বেশ কয়েক মাস ধরে চালের বাজার অস্থির। বোরো ধান কাটার সময় দাম কিছুটা কমেছিল। মৌসুম পার না হতেই আবার বাড়ছে চালের দাম। অথচ এ সময় চালের দাম স্থিতিশীল থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। চালের বাজার চলছে উল্টো পথে। রাজধানীসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে মানভেদে চালের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ৪-৮ টাকা। বর্তমানে মোটা জাতের স্বর্ণা ও চায়না প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৫৮ টাকা। মাঝারি ব্রিধান ২৯ বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকা। মিনিকেট নামে পরিচিত সরু ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০-৮০ টাকা। সরু নাজিরশাইল বাজারভেদে বিক্রি হচ্ছে ৮০-৯০ টাকা। কাটারিভোগ ও অন্যান্য সুগন্ধি চালের দাম আরো বেশি। বোরো ধানের মৌসুম শেষে এ মূল্য অস্বাভাবিক। ব্যবসায়ীরা অন্যায্য মুনাফা অর্জন করছেন ভোক্তাদের কাছ থেকে। তাতে কষ্ট পাচ্ছে গরিব খেটে খাওয়া মানুষ। এবার চালের উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি ৪৯ টাকা। এর সঙ্গে ১০ শতাংশ বাজারজাত খরচ ও মুনাফা যোগ করা হলে ভোক্তা পর্যায়ে মোটা চালের দাম হয় প্রতি কেজি ৫০ টাকা। মানভেদে চালের মূল্য সর্বোচ্চ হতে পারে ৭০ টাকা। কিন্তু এ সময়ে বোরো ধানের মৌসুম শেষে বাজারে যে দামে চাল বেচাকেনা হচ্ছে তা অযৌক্তিক। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত এক মাসে সরু চালের দাম বেড়েছে ৫ শতাংশ। মাঝারি ও মোটা চালের দাম বেড়েছে ৯ শতাংশের বেশি। গত এক বছরের ব্যবধানে এসব চালের দাম বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। বোরো ধানের ভালো ফলন তুলে আনার পরও চালের মূল্যবৃদ্ধির জন্য ব্যবস্থাপনা সমস্যা অনেকটা দায়ী।

অনেকে মনে করেন, এটা অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি। খাদ্য উপদেষ্টা বলেছেন, শিগগিই চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে আসবে। তবে এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো আয়োজন ও অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। এরই মধ্যে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ দপ্তরসহ খাদ্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন এবং সরকারি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে চালের বাজারে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু তা মূলত খুচরা পর্যায়ে। মিল গেট ও গুদামে নজরদারি তেমন পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ধান কাটা শেষ না হতেই চালের বড় ব্যবসায়ীরা ধান কিনে গুদাম ভর্তি করে রেখেছেন। এতে করপোরেট হাউজগুলোর আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। এছাড়া বড় অটো রাইস মিলাররাও তাদের আধিপত্য ধরে রেখেছে। এদের সঙ্গে যুক্ত আছে মাঝারি ও ছোট মিল মালিকরা। এদের দৌরাত্ম্য ও কারসাজিতেই এভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে চালের দাম। সেক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব খুবই দুর্বল।

এবার দেশে চালের কোনো সংকট নেই। সরকারি পর্যায়ে চালের মজুদ আছে ১৩ লাখ ৮২ হাজার ৭৭৫ টন। গমসহ মোট খাদ্যশস্য আছে ১৭ লাখ ৬৮ হাজার ২৭৬ টন। এছাড়া ধানের মজুদ আছে ২ লাখ ২৪ হাজার ৭৪৫ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ১৩ লাখ ৫ হাজার টন চাল। গম আমদানি হয়েছে ৬২ লাখ ৩৫ হাজার টন। মোট খাদ্যশস্য আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৫ লাখ ৪০ হাজার টন। চালের মোট সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হচ্ছে প্রায় ৪ কোটি ১৯ লাখ টন। গত পাঁচ বছরের মধ্যে চালের উৎপাদন, আমদানি ও মজুদ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল সর্বোচ্চ। এরপর চালের মূল্যবৃদ্ধির কোনো হেতু নেই।

এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে চালের দামে নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। গত এক মাসে চালের দাম কমেছে ১০ দশমিক ১৮ শতাংশ। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে উৎপাদনকারী দেশগুলোয় চালের উৎপাদন বৃদ্ধি ও রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ায় চালের দর নিম্নমুখী হয়েছে। ২০২১ সালের জানুয়ারির পর বিশ্ববাজারে এখন চালের দাম সর্বনিম্ন। অথচ বাংলাদেশের বাজার চলছে অনবরত চালবাজি। বাড়ছে চালের দাম।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা এখন বেশি দামে ধান কিনেছেন, তাই চালের দাম পড়ছে বেশি। প্রকৃত প্রস্তাবে, বড় মিলাররা ধান কিনে নিয়েছেন উৎপাদনের পর পরই। তখন ভেজা ধান প্রতি মণ বিক্রি হয়েছে ৯০০- ১১০০ টাকায়। সরকার নির্ধারিত ১৪৪০ টাকা দর কখনই কৃষকদের দেননি ব্যবসায়ীরা। পরে যখন ময়ালে ধানের দাম বেড়েছে তখন কৃষকের হাতে বিক্রির মতো তেমন উদ্বৃত্ত নেই। ধান জমা আছে ব্যবসায়ীদের গুদামে। ফলে ধানের বেশি দামের ভাগিদার কৃষক হচ্ছেন না। এর ফায়দা লুটে নিচ্ছে মজুদকারী অসাধু ব্যবসায়ীরা। অর্থাৎ গুড়ের লাভ সবই পিঁপড়ে খাচ্ছে। এবার দেশে বোরোর উৎপাদন বেশ ভালো হয়েছে। দেশের মোট চাল উৎপাদনে বোরোর হিস্যা প্রায় ৫৪ শতাংশ। অতএব এ মৌসুমের গুরুত্ব বেশি। চলতি মৌসুমে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ কোটি ২৬ লাখ টন অর্জন করা সম্ভব না হলেও গত বছরের ২ কোটি সাড়ে ১০ লাখ টনের তুলনায় অনেক বেশি হবে। কমপক্ষে ২ কোটি ১৪ লাখ টন হবেই। এটা আমাদের বার্ষিক খোরাকির অর্ধেকের চেয়েও বেশি। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ আমন ধানের মৌসুম পর্যন্ত তাতে অনায়াসেই চলবে। অতএব অদূর ভবিষ্যতে দেশে চালের কোনো সরবরাহ সংকট হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সামনের আউশ মৌসুমের উৎপাদনের আভাস ভালো মনে হলে এবার চাল আমদানির প্রয়োজন হবে না। বর্তমানে চালের দাম বাড়ছে অজুহাতে অনেকে চাল আমদানির পরামর্শ দিচ্ছেন। তাতে লাভবান হবেন চাল আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা এবং বিদেশের চাল উৎপাদনকারী কৃষকরা। বাংলাদেশের কৃষকরা তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ভোক্তারাও লাভবান হবেন না। অতএব, আগামী আউশ ও আমন ধানের নিরাপদ উৎপাদনের জন্য সার্বিক প্রচেষ্টা নেয়া উচিত। বাজারে সরকারের হস্তক্ষেপ বৃদ্ধির মাধ্যমে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।

ওদিকে চালের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে আলুর দামও বেড়েছে। প্রকারভেদে কেজিতে বেড়েছে ৫-১০ টাকা। সবজিতেও স্বস্তি নেই। বিভিন্ন সবজির দাম কেজিতে ১০-২০ টাকা বেড়েছে। তাতে বেশ অস্বস্তিতে আছেন ভোক্তারা। ঢাকা শহরে এখন পটোল বিক্রি হচেছ ৬০-৭০ টাকা কেজি। করলা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৮০ টাকা। বরবটির কেজি ১০০-১২০ টাকা। বেগুন বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ৭০-৮০ টাকা কেজি। কাঁচামরিচ ১৬০ টাকা কেজি। টমেটোর কেজি ১২০-১৫০ টাকা। ঢেঁরশ ৬০-৭০ টাকা। শসা মানভেদে ৬০-৮০ টাকা কেজি। ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে প্রতি কেজিতে ২০ টাকা। ডিমের দাম বেড়েছে ডজনে ১০-২০ টাকা। মাছের দামও বেড়েছে। এভাবে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। এদের লাগাম টেনে ধরা উচিত। নিয়মিত বাজার মনিটরিং এক্ষেত্রে ইতবাচক প্রভাব রাখতে পারে। বাজার পরিদর্শনকালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পণ্যের যৌক্তিক মূল্য সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকা উচিত। তাতে বুঝতে সুবিধা হবে ভোক্তারা কত বেশি দামে দোকানদার থেকে পণ্য ক্রয় করছেন। তবে অনেকে মনে করেন, মুক্ত বাজার ব্যবস্থায় চালসহ নিত্য ব্যবহৃত পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ার তেমন সুযোগ নেই। এটা ভ্রান্ত ধারণা। বাজার কারসাজির ক্ষেত্রে পণ্যমূল্য নির্ধারণ করে দেয়াই উত্তম পদক্ষেপ। অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি হওয়া উচিত উৎপাদন খরচ। তার সঙ্গে বিপণন খরচ ও মুনাফা যোগ করে নির্ধারিত হবে ভোক্তা মূল্য। আমদানীকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে বিবেচনার বিষয় হবে আমদানি মূল্য। অভ্যন্তরীণ খরচ ও ব্যবসায়ীর লাভ যোগ করে হবে ভোক্তার মূল্য। বিপণন শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে তার ঘোষণা থাকা উচিত। যাতে কেউ চড়া দাম হাঁকিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত না করতে পারে গরিব ভোক্তাদের।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি। গত জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ শতাংশ। নভেম্বরে ছিল ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশ। গত মার্চে তা কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশে। গত জুনে তা আরো কমে ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশে এসে দাঁড়ায়। তবে চাল, আলু ও সবজির সাম্প্রতিক উচ্চ মূল্যের কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরো শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা কমে গেছে। এক্ষেত্রে বাজার ব্যবস্থাপনায় আরো দক্ষতা অর্জন করতে হবে। মনিটরিং জোরদার করতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও সিন্ডিকেটের কারসাজি থামাতে হবে। বাজারে সরকারের হস্তক্ষেপ আরো দৃশ্যমান ও কার্যকর করতে হবে।

ড. জাহাঙ্গীর আলম: একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ; সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ