ফলে অনেকবার শিক্ষার্থী এমনকি শিক্ষকদের মাঝেও দেখা গেছে অস্থিরতা। সঠিক বাস্তবায়ন ও দূরদর্শিতার অভাবে এসব পরীক্ষামূলক কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। ফলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিশ্রুতি এখনো কাগুজে পরিকল্পনা বা ডিজিটাল সজ্জাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। অথচ একুশ শতকের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য সুসংহত, কারিগরি ও দক্ষতামূলক শিক্ষা কাঠামোর বাস্তবায়ন একটি অপরিহার্য উদ্যোগ। কারণ গত কয়েক দশকে দেশে সাক্ষরতার হার বেড়েছে, শিক্ষা অবকাঠামোর পরিসর বিস্তৃত হয়েছে এবং শিক্ষা কাঠামোতে অংশগ্রহণও অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু প্রচলিত শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থান ও বাস্তব জীবনের সংযোগ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। তবে সম্প্রতি জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা খাতকে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দে উন্নীত করার মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন। মহাপরিকল্পনার ভাষা আধুনিক এবং দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক। কিন্তু বরাদ্দ বাড়ালেই শিক্ষার মান বাড়ে না—এ কথাও অনুধাবন করতে হবে। বরাদ্দের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে পারলেই শিক্ষা কাঠামোর প্রকৃত সংস্কার সম্ভব। এ পরিকল্পনাকে নিছক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বরং গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমূলে পাল্টে যুগোপযোগী করে দ্রুত পরিবর্তন আনতে হবে।

দেশের শিক্ষা সংস্কারের ইতিহাস হলো ভালো উদ্দেশ্য আর দুর্বল বাস্তবায়নের ইতিহাস। এরই ধারাবাহিকতায় দেশে এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে যা মুখস্থনির্ভর এবং আধুনিক শ্রমবাজারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। শিক্ষা অবকাঠামোর প্রচার-প্রসার বাড়ায় দেশে ডিগ্রিধারী গ্র্যাজুয়েট অনেক বেড়েছে। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায় থেকে উচ্চ শিক্ষা স্তর পর্যন্ত যে সিলেবাস ও পাঠ্যসূচি অনুসরণ করা হয় তা ‘দক্ষ মানবসম্পদ’ তৈরির জন্য উপযুক্ত নয়। শিক্ষা সংস্কার বারবার হোঁচট খেয়েছে পরিকল্পনা আর বাস্তবতার মাঝখানে বিশাল ফারাক থাকায়। জনশক্তি রফতানি হয়েছে, কিন্তু মেধা রফতানি হয়নি। কারখানায় কাজের লোক পাওয়া গেছে, কিন্তু পরিচালনার মতো দক্ষ ব্যক্তি তৈরি হয়নি। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে, কিন্তু শিল্পের সঙ্গে সংযোগ না থাকায় সেখানকার পাস করা শিক্ষার্থী চাকরির বাজারে অচেনা মুখ। এমনকি সাধারণ শিক্ষা পদ্ধতির সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার তুলনা করার ক্ষেত্রে এটিকে দ্বিতীয় সারির মর্যাদা দেয়ার প্রবণতা রয়েছে। এদিকে মাদরাসায় সংস্কারের কথা উঠলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ দেখা যায়। এসব বাদে সবচেয়ে বড় সংকট হলো শিক্ষকের মান। বেতন কম, মর্যাদা কম, জবাবদিহির অভাব থাকায় মেধাবী অনেকেই শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হতে আগ্রহী নন।

বর্তমানে দেশের বিশাল এক তরুণ জনগোষ্ঠী বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ রয়েছে। এ জনসংখ্যাকে উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা না গেলে এ সম্ভাবনা একসময় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম বয়সে এবং এ জনমিতিক সুবিধার জানালা বেশি দিন খোলা থাকবে না। ২০৩৫ সালের পর বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অনুপাত বাড়তে শুরু করবে। এজন্য এ দশকই সরকারের জন্য সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সুযোগ। তবে সম্প্রতি সরকার শিক্ষা কাঠামোর সংস্কারে যে ৪৩টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে সেগুলোর ব্যবহারিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে জনমিতিক লভ্যাংশ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করবে। সরকারের চিহ্নিত ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি চালু, শিক্ষা অবকাঠামোতে ইন্টারনেট সেবা সুলভ করা এমনকি শিক্ষার্থীদের পুষ্টির চাহিদা পূরণের কথা বলা হয়েছে। দেশের শিক্ষা খাতের বাস্তবতায় এগুলোই সঠিক পথ। কিন্তু এর চ্যালেঞ্জও রয়েছে। শিক্ষা অবকাঠামোতে শুধু প্রযুক্তিপণ্য সংযুক্ত করার কাজে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। শিক্ষার গুণমান বাড়াতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু জ্ঞানই অর্জন করবে না, তা বাস্তব জীবনেও প্রয়োগ করতে পারবেন।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল কিছু দেশ শিক্ষা কাঠামোকে উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে ব্যাপক উন্নতি করেছে। এক্ষেত্রে ভিয়েতনামের উদাহরণ আসে। নব্বইয়ের দশকে দেশটির মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের চেয়ে কম ছিল। তবে তারা শিক্ষায় বিনিয়োগকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেয়। এজন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক মর্যাদা বাড়ানোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা পরিমাপ করার মতো করে তোলা হয়। বর্তমানে পিআইএসএ পরীক্ষায় ভিয়েতনামের শিক্ষার্থীরা ঈর্ষণীয় ফল দেখাচ্ছে। এশিয়ার আরেক দেশ ইন্দোনেশিয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পাঠ্যক্রম তৈরিতে সরাসরি যুক্ত করে। সেখানে ভোকেশনাল স্কুলের শিক্ষার্থীদের স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে শিক্ষানবিসি করতে হয়। এভাবে শিক্ষার্থীরা পাস করার আগেই নিয়োগকর্তার আস্থা অর্জন করে কর্মসংস্থান গড়ে নিতে পারেন। এমনকি গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডা নিজেদের টেক হাবে পরিণত করার জন্য প্রযুক্তিকে শিক্ষার কেন্দ্রে রেখেছে। এসব অভিজ্ঞতাই বলে, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে শিক্ষার রূপান্তর সম্ভব। বাংলাদেশের সামনেও এখন সে সুযোগ আছে।

সরকার শিক্ষা কাঠামোর সংস্কারে যে নতুন পরিকল্পনা করছে, সেখানে দেশের শীর্ষ শিল্পোদ্যোক্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। শ্রমবাজারের চাহিদার কথা বিবেচনা করে সিলেবাসে পাঠ্যসূচি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সারা দেশে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ফ্রি ওয়াই-ফাই এবং শিক্ষার্থীদের ‘এডু আইডি’ দেয়ার সিদ্ধান্তও ইতিবাচক। তবে সরকারকে শহর ও গ্রামের ইন্টারনেটের গতি বা প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় যে ফারাক রয়েছে, তা দূর করতে হবে। শুধু সংযোগ দিলে হবে না, বাংলায় মানসম্পন্ন ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ তৈরিতে বিনিয়োগ করতে হবে। এআই, সাইবার সিকিউরিটি ও ফ্লুটার প্রোগ্রামিংয়ের যে প্রশিক্ষণের ঘোষণা এসেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে স্থানীয় টেক কোম্পানিগুলোকে অংশীদার করতে হবে। ‘এডু-আইডি’ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষার্থীর অগ্রগতি ট্র্যাক করা উচিত, যাতে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা বিশেষ সহায়তা পায়। কিন্তু দেশে প্রযুক্তি জ্ঞানকে মূল কারিকুলামের অংশ এখনো করা যায়নি। এজন্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই), সাইবার সিকিউরিটি এবং ডেটা সায়েন্সের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। এমনকি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এ সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানোর বিষয়ে জোর দিতে হবে। এও লক্ষ রাখতে হবে, প্রযুক্তি যেন শিক্ষার্থীদের বিনোদনের মাধ্যম না হয়ে শিক্ষার টুলস হয়ে ওঠে। জিডিপির ৫ শতাংশ কেবল বেতন বা দালান তৈরিতে ব্যয় না করে একটি বড় অংশ মৌলিক গবেষণায় বরাদ্দ করতে হবে। বিশেষ করে তথ্য ও কৃষিপ্রযুক্তিতে উদ্ভাবনের জন্য শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে হবে। শিক্ষা অবকাঠামো মানে কেবল ইট-পাথরের দালান নয়, বরং এমন একটি পরিবেশ—যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী তার সৃজনশীলতাকে প্রযুক্তির সহায়তায় বাস্তবে রূপ দিতে পারবে।

সরকারের মহাপরিকল্পনায় স্মার্ট ক্লাসরুম চালুর উদ্যোগ চমৎকার। কিন্তু এসব উদ্যোগকে পরিচালনার দায়িত্ব যাদের ওপর অর্থাৎ শিক্ষকদের প্রযুক্তি ব্যবহারে যথাযথ দক্ষতা আছে কিনা এটি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের নিয়মিত রিফ্রেশার প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ এবং কর্মক্ষমতার ভিত্তিতে পদোন্নতির ব্যবস্থা না থাকলে বাকি সব উদ্যোগ ফাঁকা থাকবে। কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা যথেষ্ট নয়। পাঠ্যক্রম কে বা কারা তৈরি করবেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ। গার্মেন্টস, আইটি, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ—প্রতিটি খাতের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বসে পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করতে হবে, যাতে পাস করার পর পরই চাকরির বাজারে প্রাসঙ্গিক থাকেন শিক্ষার্থী। পরিশেষে, শিক্ষা অবকাঠামোতে জবাবদিহির কাঠামো তৈরি জরুরি। সরকারের তিন মেয়াদি পরিকল্পনার প্রতিটি মাইলস্টোন পর্যবেক্ষণে একটি স্বাধীন মনিটরিং কমিটি করা যেতে পারে। এ কমিটিতে সরকার, শিক্ষাবিদ, শিল্পপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের রাখা যেতে পারে। এমনকি শিক্ষা খাতে অর্জন ও ব্যর্থতা—এ দুইয়ের তথ্য প্রকাশেই স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।