সময়ের পরিক্রমায় রাজধানী ঢাকায় জনসংখ্যা বেড়েছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে যোগাযোগ অবকাঠামো ও পরিবহনের সংখ্যা। কিন্তু সড়কে যান চলাচলের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। এতে ঢাকার গুরুতর সমস্যা হয়ে উঠেছে যানজট। এর প্রধানতম কারণ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। বিশেষত নির্ধারিত স্থানে যানবাহন পার্ক না করে যত্রতত্র পার্কিং করায় ঢাকার সড়কে তীব্র যানজট তৈরি হয়। গণপরিবহন যত্রতত্র থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো হয়। সরকারি বা ব্যক্তিগত গাড়ি সড়কের পাশে দীর্ঘক্ষণ পার্ক করে রাখা হয়। পণ্যবাহী পরিবহনও সড়কের দুই পাশ দখল করে পার্ক করা হয়। আবার দুই বা তিন চাকার বাহন সড়কের বিভিন্ন মোড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড় করানো হয়। এতে যানবাহন চলাচলের জন্য ব্যবহারযোগ্য সড়কের আয়তন কমে যায় ও যানজট তৈরি হয়। অর্থাৎ পার্কিং ব্যবস্থা কোনো নিয়মের মধ্যে আনা যায়নি। এমনকি এ নিয়ে প্রায় পাঁচ বছর আগে প্রণয়ন করা হয়েছিল পার্কিং নীতিমালার খসড়া। কিন্তু সেটি আজও বাস্তবায়ন হয়নি। অথচ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পার্কিং নীতিমালা থাকাটা জরুরি।

ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও সমন্বয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। পাঁচ বছরেও কেন পার্কিং নীতিমালা চূড়ান্ত হয়নি সে বিষয়ে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বণিক বার্তা। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পার্কিং নীতিমালা প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তার বদলির কারণে কাজে ব্যাঘাত ঘটেছে। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নীতিমালা বাস্তবায়নের কাজে বর্তমানে মনোযোগী নয়। মন্ত্রণালয় নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব কথা কিছু প্রশ্নের উদ্রেক ঘটায়।

দেশে নির্বাচিত সরকার না থাকার সবে এক বছর হয়েছে। গত বছরের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিগত তথাকথিত নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটেছে। তাহলে অন্য চার বছর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিসের বা কোন সরকারের অপেক্ষায় ছিল? বদলির ঘটনাও যে গত বছর দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে ঘটেছে সেটিও নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কেন আগে সেই নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে পারেনি, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন। এগুলো স্রেফ কথার কথা বলেই প্রতীয়মান হয় এবং ডিটিসিএ ও তৎকালীন ও বর্তমান সরকারের সদিচ্ছার অভাবকে প্রতিফলিত করে। বিষয়টি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের আরবান ট্রান্সপোর্ট অনুবিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিবের বক্তব্যেও স্পষ্ট। তিনি জানিয়েছেন পার্কিংসংক্রান্ত কোনো খসড়া নীতিমালা যে রয়েছে সেটি ডিটিসিএ বা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়নি। পথচারী নিরাপত্তা খসড়া প্রবিধানমালা, ২০২১ বিষয়েও তিনি অবগত নন। উল্লেখ্য, অতিরিক্ত সচিব হিসেবে ওই কর্মকর্তাকে নিয়োজন করা হয়েছে দুই মাস আগে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং ডিটিসিএকে খসড়া পার্কিং নীতিমালা চূড়ান্ত করার জন্য উদ্যোগী হতে হবে। তাদের মনোযোগের অভাবে নীতিমালাটি যে আজও চূড়ান্ত হয়নি সেটি বলা বাহুল্য হবে। তবে চূড়ান্ত করার আগে সেটির পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার, যাতে তা পুরোপুরি সময় ও যুগোপযোগী হয়। তাহলে আশা করা যায় যে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কিছুটা হলেও উন্নত হবে। কেননা নীতিমালার খসড়ায় পার্কিং স্থান তৈরি ও ব্যবহারসহ নানা নির্দেশনা রয়েছে। শহর এলাকার অনুমোদিত রোড সাইন ও মার্কিং দ্বারা চিহ্নিত পার্কিং স্থান ব্যতীত অন্যান্য এলাকার রাস্তার ওপর পার্কিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। সেই সঙ্গে এ নির্দেশনা অমান্য করলে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশও উল্লেখ করা হয়েছে খসড়া নীতিমালায়। সেখানে বলা হয়েছে, রাস্তা ও ফুটপাতের ওপর অননুমোদিত পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। অবৈধভাবে পার্কিং করা যানবাহনের ফটোগ্রাফ, ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।

নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবায়নও জরুরি। কীভাবে সেটি বাস্তবায়ন হবে সেদিকেও নজর দিতে হবে দায়িত্বপ্রাপ্তদের। কারণ আইন তো আছেই দেশে, কিন্তু আইনের পরিপালন নেই বলেই সড়কে মানুষের নানা ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হয়। ওই নীতিমালায় ডিটিসিএকে পার্কিং সুবিধাদির ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি কাজে সমন্বয় ও পরিবীক্ষণের দায়িত্ব দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, সিটি করপোরেশন, পুলিশ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির সুপারিশের মাধ্যমে অন-স্ট্রিট পার্কিং নির্ধারণ করা হবে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পার্কিং সুবিধাদির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকবে। সুতরাং নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার পর এসব প্রতিষ্ঠানকে যথাযথভাবে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রয়োজনে নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দায়িত্বে অবহেলা করলে ও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নমনীয় থাকলে কেবল নীতিমালার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। নগর বিশেষজ্ঞদেরও অভিমত, নির্ধারিত পার্কিংয়ের স্থান ব্যতীত যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ের কোনো সুযোগ নেই। তাই জনভোগান্তি দূর করতে হলে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, নির্দিষ্ট স্টপেজে যাত্রাবিরতি, ট্রাফিক নিয়ম মেনে চললে অনেকাংশে যানজট কমানো সম্ভব। সুতরাং সড়কের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে অবিলম্বে খসড়া পার্কিং নীতিমালাকে চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। এজন্য প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমেও পার্কিং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কেবল নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। তদারকি যথাযথভাবে করলে পার্কিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব। নীতিমালার বাস্তবায়ন কেবল পার্কিং সমস্যার সমাধান করবে এমন নয়, যানজটও এতে কিছুটা হলেও কমে আসবে বলে প্রত্যাশা রয়েছে।