নিকোলাস মাদুরো এখন ভেনিজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট—যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে বন্দি। মার্কিন বিশেষ বাহিনীর হাতে তার ক্ষমতাচ্যুতি অবশ্য শেষের শুরু নয়; বরং এক অর্থে এটিকে শুরুর সমাপ্তি বলাই বেশি যথাযথ। নিশ্চিতভাবেই, ভেনিজুয়েলায় বা বিশ্বের অন্য কোথাও খুব কম মানুষই মাদুরোর অপসারণে শোকাহত হবে। তিনি ছিলেন একজন স্বৈরশাসক—যিনি নির্বাচন চুরি করেছেন, নিজের জনগণকে দমন করেছেন, বিপুল তেলসম্পদ থাকা সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছেন এবং মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
কিন্তু তাই বলে এ সামরিক অভিযান যে ন্যায্য কিংবা দূরদর্শী ছিল, এমনটা বলা যায় না। বাস্তবে এর বৈধতা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। কৌশলগত মূল্যও ছিল সন্দেহজনক। মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো তাৎক্ষণিক হুমকির সৃষ্টি করছিলেন—এমন প্রমাণও ছিল না। পরিষ্কার করে বলা দরকার: এটি ছিল প্রয়োজনের তাগিদে নয়, বরং পছন্দের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি সামরিক অভিযান। এ অভিযানের সঙ্গে ১৯৮৯ সালে পানামার শক্তিমান শাসক ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে অপসারণে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচডব্লিউ বুশের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানের কিছু বাহ্যিক সাদৃশ্য রয়েছে। তবে নোরিয়েগার বিরুদ্ধে আইনি যুক্তি ছিল অনেক বেশি শক্তিশালী, যার মধ্যে মাদক অপরাধের পাশাপাশি একজন মার্কিন সেনাসদস্য হত্যার ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। একই সঙ্গে পানামায় অবস্থানরত অন্যান্য মার্কিন সামরিক সদস্যদের নিরাপত্তা এবং পানামা খালের সুরক্ষা নিয়েও যৌক্তিক উদ্বেগ ছিল।
ভেনিজুয়েলাকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেয়ার সিদ্ধান্তটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশ্যই স্পষ্ট করে তোলে। অভিযানের পর সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, তার প্রধান অগ্রাধিকার ছিল ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল মজুদের একটি। এর বাইরে গৌণ লক্ষ্য হিসেবে ছিল ভেনিজুয়েলার মাদক বাণিজ্যে সম্পৃক্ততার অবসান, দেশ ছেড়ে যাওয়া নাগরিকদের ফিরে আসতে সহায়তা করা এবং কিউবার ওপর চাপ আরো জোরদার করা। কিউবা তার দুর্বল ও নিষেধাজ্ঞাকবলিত অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে ব্যাপকভাবে ভর্তুকিযুক্ত ভেনিজুয়েলার তেলের ওপর নির্ভরশীল। তবে এ অভিযানকে সাফল্য হিসেবে ঘোষণা করা ভয়াবহভাবে আগেভাগে করা হবে। একজন ব্যক্তিকে ক্ষমতা থেকে সরানো এক বিষয়; কিন্তু একটি শাসন ব্যবস্থাকে উৎখাত করে তার জায়গায় আরো সহনশীল ও টেকসই কোনো ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেক বেশি কঠিন কাজ। ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েলের ‘পটারি বার্ন নীতি’ পুরোপুরি প্রযোজ্য: আমরা এটি ভেঙেছি, এখন এর দায় আমাদেরই নিতে হবে।
ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলাকে ‘পরিচালনা’ করবে। এ ঘোষণার বিস্তারিত এখনো অস্পষ্ট, আর এর জন্য কোনো দখলদার বাহিনী প্রয়োজন হবে কিনা, সেটিও পরিষ্কার নয়। তবে একটি বিষয় আপাতত স্পষ্ট: ট্রাম্প প্রশাসনবিরোধী শক্তিকে ক্ষমতায় আনতে আগ্রহী না হয়ে বিদ্যমান শাসন ব্যবস্থার অবশিষ্ট অংশের সঙ্গেই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। বাস্তবে মনে হচ্ছে, মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তারা একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে, যিনি এখন সরকার পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন। এ অবস্থান এমন এক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার প্রেরণা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বা মানবাধিকার সুরক্ষা নয়; বরং বাণিজ্যিক লাভের সম্ভাবনা। সব ধরনের সম্ভাব্য সমস্যাকে উপেক্ষা করা যেতে পারে, কিন্তু সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শৃঙ্খলার ভাঙন—খোলাখুলিভাবে স্বীকার করা জরুরি। সরকারপন্থী শক্তিগুলো সক্রিয় থাকবে, আর বিরোধী শিবির মোটেই ঐক্যবদ্ধ নয়; বরং ক্ষমতার বাইরে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা হলে তারা প্রতিরোধে নামতে পারে। এ অনিশ্চয়তাগুলো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত থাকবে—সে বিষয়ে কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্ম দিতে পারে। এই অভিযান ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সারবত্তাই তুলে ধরে। এটি ছিল মূলগতভাবে একতরফা। আইনি কাঠামো বা আন্তর্জাতিক মতামতের প্রতি এতে খুব কমই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ইউরোপ, ইন্দো-প্যাসিফিক বা মধ্যপ্রাচ্যের বদলে জোর দেয়া হয়েছে পশ্চিম গোলার্ধে। লক্ষ্য ছিল বাণিজ্যিক সুবিধা—এক্ষেত্রে তেল সম্পদে প্রবেশাধিকার এবং স্বদেশীয় নিরাপত্তা জোরদার করা, যা মাদক ও অভিবাসনসংক্রান্ত উদ্বেগের প্রতিফলন। এই সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তবে তা সীমিত পরিসরে।
ভেনিজুয়েলা অভিযানের সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিক হতে পারে এর দৃষ্টান্তমূলক প্রভাব। এটি কার্যত এ ধারণাকে বৈধতা দেয় যে বড় শক্তিগুলো নিজেদের প্রভাববলয়ে যেসব নেতাকে তারা অবৈধ বা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে তাদের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করতে পারে। কল্পনা করাই যায়, ইউক্রেনকে ‘নাৎসিমুক্ত’ করার আহ্বান জানানো এবং প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে অপসারণের কথা বলা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এতে সম্মতির ইঙ্গিত দিচ্ছেন। ভেনিজুয়েলায় ট্রাম্পের সামরিক অভিযান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আলোচনার মাধ্যমে অবসান ঘটার সম্ভাবনাকে আগের তুলনায় আরো ক্ষীণ করে তুলেছে। চীনের প্রতিক্রিয়াও সম্ভবত একই রকম হবে। বেইজিং তাইওয়ানকে বিচ্ছিন্ন প্রদেশ হিসেবে দেখে এবং দ্বীপটির সরকারকে অবৈধ বলে মনে করে। এর মানে এই নয় যে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং হঠাৎ করেই তাইওয়ান নিয়ে নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। তবে ভেনিজুয়েলার ঘটনাপ্রবাহ তার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে যে তিনি যদি কখনো তাইওয়ানে আক্রমণ, অবরোধ বা অন্য কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করেন, তাহলে তাতে সফল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মাদুরোকে উৎখাতের এ অভিযান স্পষ্ট করে দেয় যে সদ্য প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া উচিত এবং ট্রাম্প প্রশাসন পশ্চিম গোলার্ধকে এমন একটি অঞ্চল হিসেবে দেখছে, যেখানে মার্কিন স্বার্থই সর্বাগ্রে। রাশিয়া ও চীন একে স্বাগত জানাবে—কারণ এতে তাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়, যেখানে বিশ্ব বিভক্ত প্রভাববলয়ে ভাগ হয়ে যাবে, ইউরোপে মস্কো এবং ইন্দো-প্যাসিফিকে বেইজিংয়ের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রায় ৮০ বছর ধরে টিকে থাকা যে বৈশ্বিক ব্যবস্থার সঙ্গে আমরা পরিচিত, তা এখন তিনটি আঞ্চলিক ব্যবস্থায় রূপ নেয়ার দ্বারপ্রান্তে—যেগুলো সম্ভবত মোটেও সুশৃঙ্খল বা স্বাধীন হবে না।
কলম্বিয়ার মতো লাতিন আমেরিকার আরো কয়েকটি দেশ মার্কিন হুমকির মুখে রয়েছে। এয়ার ফোর্স ওয়ানে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের ব্যাপারে এক সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কোনো রাখঢাক না রেখেই ট্রাম্প বলেন, ‘ও খুব বেশি দিন এটা করতে পারবে না, ওর কাছে কোকেন মিল আছে, কোকেন ফ্যাক্টরি আছে। ও এটা চালিয়ে যেতে পারবে না।’ এটি হয়তো ফাঁকা হুমকি—ভালোভাবে সুরক্ষিত শয়নকক্ষ থেকে মাদুরোকে দ্রুত ও নিখুঁতভাবে তুলে নেয়ার ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা দেখিয়ে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে চাপে রাখার একটি কৌশলমাত্র। কিন্তু ট্রাম্পের যুক্তির কেন্দ্রবিন্দু ছিল মার্কিন ক্ষমতা এবং মাদুরো অভিযানের মাধ্যমে সেই ক্ষমতা ব্যবহারে তিনি কতটা প্রস্তুত, তার প্রকাশ। ‘পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার আধিপত্য আর কখনো প্রশ্নবিদ্ধ হবে না,’ ফ্লোরিডায় তার ব্যক্তিগত ক্লাব মার-আ-লাগো থেকে ভেনিজুয়েলায় হামলার ঘোষণা দিয়ে সাংবাদিকদের বলেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প সাধারণত সোজাসাপটা ঘোষণার ভাষায় কথা বলেন। সে কারণেই তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও রোববার সারা দিন ধরে প্রেসিডেন্টের বক্তব্য কিছুটা নরম করার চেষ্টা করেন—বিশেষ করে ট্রাম্প একাধিকবার যে কথা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অনির্দিষ্টকালের জন্য ভেনিজুয়েলাকে ‘পরিচালনা’ করবে। তবে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে তুলনামূলকভাবে সূক্ষ্ম একটি অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের সদ্য প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের ১৫ নম্বর পাতায় যে নথিটি দেখে মনে হয়, মার্কিন ভূখণ্ডগত দুঃসাহসিকতার এ মুহূর্তটিকে মাথায় রেখেই তা প্রণয়ন করা হয়েছে।
নথিটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে ভেনিজুয়েলার বাইরেও ট্রাম্প কী ভাবছেন, তার আভাস পাওয়া যায় কলম্বিয়া থেকে মেক্সিকো, কিউবা এবং গ্রিনল্যান্ড পর্যন্ত। বরফাচ্ছন্ন এ ভূখণ্ডটি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো না কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণে আসা উচিত বলে ট্রাম্প গত সপ্তাহান্তেও আবার দাবি করেছেন। ‘মনরো নীতির গুরুত্ব অনেক,’ বলেন ট্রাম্প। ওভাল অফিসে তার ডেস্কের পাশে পঞ্চম মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর একটি চিন্তামগ্ন প্রতিকৃতি রাখা আছে—অ্যালেক্সান্ডার হ্যামিলটন ও অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের ছবির মাঝখানে। ‘কিন্তু আমরা এটিকে অনেকখানি ছাড়িয়ে গেছি—খুবই বেশি।’ তিনি সম্ভবত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে উল্লিখিত ‘ট্রাম্প করোলারি’র কথাই বোঝাচ্ছিলেন—মনরোর সেই বিখ্যাত ঘোষণার একটি সম্প্রসারিত সংস্করণ, যার উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকায় ইউরোপীয় শক্তির হস্তক্ষেপ ঠেকানো। এই ‘ট্রাম্প করোলারি’ যুক্তরাষ্ট্রের এমন একটি অধিকার প্রতিষ্ঠা করে, যার মাধ্যমে তারা ‘পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ করতে পারবে এবং ‘অ-গোলার্ধীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের’ মূলত চীনকে—সামরিক শক্তি মোতায়েন, হুমকিমূলক সক্ষমতা গড়ে তোলা কিংবা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ নেয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করতে পারবে।
‘কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ’ দখলে নেয়ার এ বক্তব্যে প্রতিধ্বনিত হয় ট্রাম্পের সেই ব্যাখ্যা, যার মাধ্যমে তিনি ভেনিজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অধিকার দাবি করেছেন, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল মজুদ। শনিবারের বক্তব্যে তিনি প্রায় ২০ বার তেলের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত স্থাপনাগুলো পুনর্গঠন করতে হবে, উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ভেনিজুয়েলার নেতারা ‘আমাদের তেল চুরি করেছে’।
‘আমরাই সেখানে পুরো তেল শিল্পটা গড়ে তুলেছিলাম, আর তারা সেটি এমনভাবে দখল করে নিল, যেন আমরা কিছুই নই,’ তেল খাত সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ট্রাম্প আরো বলেন, ‘আমাদের এমন একজন প্রেসিডেন্ট ছিল, যিনি এ নিয়ে কিছুই করার সিদ্ধান্ত নেননি।’ স্পষ্টত পূর্বসূরি জো বাইডেনের দিকে এ অভিযোগের তীর।
ভেনিজুয়েলায় চীনের ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ রয়েছে। চীনের স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত হবে সে ব্যাপারে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছেও ভেনিজুয়েলার তেল বিক্রি অব্যাহত রাখবে। বর্তমানে চীন দেশটির অতি সীমিত উৎপাদনের অর্ধেক থেকে তিন-চতুর্থাংশ পর্যন্ত আমদানি করে।
লেনদেনভিত্তিক এক প্রেসিডেন্সির জন্য মাদুরোর পতনকে কাজে লাগিয়ে তেলভাণ্ডারের ওপর মার্কিন সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্পের অতিমাত্রায় মনোযোগ প্রত্যাশিতই ছিল। তবে এটি আরো তাৎপর্যপূর্ণ এ কারণে যে ভেনিজুয়েলায় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা বা তা এগিয়ে নেয়াকে তিনি একবারো মার্কিন লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেননি। যদিও ১৯৯৯ সালে হুগো শাভেজ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত দেশটিতে কয়েক দশক ধরে গণতান্ত্রিক চর্চা ও অবাধ নির্বাচনের ঐতিহ্য ছিল। এ অনুপস্থিতি খুব একটা বিস্ময়কর নয়। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের প্রেসিডেন্টদের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে গণতন্ত্র প্রসারের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই একটি মূল উপাদান ছিল, এমনকি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও। কিন্তু নভেম্বরে হোয়াইট হাউজ থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ নথিতে বিষয়টি প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
মাদুরো-পরবর্তী সরকার নিয়ে ভাবতে গিয়ে ট্রাম্প একটি বিষয় লক্ষণীয়ভাবে এড়িয়ে যান। ২০২৪ সালের নির্বাচনে মাদুরো মিথ্যাভাবে নিজের বিজয় দাবি করলেও যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশ যাকে বৈধ বিজয়ী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল, সেই এদমুন্দো গনসালেসকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বসানোর আহ্বান তিনি জানাননি। বর্তমানে ৭৬ বছর বয়সী গনসালেস ছিলেন জনপ্রিয় বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর পক্ষে মনোনীত ‘প্রক্সি’ প্রার্থী। মাচাদোকে নির্বাচনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি সেন্টারের প্রধান নির্বাহী এবং সিনেটর জন ম্যাককেইনের সাবেক সহকারী রিচার্ড ফন্টেইন বলেন, ‘এই বাদ পড়া বিষয়টি ভেনিজুয়েলার সরকারের রাজনৈতিক বৈধতার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সমস্যা তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের এ অভিযানের অনেক সম্ভাব্য সমর্থক কেবল মাদক ও তেল নিয়ে ভিন্ন নীতির আশা করেননি; তারা চেয়েছিলেন স্বাধীনতা।’ তবে তিনি যোগ করেন, ‘ভেনিজুয়েলায় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা তাদের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে যে স্পষ্টভাবে রয়েছে, তা বলা কঠিন।’
ট্রাম্প মাদুরো সরকারের অবশিষ্ট অংশের সঙ্গে কাজ করতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন—যতক্ষণ তারা তার নির্দেশ মেনে চলে, তেলে প্রবেশাধিকার দেয় এবং মার্কিন কোম্পানির সম্পদ জাতীয়করণের জন্য ক্ষতিপূরণ দেয়। এটি রাষ্ট্রগঠন বা ‘নেশন বিল্ডিং’-এর সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধারণা, যা জর্জ ডব্লিউ বুশ আফগানিস্তান ও ইরাকে অনুসরণ করেছিলেন। বুশ অন্তত দাবি করেছিলেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রের মডেল গড়ে তুলছেন। ট্রাম্পের দাবি সেখানে সীমিত—ভেনিজুয়েলার ভূগর্ভস্থ সম্পদের ওপর লেনদেনভিত্তিক অধিকার আদায় পর্যন্তই। ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা মনরো নীতি পুনরুজ্জীবিত করতে আগ্রহী হলেও দুই শতাব্দী আগে এ নীতির উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন—আজ যুক্তরাষ্ট্র যে বাস্তবতার মুখোমুখি, তার সঙ্গে এর তুলনা চলে না।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট মনরো যখন এ নীতি ঘোষণা করেন তখন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক এক কোটি। নৌবাহিনী সীমাবদ্ধ ছিল কয়েক ডজন জাহাজে, যেখানে কর্মরত ছিলেন প্রায় ৩ হাজার ৫০০ নাবিক ও ৫০০ কর্মকর্তা। এ শক্তি ভেনিজুয়েলার উপকূলে মাদুরোকে উৎখাতে পেন্টাগন যে সামরিক বহর মোতায়েন করেছিল, তার প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমান।
তৎকালীন প্রেক্ষাপটও ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। লাতিন আমেরিকার দেশগুলো তখন তাদের দূরবর্তী ঔপনিবেশিক শাসক স্পেন ও পর্তুগালের কর্তৃত্ব ঝেরে ফেলছিল। মনরো ও তার রাজনৈতিক সহযোগীরা আশঙ্কা করেছিলেন, ইউরোপীয় শক্তিগুলো আবারো এসব দেশকে উপনিবেশে পরিণত করার চেষ্টা করতে পারে। সে কারণেই এ ঘোষণার মাধ্যমে সেই প্রভাব বিস্তারের পথ বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু তখনো প্রশ্ন ছিল—সংবিধান অনুমোদনের মাত্র ৩৫ বছর পর—মনরো কিংবা তার উত্তরসূরি জন কুইন্সি অ্যাডামস, অ্যান্ড্রু জ্যাকসন ও মার্টিন ভ্যান বুরেন আদৌ কি ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে ঠেকাতে সক্ষম হবেন।
এ ইতিহাস ট্রাম্পের কাছে অচেনা নয়। তবে শনিবার মনরো নীতি পুনরুজ্জীবিত করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ওই নীতির কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। আমাদের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অধীনে এখন আর আমরা এটি ভুলে যাচ্ছি না। পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার আধিপত্য আর কখনো প্রশ্নবিদ্ধ হবে না।’
সম্ভবত ট্রাম্পের মাথায় তখন চীন ও রাশিয়ার কথাই ছিল। গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের শাসনের আওতায় আনার আহ্বান নতুন করে তোলার ক্ষেত্রেও এ দুই দেশই তার ভাবনায় রয়েছে। প্রায় এক বছর আগে মার-আ-লাগোতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন, এরপর কয়েক মাস এ নিয়ে নীরব ছিলেন। (এদিকে পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ নেয়া কিংবা কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর প্রসঙ্গও তিনি আপাতত তোলা বন্ধ রেখেছেন।)
তবে গত সপ্তাহান্তের যুক্তি থেকে বোঝা যায়, ট্রাম্প এখন মনে করছেন—যে সম্পদ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র টিকে থাকতে পারবে না বলে তিনি বিশ্বাস করেন, সেগুলোর ওপর দাবি জানানোর পথ পরিষ্কার। গ্রিনল্যান্ড নিয়েও তিনি এরই মধ্যে একই ধরনের যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন—সেখানে আদৌ উল্লেখযোগ্য ও উত্তোলনযোগ্য বিরল খনিজ আছে কিনা, তা নিশ্চিত না হলেও। রোববার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার। গ্রিনল্যান্ডজুড়ে রুশ ও চীনা জাহাজ ছড়িয়ে আছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ডেনমার্ক এটা করতে পারবে না।’ গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা জোরদারে ডেনমার্কের পদক্ষেপ নিয়ে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘তারা নাকি নিরাপত্তা বাড়াতে আরেকটা কুকুরের স্লেজ যোগ করেছে।’
দিনের শুরুতেই ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেদেরিকসেন ট্রাম্পের নতুন করে আগ্রহ প্রকাশে স্পষ্টতই বিচলিত হয়ে পড়েন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দখল নেয়ার প্রয়োজন আছে—এভাবে কথা বলার কোনো অর্থই হয় না। ডেনিশ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত তিনটি দেশের কোনো একটিকেও যুক্তরাষ্ট্রের সংযুক্ত করার অধিকার নেই।’
ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে যেমন সহজ অজুহাত ট্রাম্পের হাতে ছিল, গ্রিনল্যান্ডের বেলায় তা নেই। উপরন্তু ন্যাটোর এক মিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক লাভ আদৌ সার্থক হবে কিনা, সেটিও স্পষ্ট নয়—বিশেষ করে সেখানে সম্পদ আহরণের খরচ হবে অত্যন্ত বেশি। কিন্তু ভেনিজুয়েলার তেল ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করাও কম ব্যয়বহুল হবে না। রোববার সন্ধ্যায় এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের কাছে ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেন, ‘ভেনিজুয়েলার অবকাঠামো পচে গেছে, মরিচা ধরেছে।’
তবু ভালো চুক্তির খোঁজে ট্রাম্পের অবিরাম আগ্রহ সত্ত্বেও এসব বিপুল ব্যয় তার কাছে খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে হয় না। ভেনিজুয়েলা, গ্রিনল্যান্ড, গাজা—হয়তো কানাডাও—ট্রাম্পের বিশ্বাস, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব উত্তরাধিকার নিজেদের খরচ নিজেরাই তুলে দেবে। এ প্রক্রিয়ায় তিনি যেন জেমস মনরোর সঙ্গেই এক ধরনের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন—কে ইতিহাসে বড় ছাপ রেখে যেতে পারেন, সেই প্রশ্নে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
রিচার্ড হ্যাস: কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস, সেন্টারভিউ পার্টনার্সের সিনিয়র কাউন্সেলর এবং নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড ইউনিভার্সিটি স্কলার। এর আগে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পলিসি প্ল্যানিংয়ের পরিচালক (২০০১–০৩)। তিনি প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের বিশেষ দূত হিসেবে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে কাজ করেছেন










