সম্পর্কে ভীষণ সতর্ক ছিলেন, যা তার চালচলন, পোশাকআশাক, ফ্যাশন সচেতনতা ও ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শরিকদের ওপর প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে স্পষ্টতই প্রকাশিত হয়েছে।
বেগম জিয়া কওমি ধারার শিক্ষার প্রচলিত ফর্মেটে সরকারি স্বীকৃতির পরিবর্তে এর আধুনিকায়নের ওপর জোর দিয়েছিলেন। সে কারণেই জোরালো দাবি থাকার পরও তিনি কেবল"দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তরের সমমান দেয়ায় কর্ণপাত করেননি। শুধু তাই নয়; আধুনিক ধারার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় আলাদাভাবে ধর্মীয় শিক্ষা চালুর দাবি উঠলে; তিনি বিনয়ের সঙ্গে জাতীয় সংসদে তার প্রশ্নোত্তর পর্বে দ্বিমত পোষণ করে; পরিবারই ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণে শিশুদের সবচেয়ে উপযোগী প্রতিষ্ঠান বলে উল্লেখ করেছিলেন।
পররাষ্ট্র নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও তিনি সাহসী ও দৃঢ়চেতা ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিনিই প্রথমবারের মতো প্রচলিত ভারত তথা দক্ষিণ এশিয়াকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির ভরকেন্দ্র হতে বেরিয়ে চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে অধিকতর মনোযোগ নিবদ্ধ করতে লুক ইস্ট"পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন। এতে এ দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও ভূকৌশলগত সম্পর্ক জোরদার হয়। ১৯৯৩ সালে প্রায় ২ লাখ ২৯ হাজার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ দেশে প্রত্যর্পণ তার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম সফলতা হিসেবে দেখা হয়। জনশ্রুতি আছে; এক্ষেত্রে তার সরকারের সঙ্গে মিয়ানমারের কূটনীতিক দেনদরবারের এক পর্যায়ে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে দেশটির সরকারের টালবাহানায় তিনি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সৈন্য মোতায়েনের হুমকি দেন! এমন আগ্রাসী ও সাহসী অবস্থান উল্লেখিত প্রত্যর্পণকে ত্বরান্বিত করে।
জীবনের কোনো নির্বাচনে পরাজিত না হওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার যে ঈর্ষণীয় নজির স্থাপন করেছেন—তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বেগম জিয়া রাজনৈতিক শিষ্টাচার, মৃদুবচন ও এর পরিমিতিবোধ চর্চায়ও অনুকরণীয় ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে দুই শিশু সন্তান নিয়ে তার বন্দিদশা! একে নিয়ে তার রাজনৈতিক বিরোধীদের সীমাহীন কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিতে কোনোদিন কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখানোর সৌজন্যতায় তা স্পষ্ট ছিল।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এরশাদের নানা প্রলোভন উপেক্ষা করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অবিচল আপসহীন থাকা, জাতীয় নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে তার মাজার জিয়ারত ও জাতীয় সংসদে দেয়া ভাষণে তার ভূমিকাকে স্বীকৃতি দান, কোনোদিন তার বিরুদ্ধে কোনো অশ্রদ্ধামূলক কটূক্তি না করা এবং সবশেষ তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট রেজিমে নিজের রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে; দেশের গণতন্ত্রের বৃহত্তর স্বার্থে একটু আপস করে বিদেশে চিকিৎসা নিয়ে ভালো থাকার স্থলে অনেকটা ষড়যন্ত্র ও প্রতিহিংসামূলক ধীরগতির মৃত্যুকে বেছে নেয়ার অনন্যতা; শুধু বিরল সাহসী, দৃঢ়চেতা, প্রবল আত্মমর্যাদায় দ্বীপ্ত খালেদা জিয়ার পক্ষেই সম্ভব।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সব রকম ঘৃণা, বিদ্বেষ, পতিত প্রতিপক্ষকে ইঙ্গিত করে কোনো আক্রমণ সবকিছু এড়িয়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থাকা ও গণতান্ত্রিক উত্তরণে নানা দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য ও বিবৃতির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষেই জাতির অবিসংবাদিত অভিভাবকে পরিণত হওয়ার মধ্য দিয়ে ভীষণ জনপ্রিয়তার মধ্যগগনে থেকে তার এই প্রয়াণ; এই অর্থে অভূতপূর্ব ও হিরণ্ময় যে; আজ পুরো জাতি; ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, রাজনৈতিক বিশ্বাস নির্বিশেষে সবাই শোকাহত। এমনকি যারা তার এই মহাযাত্রাকে জেল, জুলুম, নিপীড়ন, চিকিৎসাবঞ্চনা, অত্যাচারে ত্বরান্বিত করেছে; সেই পতিত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীও শোকাহত বলে বার্তা দিয়েছে! এমন মহাপ্রস্থান সত্যিই অভাবনীয়!
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, সংকট, উত্তরণ ও অর্জনের আপসহীন বীর সেনানী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, এই জনপদের মাটি ও মানুষের প্রাণের নেত্রী, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার প্রয়াণে গভীর শোক ও শ্রদ্ধা জানাই।
মনজুর এরশাদ খান: সহকারী অধ্যাপক
ইতিহাস বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়










