স্থাবর সম্পত্তি বন্ধকের বিপরীতে ব্যাংক ঋণ বিতরণের প্রচলন বহু পুরনো। বিশেষত উনিশ শতকে ইউরোপে শিল্পায়নের সময় এ নিয়মে ব্যাংক ঋণ দেয়া হতো। কিন্তু এ থেকে বেশকিছু জটিলতার উদ্ভব হয়েছিল, যার মধ্যে অন্যতম ছিল জমির ক্রমে মূল্যবৃদ্ধি। আবার ব্যাংকের কাছে জামানত হিসেবে যেসব জমির দলিল জমা পড়ত, সেগুলো অতিমূল্যায়িত করে দেখানো হতো। যে কারণে জামানতের সম্পত্তি বিক্রি করে ঋণ আদায় করা ব্যাংকগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। বিংশ শতাব্দীতে মহামন্দার সময় ইউরোপ এ কারণে আরো বেশি সংকটের মুখে পড়েছিল। এতে ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতির অবনমন ঘটতে থাকে। ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে যায়। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে পরবর্তী সময়ে ইউরোপসহ অনেক দেশ ব্যাংক ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে স্থাবর সম্পত্তিকে জামানত হিসেবে গুরুত্ব দেয়া বন্ধ করে দেয়। তারা প্রাধান্য দেয়া শুরু করে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের প্রকৃত সক্ষমতা ও আধুনিক অর্থনীতির বিভিন্ন মাধ্যমকে, যেমন ক্যাশ ফ্লো। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো ব্যাংক ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে সেই পুরনো নিয়মের প্রচলনই রয়ে গেছে। যে কারণে বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি তৎকালীন ইউরোপের ব্যাংক খাতের মতোই দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক।

এ দেশের মানুষের স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ নেয়ার প্রবণতা বেশি। ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বিশেষত দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশের ব্যাংক খাতে এ ধরনের ঋণ বিতরণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতের বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ১২ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০ লাখ ৮৪ হাজার ২০২ কোটি টাকা বা ৬৩ দশমিক ৩১ শতাংশ ঋণই বিতরণ করা হয়েছে স্থাবর সম্পত্তি জামানত রেখে। অথচ ২০১০ সালে জমি বন্ধকের বিপরীতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা, যা ছিল ওই সময় বিতরণকৃত মোট ঋণের ৪৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ। আবার ঋণগ্রহীতাদের অনেকেই ব্যাংক ঋণ নিয়ে জমি কিনেছেন। সেই জমি কোনো ব্যাংকে জামানত হিসেবে রেখে ঋণ নিয়েছেন। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা অনেক সময় স্থাবর সম্পত্তি জামানত হিসেবে রাখতে না পারার কারণে ঋণ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। এর প্রভাবেও অনেকে ঋণ নিয়ে আবার জমি কিনেছেন। বন্ধক হিসেবে জমি বা রিয়েল এস্টেটকে প্রাধান্য দেয়ার কারণে দেশেও জমির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পত্তির দর বেড়েছে ১০-২০ গুণ। এসব বাড়তি দামের জমি বিক্রি করে যখন ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ের চেষ্টা করেছে তখন মুখ থুবড়ে পড়তে হয়েছে তাদের। বলা বাহুল্য, জমি বন্ধক রেখে ঋণ নেয়া দেশের ব্যাংক খাত থেকে অর্থ লোপাটের বড় কারণ হয়ে উঠেছে। যে কারণে বেড়েছে খেলাপি ঋণের হারও। একদিকে জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া অপেক্ষাকৃত সহজ। অন্যদিকে সরকারি খাসজমি, বিতর্কিত মালিকানার জমি বন্ধক রেখেও ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংক কর্মকর্তারা সহযোগীর ভূমিকা পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রভাবশালীদের বন্ধকি জমির মূল্য কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। ফলে জামানতের সম্পদ বিক্রি করে খেলাপি ঋণ আদায় সম্ভব হচ্ছে না।

বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, বিভিন্ন স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রেখে প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে দেশের ব্যাংকগুলো। গ্রাহক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বন্ধকি সম্পদ বিক্রি করে সেটি আদায়ের কথা থাকলেও এসব সম্পদের বেশির ভাগই বর্তমানে বিক্রি করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে প্রভাবশালী ও বড় ঋণখেলাপিদের সম্পদ কেনায় কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আবার কিছু ক্ষেত্রে ক্রেতা খুঁজে পেলেও নিবন্ধন করতে চাচ্ছেন মৌজা দরে। এতে সম্পত্তির বাজারমূল্যের সঙ্গে মৌজা দরের বিস্তর ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রদর্শিত বা সাদা টাকা না হওয়ায় সম্পত্তি বিক্রির অর্থে ব্যাংক ঋণও পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে ব্যাংকগুলো আরো বিপাকে পড়েছে। বিশেষত গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে জমি কেনা থেকে বিরত থাকছেন সামর্থ্যবানরা। অর্থাৎ বর্তমানে আইনি ও নীতিগত জটিলতা তৈরি হয়েছে ব্যাংক খাতের ঋণ আদায়ে। তাছাড়া জামানতের সম্পত্তি বিক্রি করে খেলাপি ঋণ আদায়ের পন্থা সেভাবে কাজে লাগেনি কখনই। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণার তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছিল, জামানতের সম্পদ বিক্রি করে দেশের ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের মাত্র ১২ দশমিক ৭৭ শতাংশ আদায় করতে পারছে। সে হিসাবে জামানত থাকার পরও অনাদায়ী থেকে যাচ্ছে ৮৭ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ।

এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের উদ্যোগী হওয়া ছাড়া উপায় নেই। এমনিতেও দেশের ব্যাংক খাতের বড় ক্ষত খেলাপি ঋণ। ঋণ আদায় না হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো বাড়বে। ব্যাংকগুলো আরো বেহাল দশার মধ্যে পতিত হবে। তাই ব্যাংকের ঋণ আদায়ের স্বার্থে সরকারকে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার বন্ধক রাখা জমিগুলো অধিগ্রহণ করতে পারে। পরবর্তী সময়ে সেগুলো বিক্রি করে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করবে। এছাড়া সরকারি কাজের জন্য কিছু জমি সরকার নিজে ক্রয় করতে পারে। এর বাইরে জমির মৌজা দর ও বাজারদরের মধ্যে সামঞ্জস্য আনা জরুরি। সরকার নির্ধারিত মৌজা দরে রাজধানী ঢাকার যে জমি ৫০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, ক্ষেত্রবিশেষে দেখা গেছে সে জমির বাজার মূল্য দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি টাকারও বেশি। যখন বাজারদরের চেয়ে জমির মৌজা দর কম হয়, স্বাভাবিকভাবে ক্রেতারা চায় মৌজা দরে জমি নিবন্ধন করতে। কেননা এতে নিবন্ধন ফি কম লাগবে। সেই সঙ্গে তারা অবৈধ ও কালো টাকা (অপ্রদর্শিত) বৈধ করার সুযোগ পান। ব্যাংক ঋণ আদায় না হওয়ার পেছনে এটিও তাই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে তাই মৌজা দর সমন্বয় করা ‍উচিত। এতে জমি ক্রয় ও নিবন্ধন-সংক্রান্ত জটিলতা কিছুটা হলেও কমে আসতে পারে। বিশেষত এর মাধ্যমে বৈধ চ্যানেলে আর্থিক লেনদেনের হার বাড়বে। পাশাপাশি যারা মৌজা দরে নিবন্ধন করে বাজারদর নগদ অর্থে দিতে আগ্রহী, সেটার সমাধান কী হতে পারে তা নিয়েও সরকারের ভাবনা প্রয়োজন।

তবে সর্বাগ্রে কিছু দীর্ঘমেয়াদি নীতির পথে হাঁটতে হবে। ব্যাংক ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির লাগাম টানতে হবে। জমি বন্ধক নেয়ার বিপরীতে ঋণ বিতরণের আগে জমির যথাযথ মূল্যায়ন ও যাচাই নিশ্চিত করা জরুরি। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো ব্যাংক খাতের সুরক্ষায় ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে জামানত হিসেবে জমির প্রাধান্য কমিয়ে আনা এবং এ নিয়ম পুরোপুরি বন্ধ করা। অস্থাবর সম্পত্তি যেমন ব্যবসায়িক সুনাম, ক্যাশ ফ্লো, শিল্প যন্ত্রপাতি ইত্যাদিকে প্রাধান্য দিতে হবে। নয়তো ব্যাংক খাতের এ সংকট অচিরেই দূর হবে না।