দেশে স্বাস্থ্যসেবাদাতার অভাবে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। যদিও খাতটির প্রশাসনিক কার্যক্রমে জনবল পদায়ন করা হয়েছে অনুমোদিত পদের চেয়ে বেশি। এতে স্বাস্থ্য বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে প্রশাসনিক জনবলের পেছনে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে উপপরিচালক ও সমপর্যায়ে ১৫৬ পদ রয়েছে। কিন্তু এ পদে জনবল আছে ৩১৪ জন। অর্থাৎ অতিরিক্ত ১৫৮ জনকে পদায়ন করা হয়েছে। একইভাবে অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক, সিভিল সার্জন ও সমপর্যায়ের অনুমোদিত পদে অতিরিক্ত কর্মরত রয়েছেন ২০৭ জন। ডেপুটি সিভিল সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার জন্য অনুমোদিত পদের চেয়ে অতিরিক্ত ২ হাজার ২৯ জন জনবল রয়েছে। যদিও চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্য সহকারী, মেডিকেল কর্মী ও ল্যাবকর্মীর পদে জনবল ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার। স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়নে এ ঘাটতি পূরণের বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে প্রশাসনের অতিরিক্ত জনবলের বিষয়েও যৌক্তিক সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন।

অপর্যাপ্ত সেবাদাতার অভাবের বাইরেও আরেকটি গুরুতর সংকট রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা খাতে। সেটি হলো, সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেকেই তাদের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য থেকে জানা যায়, উপস্থিত না থাকার সংখ্যা প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ। আবার দেশের উপজেলাভিত্তিক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর প্রায় ৫৯ শতাংশ চিকিৎসক পদই ফাঁকা। পদায়ন করা হলেও এসব অঞ্চলের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোয় চিকিৎসকরা বেশি দিন থাকতে চান না বলে অভিযোগ রয়েছে। কেননা এসব কেন্দ্রে নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশই ঢাকায় থাকতে চান। কারণ ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোর স্বাস্থ্য কেন্দ্রে তুলনামূলক বেশি সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। ফলে ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোর অনেক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পদের তুলনায় বেশি সেবাদাতা কর্মরত রয়েছেন। এর পরও ঢাকা বিভাগের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ পদ শূন্য পড়ে আছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে উঠে এসেছে। সুতরাং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী ঘাটতির পাশাপাশি কেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়নে এসব সংকট সমাধান করা জরুরি। দ্রুত নিয়োগ থেকে শুরু করে চিকিৎসাদাতাদের সুষমবণ্টনও নিশ্চিত করতে হবে। নয়তো দেশের অগ্রগতিতে জনস্বাস্থ্য সংকট বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা খাতের প্রশাসনে বিপুল পরিমাণ জনবল থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের বিশৃঙ্খলা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যাবে না।

একটি দেশের অগ্রগতির ক্ষেত্রে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সেজন্য কর্মক্ষমদের সুস্থ থাকা আবশ্যক। সুস্বাস্থ্য ছাড়া উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব নয়। যে কারণে উন্নত দেশগুলো স্বাস্থ্য খাতের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়। জিডিপিতে স্বাস্থ্য খাতের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু দেশে এ হার ১ শতাংশেরও কম। উপরন্তু স্বাস্থ্যসেবাদাতার সংকটও প্রকট। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় একজন চিকিৎসকের সঙ্গে তিনজন নার্স ও পাঁচজন টেকনিশিয়ান থাকা উচিত। প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য ২৩ জন চিকিৎসক প্রয়োজন। সেই হিসাবে প্রতি হাজারে অন্তত দুজন চিকিৎসক প্রয়োজন। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা গেছে, দেশের জনসংখ্যা হিসেবে (১৭ কোটি ১০ লাখ) প্রতি হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক রয়েছেন শূন্য দশমিক ৮৩ জন।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, চিকিৎসাদাতার সংকট ও কেন্দ্রীভূত চিকিৎসা কাঠামো নিয়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা কীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব! এ সংকটের কারণে প্রান্তিকসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষের সুচিকিৎসা পাওয়া দুর্লভ হয়ে উঠেছে। দেখা গেছে সেবাদানকারীদের আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় অতিরিক্ত রোগীর চাপে যথাযথ সেবা দিতে পারছেন না। ফলে বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের প্রবণতাও দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে যাদের সে সামর্থ্য নেই তারা নিত্যদিন ভুক্তভোগী হচ্ছেন। এসব সংকট মোকাবেলায় সরকারের দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। সেই সঙ্গে সংস্কার কার্যক্রম আরো গতিশীল করা আবশ্যক।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্প্রতি একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়। স্বাস্থ্য খাতে গত এক বছরে ১০টি বড় সংকট চিহ্নিত করা হয়েছে বলে এ সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। সেখানে স্বাস্থ্য খাতে জনবল সংকটের বিষয়েও আলোকপাত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের নিয়োগ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে আলাদা একটি পিএসসি গঠনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এছাড়া সেপ্টেম্বরে ৩ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের পরিকল্পনা নেয়ার কথা জানানো হয়। এসব উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য।

স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দাতার নিয়োগ ও এর সুষমবণ্টন ছাড়া অন্যান্য সমস্যা সমাধান করে খুব বেশি সুফল মিলবে বলে প্রতীয়মান হয় না। কারণ এটি ছাড়া চিকিৎসাসেবার মান নিশ্চিত ও স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণ করা সম্ভব হবে না। এতে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে দেশের নাগরিক, বিশেষত প্রান্তিক জনগণ। তাই প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পাশাপাশি তাদের সুষমবণ্টনও আবশ্যক। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের চিহ্নিত করা সমস্যার একটি ছিল প্রাথমিক চিকিৎসা উপেক্ষা করে বিশেষজ্ঞের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। প্রাথমিক চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্র হলো উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো। এখানে যদি সেবাদাতাদের অভাব থাকে তাহলে রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা নেয়ার ভোগান্তি দূর হবে না, তাদের প্রাথমিক চিকিৎসামুখীও করা যাবে না। এছাড়া বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন সমস্যার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রশাসনের জনবলের পেছনে যদি বরাদ্দ থেকে বেশি ব্যয় হয় তাহলে অন্যান্য জরুরি কার্যক্রমে অর্থায়ন সংকট রয়েই যাবে। দেশে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অবকাঠামোগত ঘাটতিও প্রকট।

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের দিকে সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মনোযোগ দিতে হবে। চিকিৎসা খাতে বৈষম্য কমাতে ৭ হাজার অতিরিক্ত (সুপারনিউমারারি) পদ সৃষ্টি করার কথা জানা গেছে। এরই মধ্যে ৪৩ হাজার সিনিয়র নার্সের মধ্যে কয়েকজনকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। সুপারনিউমারি পদ সৃষ্টি করে বিপুল পরিমাণ জনবলকে পদোন্নতি দেয়ার বিষয়ে আরো গভীর পর্যালোচনা হওয়া প্রয়োজন। কারণ এতেও কেবল ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যসেবা খাত কতটা উপকৃত হবে সেদিকে গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক।