জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবের পর থেকেই তুমুল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগ’ প্রসঙ্গটি। এতে বলা হয়, বিনা প্রশ্নে ১৫ শতাংশ কর প্রদানের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করা যাবে। অর্থাৎ অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করা যাবে। নানা তর্ক-বিতর্কের মুখে সুযোগটি বহাল রেখেই সংসদে ৩০ জুন বাজেট পাস হয়। উল্লেখ্য, এ বাজেট প্রণয়ন করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। গণ-অভ্যুত্থানের মুখে এ সরকারের পতন ঘটলে স্বাভাবিকভাবে নতুনভাবে অবৈধ অর্থ বৈধ করার বিষয়টি আলোচনায় আসে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বিভিন্ন মহল থেকে এ বিধান প্রত্যাহারের দাবি ওঠে।
এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত ২ সেপ্টেম্বর এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সিকিউরিটিজ, নগদ, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, আর্থিক স্কিম ও ইনস্ট্রুমেন্ট, সব ধরনের ডিপোজিট বা সেভিং ডিপোজিটের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিলের ঘোষণা দেয়। কিন্তু ওই বাজেটের সময় ঘোষিত আবাসন খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত পরিমাণ কর পরিশোধের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত পরিসম্পদ (কালো টাকা) প্রদর্শিত (সাদা) করা সংক্রান্ত বিধানটি বহাল রাখে, যা মোটেও সমীচীন নয়। এ সুযোগ বাতিল করা জরুরি। কারণ এটি অবৈধ পন্থায় উপার্জনকারীদের এক ধরনের উৎসাহ দিচ্ছে। একই সঙ্গে প্রশ্নহীনভাবে আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তাদেরকে সুরক্ষাও দিচ্ছে। তাছাড়া এটি সৎপথে উপার্জনকারীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণে এবং সমাজে অন্যায্যতাকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, কালো টাকা সাদা করার সুযোগটি পুরোপুরি অসাংবিধানিক ও অনৈতিক। বাংলাদেশের সংবিধানের ২০(২) ধারা এ কথাই বলছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করবে, যেখানে সাধারণ নীতি হিসেবে কোনো ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করতে সমর্থ হবে না। অথচ রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগের মাধ্যমে দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাতদের অপ্রদর্শিত বা জ্ঞাত উপায়বহির্ভূত আয়কে বৈধতা দেয়ার সুযোগ রাষ্ট্র রেখে দিয়েছে। এমনকি বিশ্লেষকরা বলছেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া মানি লন্ডারিং আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
যদিও অবৈধ আয় বৈধ করার সুযোগের পেছনে বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেয়া হয়েছে যে এতে অর্থ পাচার আটকানো যাবে ও অপ্রদর্শিত অর্থ মূলধারার অর্থনীতিতে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে। মোট কথা, রাজস্ব আয় বাড়বে। কিন্তু সাদা চোখে দেখা যায়, যারা দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়েছে তাদের লাগাম টেনে না ধরে, তাদের থেকে প্রাপ্য রাজস্ব আহরণ না করে প্রকৃত অর্থে কখনই রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব নয়। রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য প্রয়োজন দুর্নীতি দমন করতে পারে এমন আর্থিক নীতি। বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখার মতো নীতি বরং সরকারের আর্থিক অব্যবস্থাপনাকে স্পষ্ট করে। এক্ষেত্রে সরকারের বিবেচনার অবকাশ রয়েছে। যে ব্যক্তি দেশের বাইরে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করতে সক্ষম, নির্ধারিত কর প্রদান করে সে ব্যক্তির দেশে টাকা বৈধ করার আবশ্যকতা রয়েছে কি? এভাবে কেবল দুর্নীতিকে লালন করা হবে।
এদিকে আবাসন খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আবাসন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার সুযোগে রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকায় জমি, প্লট, অ্যাপার্টমেন্টের দাম বাড়ছে। তাদের মতে, বিগত পতিত সরকারের আমলে অনেকেই অনৈতিক পন্থায় এবং দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় সম্পত্তি কেনার দিকে মনোযোগী ছিলেন। সেসব এলাকায় জমি, প্লট, অ্যাপার্টমেন্ট সীমিত থাকলেও বিপুল চাহিদার কারণে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দাম। আর বর্তমানে সে সরকার না থাকলেও দাম বাড়ার প্রবণতা বজায় রয়েছে কালো টাকা সাদা করার সুযোগের কারণে।
বৃহৎ অনলাইন প্রপার্টি মার্কেট প্লেসের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকার সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রপার্টি বাজার গুলশান। এখানে আগের মতোই আকাশচুম্বী জমি, প্লট, অ্যাপার্টমেন্টের দাম। ক্ষেত্রবিশেষে সাম্প্রতিক সময়ে দাম আরো বেড়েছে। কলাবাগান, শান্তিনগর, শ্যামলীর মতো এলাকায় যেখানে প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম পড়ে ৭-১০ হাজার টাকা, সেখানে গুলশানে কিনতে হয় ১৫-২০ হাজার কিংবা তারও বেশি টাকায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব এলাকার ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টের ব্যয় লন্ডন-দুবাই-নিউইয়র্কের অভিজাত এলাকাগুলোর বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের মূল্যকেও ছাড়িয়ে যেতে দেখা গেছে। ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টের মতো গুলশানে জমির দামও বেশি। এখানে বর্তমানে প্রতি কাঠা জমি ২ থেকে ৩ কোটি টাকা, ক্ষেত্রবিশেষে তার চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। দেশের আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশেরও (রিহ্যাব) দাবি, গুলশানে প্রপার্টির উচ্চ মূল্য কৃত্রিমভাবে গড়ে তোলা হয়েছে।
কর প্রয়োগের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ পৃথিবীর অন্য অনেক দেশেও আছে। এক্ষেত্রে যেসব দেশ এর মাধ্যমে কর ফাঁকি ও অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের চিহ্নিত করতে পেরেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, কেবল তারাই সফল হয়েছে। অর্থাৎ কোনো রাজনৈতিক আপসে যায়নি। অথচ দেশে এ সুযোগ দেয়া হয়েছে বিনা প্রশ্নে। প্রশ্ন থেকে যায়, এ সুযোগ প্রদানের উদ্দেশ্য কী?
‘বিনা প্রশ্নে’ কালো টাকা সাদা করার সুযোগ না থাকলে হয়তো বহালকৃত সুযোগের মাধ্যমে অবৈধ আয়ের উৎস ঠাহর করতে সুবিধা হতো। এটি অর্থ পাচার বন্ধে সহায়ক হতে পারত। কিন্তু এটি স্রেফ অবৈধ অর্থকে বৈধ করার সুযোগ দিচ্ছে। কালো টাকা সাদা করার এমন বিধান অবিলম্বে বাতিল করা প্রয়োজন। দুর্নীতি রোধে ও অপ্রদর্শিত অর্থ মূল ধারার অর্থনীতিতে আনতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় মনোযোগ দেয়া দরকার।










