এদিকে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে শিশু ও মাতৃমৃত্যুহার কমানো, মাতৃস্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, পরিবার-পরিকল্পনা কার্যক্রমের প্রসার এবং মানুষের গড় আয়ুবৃদ্ধিও স্বাস্থ্য খাতের বড় সাফল্য। এসব সাফল্যের মাঝেই দেশে হামের প্রাদুর্ভাব নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে।
হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল। এজন্য নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আয়োজন ছিল। তবে করোনা মহামারীর সময় থেকেই টিকাদান কর্মসূচিতে স্থবিরতা দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সংকট এবং অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর নতুন করে আর টিকা কেনা হয়নি। এ সময় টিকাদান কর্মসূচিও বন্ধ হয়ে যায়। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এমন গাফিলতির কারণে দীর্ঘদিনের সফল টিকাদান কর্মসূচিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকে। হামের কারণে শারীরিক জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়তে শুরু করে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বিশেষত শিশুদের আইসিইউ সাপোর্ট, আইসোলেশন ব্যবস্থাপনা, ভেন্টিলেশন সাপোর্ট এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এখন পর্যন্ত হাম ও হামজনিত কারণে মৃত্যুর সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে। যদিও সরকার জানাচ্ছে, বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং ভ্যাকসিনের মাধ্যমে শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে আরো সময় লাগবে। জুলাই নাগাদ টিকাদানের ইতিবাচক দিক আমরা দেখতে পাব।
তবে হামের প্রাদুর্ভাব আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও হাজির করেছে। বড় পরিসরের সংক্রামক রোগ মোকাবেলায় শুধু সরকারি হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করলে চলবে না, বরং বেসরকারি হাসপাতালকেও জাতীয় স্বাস্থ্য সংকটের সময় দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অংশীদার হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। এ দায়িত্ববোধ ও স্বাস্থ্যসেবাকে আরো সহজলভ্য করার অঙ্গীকার থেকেই মাদানী এভিনিউর সাঁতারকূলের ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটাল খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিজেদের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস করেছে। হাসপাতালটি হাম রোগীদের জন্য একটি বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু করেছে। একই সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করে নিশ্চিত করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ প্রটোকল। হাসপাতালে জরুরি ট্রায়াজ ব্যবস্থার মাধ্যমে হাম রোগীদের শনাক্ত করে তাদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ইউনিট নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে অন্যান্য রোগীর মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো যায়। রোগীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) ব্যবহার, পৃথক এনআইসিইউ ও পিআইসিইউ জোন এবং নিয়মিত জীবাণুনাশক কার্যক্রমের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হচ্ছে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ। দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হাসপাতালে আসা আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা সহজলভ্য করতে অনেক রোগীকেই ওয়ার্ডের খরচে কেবিনের সব সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জরুরি সেবা, ভেন্টিলেশন সাপোর্ট এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রেও বিশেষ ছাড় দেয়া হচ্ছে। গুরুতর রোগীদের জন্য নিশ্চিত করা হচ্ছে ওয়ান-টু-ওয়ান নার্সিং সাপোর্ট ও সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ। এ পর্যন্ত এই ৃরোগীর চিকিৎসা সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ জনই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে।
এ সংকটকালীন ব্যবস্থাপনার মাঝেও হাসপাতালটির জরুরি ও ক্রিটিক্যাল চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। সম্প্রতি প্লাস্টিক ও রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জন এবং ভাসকুলার সার্জনদের সমন্বয়ে জটিল সার্জারির মাধ্যমে একজন রোগীর গুরুতর দুর্ঘটনায় প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া একটি আঙুল সফলভাবে পুনঃসংযোজন করা হয়। দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সার্জারিটি সম্পন্ন হয়, যা একই সঙ্গে সংকটকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলা ও উন্নত জরুরি চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখার সক্ষমতার উদাহরণ। বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। কার্যকর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, সাশ্রয়ী চিকিৎসা, দ্রুত সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এ সংকটকে আরো কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে। কারণ প্রতিটি শিশুরই সময়মতো চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আছে এবং এমন জাতীয় সংকটের সময়ে স্বাস্থ্যসেবা হয়ে ওঠে সবার যৌথ দায়িত্ব।
ডা. আজহারুল ইসলাম খান: ডিরেক্টর, ইউনাইটেড হেলথকেয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড










