জুলাই ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মত ‘যেহেতু’ দিয়ে ঘোষণাপত্রের হেতু (কারণ) উল্লেখ করা হয়েছে। জুলাই ঘোষণাপত্রে ‘যেহেতু’ আছে ২১ বার, আর ‘সেহেতু’ আছে মাত্র ৫ বার। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ৯ বার ‘যেহেতু’ আছে, কিন্তু কোনো ‘সেহেতু’ নেই। করণীয় সম্পর্কে ৬টি ‘সেহেতু’ পয়েন্ট আকারে উল্লেখ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যেহেতু (whereas) শব্দটি উল্লেখ না থাকলেও ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের কুকীর্তির বিরাট একটা তালিকা দেয়া হয়েছিল। ‘সেহেতু’ শব্দটিও ছিল না। সেহেতুর বড় কোনো লিস্টও দেয়া হয়নি। অবশ্য ফরাসি বিপ্লবের সময় মানুষ ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণাপত্রে বিপ্লবের হেতু বর্ণনা করা হয়নি, মানুষ ও নাগরিক কী কী অধিকার ভোগ করবে তার ফিরিস্তি দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামজিক ন্যায়বিচার’-এর ওয়াদা করা হয়, যা জুলাই ঘোষণাপত্রে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সাম্য, স্বাধীনতা ও সুখের পেছনে ছোটাকে স্রষ্টাপ্রদত্ত অবিচ্ছেদ্য অধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

এটা বলা যায়, অতীতের ভুলগুলো ধরা সহজ কিন্তু ভবিষ্যতে কী করব বলা কঠিন। ঐকমত্য কমিশনের জন্য তা আরো কঠিন। তাই না?

দুই.

জুলাই ঘোষণাপত্রে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। কয়েকটির উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। বৈষম্য, বৈষম্যমূলক, বৈষম্যবিরোধী এবং বৈষম্যহীন কথাগুলো এসেছে ৬ বার। শোষণ ও শোষণমুক্ত এসেছে ১ বার করে, সাম্য কথাটিও এসেছে ১ বার। শহীদ কথাটি উল্লেখ করা হয়েছে ৩ বার, আওয়ামী লীগ ৯ বার আর হাসিনা ৭ বার। ফ্যাসিবাদ আছে ১২ বার, গণতন্ত্র আছে ২ বার। ছাত্র-জনতা একসঙ্গে এসেছে ৬ বার, ছাত্র আলাদাভাবে এসেছে ৫ বার। জনতা আলাদাভাবে এসেছে ১ বার। জনগণ শব্দটি ১৪ বার ব্যবহৃত হয়েছে। ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান কথাটি একবার এসেছে। শ্রমিক সংগঠন কথাটি এসেছে ২ বার। (সব/বিভিন্ন) শ্রেণী-পেশা এসেছে ২ বার। সংবিধান কথাটি এসেছে ৬ বার, আর সাংবিধানিক কথাটি এসেছে ৭ বার।

শব্দ ব্যবহার থেকে ঘোষণাপত্রের প্রণেতাদের চিন্তাভাবনা বোঝা যায়। তাই না?

তিন.

কোন শব্দ কতবার কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এর চুলচেরা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ পরে করা যাবে। কেবল একটি শব্দ ব্যবহারের বিশ্লেষণ না করে পারছি না।

জুলাই ঘোষণাপত্রে ‘বাংলাদেশের আপামর জনগণ’ কথাটি একবার ব্যবহার করা হয়েছে। পামর মানে পাপী। আপনারা জানেন, আপামর জনগণ মানে পুণ্যবান থেকে পাপী সবাই, সব জনগণ। বাংলাদেশের ‘পাপী’ জনগণই বুকের রক্ত দিয়েছে। আর পুণ্যবান ঈশ্বরপুত্র প্যারিস থেকে এসে জনগণের পাপমোচন করছেন? জনগণ পাপী, কারণ তারা টাকা নিয়ে ভোট দেয়?

এই সরকার নিজেকে ত্রাতা ভাবে, কিন্তু জনগণকে নির্মাতা ভাবে না?

মোল্লা জহিরুদ্দিন: উকিল ও সংগঠক