শিল্প খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তাদের ভাষ্যমতে, গ্যাসের দাম বাড়লে পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টগুলোয় বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। তাদের মতে, এতে শিল্পায়ন ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এরই মধ্যে এ বিষয়ে তথা গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব বাতিল করতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বরাবর একটি চিঠিও পাঠিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

এদিকে দাম বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের দিক থেকে কিছু যুক্তি দেখানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, জ্বালানি বেশি দামে কিনে, কম দামে বেশি দিন বিক্রি করা সম্ভব নয়। তাছাড়া পুরো শিল্প খাতে নয়, নতুন উদ্যোগের ক্ষেত্রে নতুন দামে বিল করা হবে। আর পুরনো ব্যবসার ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ বিল হবে নতুন দামে। এছাড়া সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা জানান, জ্বালানির দাম বাড়ানো নিয়ে চাপ আছে। হতে পারে সেই চাপ আন্তর্জাতিক মুদ্র তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির বিপরীতে আরোপিত শর্ত পূরণের চাপ। যেখানে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দেয়া থেকে সরকারকে সরে আসতে বলা হয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) লোকসান পুষিয়ে নেয়ার বিষয়টি তো আছেই। এক্ষেত্রে আরেকটি যুক্তি হচ্ছে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো। কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হলো এসব কারণে বিগত সরকারকেও দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়াতে দেখা গেছে। উল্লেখ্য, নব্বই দশকের পর থেকে দেশের বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের দাম বেড়েছে ২৩ বার, শিল্প-বাণিজ্য সংযোগে বাড়ানো হয়েছে ১৮ বার। যেখানে প্রতি ইউনিট ঘনফুট গ্যাসের দাম ১ টাকা থেকে বাড়িয়ে এখন তা সর্বোচ্চ করা হয়েছে সাড়ে ৩১ টাকা।

এর বাইরে বিগত সরকারের শাসনামলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি ঘটেছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক দেনায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে; দেউলিয়া হয়েছে বহু প্রতিষ্ঠান। গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে লাখ লাখ টাকা ক্যাপাসিটি পেমেন্টও দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে ছিল আর্থিক লোকসান ও সংকটের কথা বলে দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়ানো। এতে শিল্প খাতের ওপরও চাপ বেড়েছে। আর বিপরীতে দিন দিন গ্যাসের মজুদ কমেছে। এমন বাস্তবতায় বর্তমান সরকারও দাম বাড়ানোর পথে হাঁটবে, এটি অপ্রত্যাশিত।

বরং সরকার দাম বাড়ানোর বিষয়ে যতটা আগ্রহী, ততটা নজর নতুন গ্যাস কূপ অনুসন্ধান ও উত্তোলন বৃদ্ধিসহ জ্বালানি খাতের দুর্নীতি দূর করায় দেয়া প্রয়োজন। এতে জ্বালানির উৎপাদন যেমন বাড়ানো সম্ভব, তেমনি উৎপাদন ব্যয় কমে আসবে। এজন্য উৎপাদন পর্যায়ে যেসব লুক্কায়িত চার্জ আছে, সেগুলো বের করা প্রয়োজন এবং দুর্নীতি-অনিয়ম যেমন চুরি করে গ্যাসের সংযোগ নেয়া, বরাদ্দের অতিরিক্ত ব্যবহার করা ইত্যাদির সমাধান জরুরি। পাশাপাশি গ্যাসের নতুন কূপ অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোয় জোর দেয়া আবশ্যক। একই সঙ্গে সরকারকে ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প জ্বালানি উৎপাদনের দিকে ঝুঁকতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহায়ক নীতি ও কৌশল প্রণয়ন করতে হবে।

আর শিল্প খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গ্যাসের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনাটি আরো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। কারণ খাতটি এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক জ্বালানি সংকটে রয়েছে। জ্বালানির অভাবে শিল্পঘন এলাকাগুলোর অনেক কারখানার উৎপাদন ৫০-৬০ শতাংশ কমেছে। আবার সামষ্টিক অর্থনীতির নানা সংকটে শিল্প খাতে ঋণ ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিও সেভাবে হয়নি। এমন অবস্থায় গ্যাসের দাম বাড়ানো সংকটগুলোকে আরো প্রকট করে তুলতে পারে।

গ্যাসের দাম বাড়ানোর অর্থ উৎপাদন ব্যয় বাড়ানো। এতে বাজারে চূড়ান্ত পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে এ দাম বৃদ্ধি উসকে দেবে বলে প্রতীয়মান হয়। তাছাড়া নির্দিষ্ট করে যদি বৃহৎ ও রফতানিমুখী শিল্প হিসেবে পোশাক ও বস্ত্র খাতের কথা বলি, ডলার ও রিজার্ভ সংকটের দিনে যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানিমুখী শিল্পকে আরো প্রতিযোগিতা সক্ষম করা প্রয়োজন, সেখানে চূড়ান্ত পণ্যের দাম বাড়বে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত থাকা দরকার। কারণ প্রতিযোগী দেশ থেকে যদি কম মূল্যে তুলনামূলক একই পণ্য পাওয়া যায়, তাহলে বৈশ্বিক ক্রেতারা কেন ক্রয়াদেশ এ দেশকে দেবেন? তাছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট ও পরবর্তীতে সৃষ্ট আর্থসামাজিক অস্থিতিশীলতায় পোশাক শিল্প মালিকরা ক্রেতাদের চাহিদামতো যথাসময়ে পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সেই সময় প্রায় ১৫-২০ শতাংশ ক্রয়াদেশ বাতিল করা হয়েছিল। এর বাইরে শিল্পে গ্যাসের দাম বাড়ানোর আগে পোশাক আমদানির বর্তমান পরিস্থিতিও লক্ষণীয়।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পোশাকের আমদানির হার হ্রাস পেয়েছে বলে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাড একটি পূর্বাভাস দিয়েছে। তাদের সেই প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে পোশাক আমদানি ৫ শতাংশ কমতে পারে। আমদানি কমার নেতিবাচক প্রভাব এরই মধ্যে দেশের পোশাক শিল্পে পড়েছে, বিশেষ করে রফতানি মূল্যের ওপর। সুতরাং যেখানে দেশের রফতানি আয় কমছে, সেখানে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে উৎপাদন ব্যয় বাড়ানো আরো চাপের মুখে ফেলবে রফতানি শিল্পকে।

এদিকে এরই মধ্যে রফতানি খাতে প্রচলিত প্রণোদনা কমিয়ে আনা হয়েছে। আবার চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানকালীন ও পরবর্তী সময়ে নানা কারণে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়া, ব্যাংক খাতের অরাজকতা, শ্রম অসন্তোষ ও সার্বিক নিরাপত্তা ঘিরে শিল্পের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল বিপর্যস্ত হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চাওয়া, শুধু গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নয়, সরকারের পক্ষ থেকে এমন উদ্যোগ নেয়া হবে যা শিল্প খাতে স্বস্তি ফেরাবে।

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হবে। শিল্প খাতকে আরো প্রতিযোগিতা সক্ষম করবে, যাতে এটি আন্তর্জাতিক বাজারে টেকসই হয়। শিল্পে নতুন উদ্যোগের বিকাশ ঘটবে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই তাতে উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হবেন। এতে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি হবে না, যার প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। তাই সরকারের এমন পরিকল্পনা থেকে সরে আসা প্রয়োজন যা শিল্প খাতের সংকটগুলো আরো প্রকট করতে পারে।