মহান ভাষা আন্দোলন তথা একুশে ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য নিয়ে সাহিত্য রচনার জন্য তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের গণসংযোগ বিভাগাধীন অধুনালুপ্ত বাংলাদেশ পরিষদ ১৯৭৬ সালে দেশব্যাপী উদীয়মান সাহিত্যিকদের মধ্যে প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা ও নাটক রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন শুরু করে। বার্ষিক সাহিত্য প্রতিযোগিতা আশির দশকের মাঝামাঝি নাগাদ বলবৎ ছিল। জেলা পর্যায়ে শুরু হয়ে সেরা রচনাগুলো বিভাগ এবং বিভাগে সেরা বিবেচিত রচনাগুলো জাতীয় পর্যায়ে সেরা মূল্যায়নই ছিল এ প্রতিযোগিতার কাঠামো। বিজয়ী সেরা রচনাসহ বিচারকমণ্ডলীর সদস্যদের লেখা নিয়ে ‘অন্তরে অনির্বাণ’ শিরোনামীয় সরকারি সাহিত্য সংকলন প্রকাশ করা হতো। জাতীয় পর্যায়ে বিচারকমণ্ডলীতে থাকতেন দেশের সাহিত্যজগতের দিকপালরা। ১৯৭৭ সালে জাতীয় পর্যায়ে বিচারকমণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন ক্ষুরধার লেখনীর জন্য স্বনামধন্য সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮—১৯৭৯)। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত অন্তরে অনির্বাণে তার একটি নাতিদীর্ঘ লেখা ‘একুশের মর্মবাণী’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। তার মৃত্যুর দুই বছর আগে এবং আজ থেকে প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল আগে লেখা এ ‘বাণী’তে সমকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ প্রেক্ষপট সম্পর্কে সুতীক্ষ্ণ বক্তব্য উঠে এসেছে। লেখাটিতে বাংলাদেশ জাতি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভাব দর্শন এবং নতুন স্বাধীন দেশটির ন্যাশনাল আইডেনটিটি ও সভরেনটি সুদৃঢ়করণে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে তার দূরদৃষ্টিক্ষেপ ও সুচিন্তিত অভিমত প্রকাশ পেয়েছে। মূল লেখাটি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে হালনাগাদ মত ও মন্তব্যসহ উৎকলিত হলো—
‘একইশা (ময়মনসিংহ অঞ্চলের বাগবিধি ব্যবহারে আবুল মনসুর আহমদ বরাবরই আগ্রহী ছিলেন) ফেব্রুয়ারির আন্দোলনটা যে শুধু মুখের ভাষার দাবি ছিল না, সেটা যে ছিল স্বকীয়তার অন্তরের ফুকার, তা সকলে না বুঝিলেও পরিষদ (অধুনা বিলুপ্ত বাংলাদেশ পরিষদ) বুঝিয়াছেন বলিয়াই আমার বিশ্বাস। এই স্বকীয়তা সার্বিক হইলেও তা প্রথমত ও প্রধানত কৃষ্টিক স্বকীয়তা। তাই ভাষার সাথে কৃষ্টিক স্বকীয়তার এমন প্রত্যক্ষ যোগ। এই কৃষ্টিক স্বকীয়তা রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ছাড়া নিরাপদ নয়। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা আবার জাতীয় পরিচিতি, ন্যাশনাল আইডেন্টিটি ছাড়া নির্মল নয়। সাধারণত সব নেশন-স্টেটের বেলাতেই জাতির কালচারেল, ন্যাশনাল ও পলিটিক্যাল এই তিনটি রূপই সুস্পষ্ট। আমাদের বেলা তেমন স্পষ্ট নয়।’ এর মুখ্য কারণ, তার মতে ‘বাংলার অব্যবহিত গত ২০০ বছরের ইতিহাসই এই অস্পষ্টতার হেতু। এই দুইশ বছরের প্রত্যক্ষ ও বিপ্লবী প্রভাব আগের পাঁচশ বছরের ইতিহাসকে বেমালুম ভাসাইয়া দিয়াছে। এই দুইশ বছরের ইংরাজসৃষ্ট কলিকাতাকেন্দ্রিক বেঙ্গল ছিল আসলে দুটি বাংলা: পশ্চিমে টাওয়ার বাংলা, পূর্বে খামার বাংলা। এই মুদ্দতের বাঙালিরা ছিল দুটি কৃষ্টিক জাতিতে বিভক্ত’; কাব্যিক গদ্যে তিনি তুলে ধরেন—‘ভদ্রলোক ও মুসলমান। টাওয়ার বাংলা ভদ্রলোকপ্রধান; আর খামার বাংলা ছিল মুসলমানপ্রধান। টাওয়ার বাংলার ছিল কৃষ্টি ও আর্ট; খামার বাংলায় ছিল কৃষি ও পাট। খামার বাংলা টাওয়ার বাংলাকে দিত পাট ও ধান। টাওয়ার বাংলা খামার বাংলাকে দিত আর্ট ও গান।’
রাজনীতিবিদ সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ বিষয়টি আরো স্পষ্ট করতে দুই বাংলার স্বরূপ বিচার-বিশ্লেষণে ব্রতী হন, উল্লেখ করেন ‘রবীন্দ্রনাথ বেঙ্গলের স্বরূপ বর্ণনায় তাই লিখিয়াছিলেন: বাংলা শুধু দেহেই দুই নয়, অন্তরেও দুই। ইতিহাসের অমোঘ বান তুফানে সেই বেঙ্গল আজ দৈহিকভাবেও দ্বিধাবিভক্ত। টাওয়ার বাংলা বিশ্বকবির ইচ্ছামতো বিশ্বভারতীয় মহাভারতে লীন হইয়া আত্মিক নির্বাণ লাভ করিয়াছে। আর খামার বাংলা ভববন্ধন হইতে মোক্ষ লাভে অসমর্থ হইয়া কর্মফল ভুগিবার জন্য স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হইয়াছে।’ এ ধরনের পলিটিক্যাল স্যাটায়ার তার রচনারীতির বৈশিষ্ট্য। তিনি আরেকটু অগ্রসর হয়ে এ ব্যাপারে দ্বিমত ও সংশয় প্রকাশ করেন, ‘কিন্তু দৈহিক মুক্তি যত সহজ, আত্মিক মুক্তি তত সহজ নয়। একটা কায়িক বলিয়া দৃষ্টিগ্রাহ্য, অপরটা মানসিক বলিয়া দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। তাই রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার সঙ্গে কৃষ্টিক স্বকীয়তা অটমেটিক্যালি আসে না। বাংলাদেশের বেলায় এটাই ঘটিয়াছে। আমরা রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা লাভ করিয়াছি বটে, কিন্তু কৃষ্টিক স্বকীয়তা হাসিল করি নাই। খামার বাংলার মাটি লইয়া আমরা বাংলাদেশ নামে নেশন-স্টেট গড়িয়াছি। কায়িকরূপে রাষ্ট্র অর্গানিক। ওটা চিনা সহজ। আমাদের রাষ্ট্রনায়করা তাই বাংলাদেশের ন্যাশনাল সভারেন্টি ও টেরিটরিয়াল ইনটিগ্রেটি রক্ষার সাধ্যমতো চেষ্টা করিতে পারিতেছেন। পক্ষান্তরে আত্মিকরূপে জাতি ইন অর্গানিক। ওটা মানসিক ও স্পিরিচুয়াল বলিয়া দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। ন্যাশনাল আইডেন্টিটি ও কালচারাল অটনমির সীমারেখা তাই সহজে চিনা যায় না।’ তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘আমাদের চিন্তা নায়কদের কেউ কেউ বাংলাদেশের ভাষা সাহিত্যের স্বাতন্ত্র্য-স্বকীয়তায় বিশ্বাস করেন না। তাদের মতে, বাংলা বাটোয়ারায় মাটি ভাগ হইয়াছিল, কৃষ্টি-সাহিত্য ভাগ হয় নাই। টাওয়ারের কৃষ্টি সাহিত্যই আমাদের কৃষ্টি সাহিত্য। টাওয়ারি রূপও আংশিকেই তা আমাদের থাকিবে।’ তীব্র শ্লেষের সঙ্গে বলেন আবুল মনসুর আহমদ।
ভূরাজনৈতিক ভেদবুদ্ধি বিভাজিত উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে তিনি লক্ষ করেন, ‘টাওয়ারি কৃষ্টি-সাহিত্যের আগুনে বিদগ্ধ এই মনীষীদের ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে যাহা ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিম বঙ্গ ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ আজ সমমর্যাদার ‘এপার বাংলা ওপার বাংলা’ হইয়াছে। কৃষি-পাটের বেলা ‘দুই বাংলা’ যুধ্যমান প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু কৃষ্টি-আর্টের বেলা তারা যুগ্মমান সহধর্মী। ‘ওপার বাংলা’ গঙ্গার পানির ধারা ফারাক্কায় আটকাইয়া ‘এপার বাংলার’ কৃষি-পাটের মাঠ পয়মাল করিতেছে, কিন্তু ভাগীরথীর পানির ধারা মুক্ত রাখিয়া বরং আরও ফারাক করিয়া ‘এপার বাংলার’ কৃষ্টি-আর্টের ঘাট সয়লাব করিতেছে। ফলে আমাদের ‘শহীদ মিনার’ আজ অর্চনার বেদি হইয়াছে।’ তির্যক মন্তব্য আবুল মনসুর আহমদ।
সংস্কৃতি যদি হয় সমষ্টির আচার-আচরণ, বোধ-বিশ্বাস, চিন্তাচেতনার একটি পরিশীলিত সমন্বিত রূপ তাহলে বাংলাদেশের জনগণের সংস্কৃতির স্বরূপ নিয়ে বিভ্রান্তির অবকাশ আছে বলে মনে হয় না। অথচ এ ভূখণ্ডের সংস্কৃতিকে সীমাবদ্ধ দৃষ্টিকোণে এর স্বাতন্ত্র্য-স্বকীয়তাকে এর চেহারা ও চরিত্রকে ভিন্নতর চিত্রণে চাতুর্যের অপূর্ব আয়োজন লক্ষ করা যায়। বস্তুত বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মনে করা হয়ে থাকে সার্বভৌমত্ববিহীন এমন এক সত্তা, যাকে যেকোনো অবয়ব অভিধায় আখ্যায়িত ও বিকৃত করা চলে। গণসংস্কৃতি বলতে এমনই এক সংস্কৃতির ধারণা প্রচার পায় যা গণবিচ্ছিন্নতারই নামান্তর।
উপসংহারে ধ্বনিত হয়েছে তার ক্ষোভ ও বেদনার বাণী—‘মিনার যেখানে জাতীয় গৌরবে আমাদের উন্নত-শির আকাশমুখী করিতে পারিত, বেদি সেখানে ভক্তিনত শোকাহত আমাদের নত-মস্তক পাতালমুখী করিতেছে। এটা একাধারে টিপিক্যাল ও সিম্বলিক্যাল। কাজেই এটা সার্বিক ও সার্বত্রিক।’ এই টিপিক্যাল ও সিম্বলিক্যাল বিষয় শনাক্তকরণ এবং এর কার্যকর অনুসরণের মূল্যবোধ হিসেবে উপসংহার টানেন তিনি— ‘একইশা ফেব্রুয়ারীর তাৎপর্য ও মর্মবাণী এখানেই।’
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সাবেক সচিব
[রচনাকাল ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭ এবং অন্তরে অনির্বাণ ১৯৭৭-এ প্রকাশিত]










