বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় বর্তমানে শিক্ষার্থী ভর্তির অবস্থা খুবই বিশৃঙ্খল। বিশৃঙ্খল ভর্তি ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি দুঃস্বপ্ন। অভিভাবকদের জন্য তা আরো বেশি কষ্টের। দুর্ভাগ্যবশত বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন আলোচনা ও বিভিন্ন পরীক্ষা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়াটি এখনো সহজ ও শিক্ষার্থীবান্ধব করা যায়নি। ভর্তি প্রক্রিয়া সাম্প্রতিক সময়ের মতো আগে এতটা ভয়াবহ ছিল না। বর্তমানে সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে এবং ভর্তিচ্ছুদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে তুলেছে। নিজস্ব ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে কিছু শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্যরা গুচ্ছু ভর্তি পরীক্ষার ওপর নির্ভর করছে। এর পরও ভর্তিচ্ছুদের ও অভিভাবকদের ভোগান্তি অসহনীয় ও অগ্রহণযোগ্য। ভর্তির প্রধান সমস্যা হলো, এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষার ফলাফলের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবিশ্বাস। এটি হয়ে থাকে মূলত পরীক্ষার ভুল পদ্ধতির কারণে। তারা বিশ্বাস করে, এসএসসি ও এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থীদের ফলাফল তাদের একাডেমিক গুণমান এবং জ্ঞানের স্তরকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করার পরিবর্তে তারা নিজস্ব ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে উপযুক্ত শিক্ষার্থী বাছাই করতে চায়। ভর্তির সমস্যা সমাধানের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বোর্ডগুলোকে শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন মূল্যায়নের মাধ্যমে এগোতে হবে। প্রক্রিয়াটি প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করা উচিত। এ ব্যবস্থায় সব স্তরের পরীক্ষার মূল্যায়ন যেন মানসম্পন্ন ও বিশ্বাসযোগ্য হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। পরীক্ষায় অব্যবস্থাপনার কারণে ফলাফল যাতে প্রভাবিত না হয় সেদিকেও নজর রাখতে হবে। এটি একবার অর্জন করা হয়ে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের গ্রহণ করা। বাস্তবতা হলো, এটি রাতারাতি ঘটবে না। তাই আমাদের অবশ্যই কম জটিল ও ঝামেলামুক্ত একটি বিকল্প ভর্তি ব্যবস্থা থাকতে হবে। এটি না হওয়া পর্যন্ত একটি নির্ভরযোগ্য ও যুক্তিসংগত ভর্তি পরীক্ষা অপরিহার্য।

দেশের ভর্তি ব্যবস্থায় ভর্তিচ্ছুদের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে একসঙ্গে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে হয়। এ প্রক্রিয়ায় ভর্তিচ্ছুদের কাছে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় বেশি আকর্ষণের কেন্দ্রে রাজধানী ও আশপাশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এ কারণে তারা একাধিক প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ফি দিচ্ছে। তারা ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়। মেডিকেল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তির জন্য ভর্তিচ্ছুদের প্রস্তুতি নিতে বিভিন্ন বিশেষায়িত কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়। এসব ভর্তি পরীক্ষার ফি বাবদ ও কোচিং সেন্টারে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। দেশের বিদ্যমান ভর্তি প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের নির্বাচন ও ভর্তির সময়কেও বিশেষভাবে দীর্ঘায়িত করে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদনকারী শিক্ষার্থীদেরকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করতে হয়। ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে দূরের স্থানগুলোয় তাদের রাতে থাকার ব্যবস্থারও প্রয়োজন হয়। তবে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য এটি আরো কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যাতায়াত করেন যা পরিবারের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ভর্তি পরীক্ষার জন্য বড় আকারে ফি আদায় করে। কিছু ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য, ভর্তি পরীক্ষার ফি হিসেবে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ অনেক বেশি। অবকাঠামো, কর্মীদের ব্যবস্থাপনা ও পরিদর্শকসহ ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি বিশাল আয়োজন। এ প্রক্রিয়ায় উপার্জিত অর্থ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীরা পারিশ্রমিক হিসেবে ভাগাভাগি করে নেন। শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার অনিশ্চয়তা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের আরো বেশি উদ্বিগ্ন করে তোলে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য নেয়া সময়, ফলাফল মূল্যায়ন ও প্রকাশ, শিক্ষার্থীদের নির্বাচন ও গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং ভর্তির জন্য বিভাগ/বিষয় পরিবর্তনের মতো জটিল ও দীর্ঘায়িত ভর্তি প্রক্রিয়ার কারণে প্রায় সব শিক্ষার্থীই তাদের জীবন থেকে কয়েকটি মাস হারিয়ে ফেলে। প্রথম দফায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ব্যর্থ হওয়া শিক্ষার্থীদের পরের বছর দ্বিতীয়বার একইভাবে জটিল, ব্যয়বহুল ও দীর্ঘায়িত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়।

উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ভর্তি প্রক্রিয়া বিশ্বব্যাপী একটি বিস্ময়কর ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রোগ্রামে ভর্তি হতে প্রতিটি দেশের নিজস্ব ব্যবস্থা রয়েছে। উন্নত দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ভর্তি ব্যবস্থা খুব সুপ্রতিষ্ঠিত এবং তা সহজভাবে সঠিক সময়ে পরিচালিত হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে কোনো ভর্তি পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। বরং উচ্চ মাধ্যমিক ফলাফলের মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে একটি কেন্দ্রীয় ভর্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ দেয়া হয়। কিছু দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি একটি স্বাধীন বেসরকারি সংস্থা দ্বারা পরিচালিত হয় (যেমন যুক্তরাজ্যে)। অন্যান্য দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে সহায়তা করে (যেমন অস্ট্রেলিয়া)।

যুক্তরাজ্যে ইউনিভার্সিটিজ অ্যান্ড কলেজ অ্যাডমিশন সার্ভিস (ইউসিএএস) বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের র‍্যাংকিং প্রদান করে। ইউসিএএসের পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য ট্যারিফ পয়েন্ট গণনা করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ পয়েন্টের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের ভর্তির প্রস্তাব দেয়। ইউনিভার্সিটিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল অন অ্যাডমিশনস (ইউসিসিএ) এবং পলিটেকনিকস সেন্ট্রাল অ্যাডমিশনস সিস্টেমকে (পিসিএএস) একীভূত করে ১৯৯২ সালে ইউসিএএস গঠন হয়েছিল এবং ইউসিসিএ এবং পিসিএএসের সংক্ষিপ্ত রূপ হচ্ছে ইউসিএএস। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিকের জন্য একটি সম্পূর্ণ একীভূত আবেদন ব্যবস্থা ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত অর্জন হয়নি।

ইউসিএএস ট্যারিফ পয়েন্ট হচ্ছে একটি সংখ্যাগত মান, যা একজন শিক্ষার্থীর একাডেমিক অর্জন ও গ্রেডের প্রতিনিধিত্ব করে। প্রাপ্ত গ্রেড ও যোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে মান নির্ধারণ করা হয়। ইউসিএএস ট্যারিফ যুক্তরাজ্যজুড়ে স্বীকৃত এবং বিভিন্ন ধরনের কোর্স অধ্যয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের তুলনা করতে ব্যবহৃত হয়।

আবেদন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের ইউসিএএসে একটি অ্যাকাউন্টস নিবন্ধন করতে হয়। তাদের প্রোফাইল পূরণ করতে হয়, কোর্স অনুসন্ধান করতে পারে এবং একসঙ্গে সর্বোচ্চ পাঁচটি আবেদন জমা দিতে পারে। শিক্ষার্থীরা তাদের আবেদনগুলো ট্র্যাক করতে পারে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে অফার পেতে পারে। প্রস্তাব পাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা তার পছন্দের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ায় বিভিন্ন সরকারি সংস্থা বিভিন্ন রাজ্যে উচ্চ শিক্ষা পর্যায়ে ভর্তি পরিচালনা করে। কুইন্সল্যান্ড রাজ্যে সংস্থাটি কুইন্সল্যান্ড টারশিয়ারি অ্যাডমিশন সেন্টার (কিউটিএসি) নামে পরিচিত। শিক্ষার্থীরা একটি কিউটিএসি আবেদনের মাধ্যমে ১৭টি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারে। প্রতি বছর উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি পাস) উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের কিউটিএসি অ্যাপ্লিকেশন পোর্টালে একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হয় এবং প্রাসঙ্গিক সব নথি জমা দিতে হয়। অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রতি বছর উচ্চ মাধ্যমিকদের র‍্যাংকিংয়ের ওপর ভিত্তি করে ভর্তি করা হয়, যা অস্ট্রেলিয়ান টারশিয়ারি অ্যাডমিশন র‍্যাংক (এটিএআর) নামে পরিচিত। অস্ট্রেলিয়াজুড়ে এটিএআর উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রাথমিক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। ২০২০ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়ার সব রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য এটিএআর ব্যবহার করছে যখন কুইন্সল্যান্ড বাকি রাজ্যগুলোয় যোগ দিয়েছে, যারা ২০০৯-১০ সাল থেকে এ পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছে। কিউটিএসি পদ্ধতিতে নিবন্ধিত প্রতিটি আবেদনকারীর জন্য একটি নির্দিষ্ট আবেদন ফি রয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির জন্য উপযুক্ত হতে ন্যূনতম এটিএআর প্রবেশের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে হবে।

এটিএআর হলো নম্বরের পরিবর্তে একটি পার্সেন্টাইল র‍্যাংক, যা একটি নির্দিষ্ট বছরে একই বয়সের শ্রেণীভুক্ত ব্যক্তিদের তুলনায় একজন শিক্ষার্থীর অবস্থানকে নির্দেশ করে। বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়ন করে এমন শিক্ষার্থীদের তুলনায় একজন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক একাডেমিক কৃতিত্বের আদর্শ পরিমাপ প্রদান করে এটি। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষার্থীদের আপেক্ষিক অবস্থানের ভিত্তিতে তাদের প্রোগ্রামের জন্য প্রার্থী নির্বাচন করতে সহায়তা করে এটিএআর। কিউটিএসি সব প্রতিযোগী আবেদনকারীকে ‘‌মেধা ক্রমে’ স্থান দেয়। এর অর্থ হলো, সর্বোচ্চ এটিএআর স্কোর অর্জনকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তাব পায়, তারপর পরবর্তী সর্বোচ্চ এটিএআর স্কোর অর্জনকারী। যতক্ষণ পর্যন্ত আসন পূরণ না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত এভাবে ‘‌মেধার ক্রম’ নেমে গিয়ে অনুসরণ করতে হয়। সুতরাং তুলনামূলক কম এটিএআর স্কোর অর্জনকারীর চেয়ে উচ্চতর এটিএআর স্কোর অর্জনকারী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাবে। যখন নিবন্ধন চলমান থাকে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা তাদের একাডেমিক ফলাফলসহ পছন্দসই প্রোগ্রামগুলোকে কিউটিএসি অ্যাপ্লিকেশনগুলোয় তালিকাভুক্ত করে। কাঙ্ক্ষিত উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় এটিএআর ও সিলেকশন র‍্যাংকের আলোকে আবেদনের সর্বোচ্চ সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের পছন্দগুলোকে তালিকাবদ্ধ করে। এভাবে আরো বিকল্প সুযোগ বেছে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের ভর্তি হওয়ার প্রস্তাব পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কিউটিএসি পদ্ধতিতে পছন্দসই বিষয় বাছাইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ভালো বিষয় বেছে নেয়ার সুযোগ পায়।

অস্ট্রেলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের বিভিন্ন প্রোগ্রামে শিক্ষার্থীদের নিতে এটিএআরের যোগ্যতা পরিসর নির্ধারণ করে। সুতরাং অন্যদের তুলনায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজন উচ্চ এটিএআর এবং উল্টোটিও হতে পারে। শিক্ষার্থীদের গ্রহণযোগ্যতার জন্য উচ্চ ব্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উচ্চ এটিএআর নির্ধারণ করে। সুতরাং যেকোনো নির্দিষ্ট প্রোগ্রামের জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্ন এটিএআরের যোগ্যতা থাকতে পারে।

বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য সমন্বিত বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ব্যবস্থার সন্ধানে বিশ্বের যেসব দেশ বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনা করছে সেসব দেশের অভিজ্ঞতাকে আমরা কাজে লাগাতে পারি। যেকোনো দেশের ভর্তি ব্যবস্থাকে আমাদের স্থানীয় চাহিদা ও পরিস্থিতি অনুসারে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে গ্রহণ করতে সহজ হবে। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চ শিক্ষায় আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি সমস্যা সমাধানের জন্য অস্ট্রেলিয়ার কিউটিএসির মতো বাংলাদেশ সরকার একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে পারে। একটি একক ভর্তি পরীক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুদের ও তাদের অভিভাবকদের জন্য ভর্তি প্রক্রিয়াটিকে অনেক সহজ, কম ব্যয়বহুল এবং সহজ করে তুলবে। এ প্রক্রিয়া চালু করা গেলে প্রচুর অর্থ ও অত্যন্ত মূল্যবান সময় সাশ্রয় করবে তাদের। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সময়মতো শিক্ষাবর্ষ শুরু এবং কোনো ধরনের সেশনজট ছাড়াই শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি শেষ করতে সহায়ক হবে।

বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থাপনার শীর্ষস্থানীয় সংস্থা হিসেবে জাতির এ মুহূর্তের প্রয়োজন বিবেচনায় একটি সেন্ট্রাল টারশিয়ারি অ্যাডমিশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিটিএএমএস) চালুর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) একটি সঠিক সরকারি সংস্থা। সব যোগ্য ভর্তিচ্ছুরা সিটিএএমএসে একটি অ্যাকাউন্ট খুলবে এবং প্রার্থী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য নিবন্ধন করবে। সিটিএএমএসের অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন প্লাটফর্ম ভর্তিচ্ছুদের অগ্রাধিকার বিষয়গুলোসহ (সর্বোচ্চ ছয়টি) সব একাডেমিক তথ্যগুলো সংগ্রহ করবে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বোর্ডের মূল্যায়ন মানের আস্থার অভাবে যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের ফলাফল গ্রহণ করতে রাজি না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সিটিএএমএসের মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত একক ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত এবং নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের র‍্যাংকিংয়ে এ পরীক্ষার ফলাফল অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এ ভর্তি পরীক্ষায় প্রকৌশল ও চিকিৎসা শিক্ষাসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট পাঠ্যবিষয়ের ওপর প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। যারা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় সম্মিলিতভাবে সিজিপিএ ৫ পেয়েছে তাদের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার অনুমতি দেয়া যেতে পারে।

সিটিএএম পদ্ধতি আবেদনকারীদের চূড়ান্ত স্কোর/র‍্যাংক নির্ধারণের জন্য ভর্তি পরীক্ষা ও দুটি বোর্ড পরীক্ষার ফলাফলকে একত্রিত করে উপযুক্ত মান নির্ধারণ করবে। সিটিএএম পদ্ধতিতে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের জন্য ২০ শতাংশ মান, এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের জন্য ৩০ শতাংশ এবং ভর্তি পরীক্ষার জন্য ৫০ শতাংশ মান নির্ধারণ করে শিক্ষার্থীদের র‍্যাংক/স্কোর গণনা করতে হবে। সুতরাং একজন প্রার্থীর সর্বোচ্চ স্কোর হতে হবে ১০০-এর মধ্যে।

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় যেকোনো নির্দিষ্ট বিভাগ বা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের গ্রহণের জন্য ন্যূনতম র‍্যাংক/স্কোর নির্ধারণ করবে। স্পষ্টতই একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের জন্য এ ন্যূনতম র‍্যাংক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্ন হতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত আসন পূরণ না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিটি বিষয়ের আসন পূরণ করতে ন্যূনতম নম্বর/র‍্যাংকধারী শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ দেবে। খালি আসনগুলোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কম নম্বর প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ভর্তি করতে ন্যূনতম নম্বরের যোগ্যতা কমাতে পারে। এ ব্যবস্থার অধীনে, উচ্চ নম্বর/ স্কোরের শিক্ষার্থীরা ভর্তির একাধিক প্রস্তাব পাবে এবং পরবর্তী স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য আসন খালি করতে কম আগ্রহ রয়েছে এমন প্রস্তাবগুলো বাতিল করতে হবে।

কোনো ব্যবস্থাই সম্পূর্ণ এবং সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। সুতরাং প্রস্তাবিত সিটিএএম ব্যবস্থাটি সব শিক্ষার্থী ও সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। তবে গড়ে এটি অধিকাংশ ভর্তিচ্ছুদের প্রত্যাশা ও বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা ন্যায্য ও ন্যায়সংগত অনেকাংশে পূরণ করতে সক্ষম হবে। বাস্তবায়নের আগে প্রস্তাবিত ব্যবস্থার প্রকৃত কার্যকারিতার কিছু পরীক্ষা বা প্রাক-পরীক্ষা করতে হবে।

ড. শাহজাহান খান: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া; ভাইস চ্যান্সেলর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ