আয়কর আইনের ১৫৫ ধারায় বলা হয়েছে, অগ্রিম কর হিসেবে পরিশোধযোগ্য ন্যূনতম কর চারটি সমান কিস্তিতে পরিশোধ করা যায়। এর মধ্যে অর্থবছরের ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৫ ডিসেম্বর, ১৫ মার্চ ও ১৫ জুন প্রতি কিস্তিতে অগ্রিম করের ২৫ শতাংশ করে পরিশোধ করা যায়। এছাড়া আইনে ৫৩ ধরনের উৎসে কর কর্তনের কথা বলা হয়েছে। এগুলো অগ্রিম কর হিসেবেই কাটা হয়। আমদানি ও সরবরাহ পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বর্তমানে যে বাড়তি অগ্রিম আয়কর আদায় করা হয়, তাতে ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। এ অগ্রিম কর ব্যবস্থা ব্যবসা করার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিকূল অবস্থানে ফেলেছে। অগ্রিম আয়কর এখন পরোক্ষ করে রূপান্তরিত হয়ে উদ্যোক্তাদের চলতি মূলধনে সংকট সৃষ্টি করছে। এতে ব্যবসা সচল রাখার জন্য বিকল্প উৎস থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ফলে কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস বেড়ে যাচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। এ কারণে স্থানীয় শিল্প প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছে। কোনো কোনো কোম্পানিকে মুনাফার চেয়ে বেশি অগ্রিম আয়কর পরিশোধ করে লোকসান গুনতে হচ্ছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিসহ দেশের অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকেই এখন এমন বিড়ম্বনার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এ বিড়ম্বনার পেছনে অগ্রিম আয়কর বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। ফলে এ কর নিয়ে এখন নানা ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। তারা বলছেন, ব্যবসায় মুনাফা হওয়ার আগেই অগ্রিম আয়কর কেটে নেয় রাজস্ব কর্তৃপক্ষ। বছর শেষে মুনাফা কম হলে অগ্রিম কেটে নেয়া আয়কর সমন্বয় হওয়ার কথা। কিন্তু সে সমন্বয় প্রক্রিয়ায় নানা দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা রয়েছে। সমন্বয় প্রক্রিয়ায় যেসব জটিলতা রয়েছে সেগুলো দূর করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। বিরাজমান সংস্কারের ধারাবাহিকতায় রাজস্ব আহরণের এ পদ্ধতিরও সংস্কার করা যেতে পারে।

উৎসে কর দুই ধরনের। একটা চূড়ান্ত, আরেকটি সমন্বয়যোগ্য। যেটা চূড়ান্ত কর সেটি আর ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই। আর সমন্বয়যোগ্য করের ক্ষেত্রে পাওনা হলে ফেরত দেয়ার কথা। কিন্তু সমন্বয় প্রক্রিয়া বেশ জটিল। দেশে অগ্রিম কর আদায়ের সংস্কৃতি বেশ পুরনো। ব্রিটিশ আমল থেকেই রাজস্ব আহরণে এর চর্চা হয়ে আসছে। সহজে রাজস্ব আহরণের জন্য এটি বেশ কার্যকর পদ্ধতি। অগ্রিম কর পরিশোধের উদ্যোগ রাজস্ব ফাঁকি রোধ করতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা ব্যবসার জন্য বিপত্তির কারণ হয়ে দেখা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই বছর শেষে দেখা যায়, ব্যবসার মুনাফার চেয়ে পরিশোধিত করের পরিমাণ বেশি, যা বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর ফাঁকির প্রবণতাকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয়ও এত বেশি অগ্রিম কর দিতে হয় না। আবার দেশে সমন্বয়যোগ্য অগ্রিম কর নিয়েও বিড়ম্বনার শেষ নেই। সমন্বয়যোগ্য অগ্রিম কর নিয়ে যেসব জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে তা কমিয়ে আনতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। মূলত রাজস্ব আহরণের সহজ পদ্ধতি হিসেবে দেশে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অগ্রিম কর বা আয়কর আরোপ করা হয়। এছাড়া এটি কর ফাঁকি প্রতিরোধের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবেও বিবেচিত। শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে উৎসে কর হিসেবে বা ব্যবসার টার্নওভারের ওপর এ ধরনের কর ধার্য করা হয়। অগ্রিম কেটে নেয়া আয়কর সমন্বয়ের বিষয়টি খুব জটিল। এর ব্যয় অনেক বেশি। সরকারের কোষাগারে একবার টাকা গেলে সেটা বের করা অনেক সময়সাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। বড় কোম্পানির চাপ সামলানোর সক্ষমতা কমবেশি থাকলেও যারা তুলনামূলক ছোট ব্যবসায়ী তাদের জন্য অনেক সমস্যা হয়। সম্ভাব্য মুনাফার ওপর যে অগ্রিম আয়কর কেটে রাখা হচ্ছে সেটা সমন্বয়ে দীর্ঘসূত্রতা হচ্ছে। অনেক ধরনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি সৃষ্টির প্রচেষ্টা রয়েছে বর্তমানে, সেই ধারাবাহিকতায় এ ধরনের বিষয়গুলো এখন দেখার সময় এসেছে। উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের অগ্রিম আয়করের সমন্বয়ে যে হয়রানি ও ভোগান্তি হয় সেগুলো দ্রুত নিরসন জরুরি।

প্রতি বছরেই সরকারের বাজেটের আকার বাড়ছে। সে তুলনায় বাড়ছে না রাজস্ব আহরণ। ঘাটতি পূরণে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। এ ঋণের কিস্তি ও সুদ টানতে গিয়ে ব্যয় চাপ আরো বেড়ে যাচ্ছে সরকারের। এ চক্র থেকে বেরোতে রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি উঠেছে। বলা হচ্ছে, দেশের রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাকে ব্যবসাবান্ধব করার মাধ্যমে বেসরকারি খাতের বিকাশ ঘটাতে হবে। করজালের বিস্তৃতি না বাড়ালে এটিকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া বেসরকারি খাত যত বিকশিত হবে রাজস্ব আহরণ তত বাড়বে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ১৪ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে আহরণ হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে ঘাটতি হয়েছে ২৭ শতাংশের বেশি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদনের সময় যেসব শর্ত বেঁধে দিয়েছিল, এর মধ্যে অন্যতম ছিল রাজস্ব আয় বাড়ানো। অর্থাৎ কর-জিডিপির অনুপাত বাড়ানো। সংস্থাটি একটি লক্ষ্যমাত্রাও দিয়েছিল। তবে গত বছরের জুন শেষে সংস্থাটির লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে রাজস্ব আহরণ করতে পারেনি সরকার। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত না করা, করজাল সম্প্রসারণে জরিপ কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা ও পদ্ধতিগত সমন্বয়হীনতা; কর ব্যবস্থাপনার তথ্য বিনিময়ের অপ্রতুলতা এবং দক্ষ জনবলের স্বল্পতা ও ভৌত অবকাঠামোসহ প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাব। আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা না থাকায় অর্থপাচারও ঠেকানো যাচ্ছে না। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এসব প্রতিবন্ধতা নিরসনসহ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতে সরকারকে এখনই উদ্যোগী হতে হবে। এর মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়িয়ে দায় পরিশোধের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশে বর্তমানে জিডিপি অনুপাতে রাজস্ব আহরণ হতাশাজনক। কর-জিডিপি অনুপাতের ক্ষেত্রে একেবারে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। কর-জিডিপির অনুপাত বাড়ানোর বিষয়ে পরামর্শ রয়েছে দেশের অর্থনীতিবিদ-বিশেষজ্ঞসহ আইএমএফের। নিজস্ব আয় থেকে ঋণ, সুদ ও ভর্তুকির দায় পরিশোধে তারা গুরুত্ব দিয়েছেন। অথচ বাস্তবতা তার বিপরীত। গত এক দশকে কর-জিডিপি অনুপাত না বেড়ে বরং কমে এসেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর-জিডিপির অনুপাত ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সত্ত্বেও রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা ঘোচেনি। বরং রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরো ঝুঁকিতে রয়েছে।

কর-জিডিপির অনুপাত বাড়াতে হলে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়ানো জরুরি। গত অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ কোটি ৪ লাখ করদাতা শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) ছিলেন। কিন্তু আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন মাত্র ৪৩ লাখ। টিআইএনধারীর সংখ্যা বাড়লেও সেভাবে প্রত্যক্ষ কর আদায় বাড়েনি। অর্থাৎ নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা বাড়লেও রিটার্ন জমা দেয়া ব্যক্তির সংখ্যা সেই তুলনায় কম। কম সংখ্যক রিটার্ন জমা দেয়ার জন্য অপর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত করদাতা জরিপের অনুপস্থিতি এবং কর প্রশাসনের অটোমেশনের ধীরগতিই দায়ী। এছাড়া রিটার্ন দাখিলের প্রমাণও (পিএসআর) যথাযথভাবে তদারকি হচ্ছে না। সামগ্রিকভাবে দেশে কর আদায় ব্যবস্থা যথাযথভাবে সম্প্রসারিত হয়নি। ফলে কর প্রদানে মানুষের আগ্রহ কম। প্রত্যক্ষ কর উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি না পাওয়া কর ব্যবস্থাপনায় এনবিআরের দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। এনবিআরের দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করে কর কাঠামোর সংস্কার আবশ্যক। এছাড়া প্রত্যক্ষ কর আহরণের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হলো কর জমাদানের প্রক্রিয়াটি এখনো জটিল। করদাতাদের স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উদ্বুদ্ধকরণের পাশাপাশি জটিলতা কমিয়ে আনতে হবে। করারোপ, হিসাবায়ন ও জমাদান পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া করদাতাবান্ধব হতে হবে। এছাড়া করদাতা ও আহরণকারীর মধ্যে সম্পর্কের মিথস্ক্রিয়া বাড়াতে হবে। আয়করযোগ্য ব্যক্তিদের করের আওতায় আনা গেলে রাজস্ব আহরণ বহুগুণে বেড়ে যাবে।

কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে রাজস্ব আহরণে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতের ভার যাদের ওপর তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই রয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ। করদাতাকে হয়রানি এবং অর্থের বিনিময়ে বড় বড় কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ করে দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কর ফাঁকি দেয়ার বন্দোবস্ত করে দেন তারা। ফলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত হয়নি এবং বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আহরণ থেকে বঞ্চিত হয় দেশ। কর ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন ও সংস্কারের পাশাপাশি কর প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে হবে। এছাড়া অগ্রিম আয়কর সমন্বয়ে যেসব জটিলতা রয়েছে সেগুলো নিরসন করা উচিত। সমন্বয়ের প্রক্রিয়া সহজ না হলে ব্যবসায়ীরা ব্যবসায় নিরুৎসাহিত হবেন। অগ্রিম আয়কর সহজে কেটে নেয়া হয় ঠিকই কিন্তু সমন্বয়ের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়। এ ধরনের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। সর্বোপরি রাজস্ব ব্যবস্থাকে বাবসাবান্ধব করতে হবে।