নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রকৃত পরিসংখ্যান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সরকারি পরিসংখ্যান প্রশ্নবিদ্ধ। পরিসংখ্যানগুলোয় নেই বাস্তব চিত্রের প্রতিফলন। বিগত সরকারের সময়ে বিদেশ থেকে বেশি ঋণ নেয়ার পাশাপাশি জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাতের পরিসংখ্যানেও কারসাজি করা হয়েছে। এছাড়াও এলডিসি থেকে উত্তরণ ও উন্নয়নকে অতিরঞ্জিত করে দেখাতে জিডিপিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে। এছাড়া অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক জিডিপি প্রবৃদ্ধি থেকে শুরু করে রফতানি বাণিজ্য, রিজার্ভ, রাজস্ব আহরণ ইত্যাদি সব বিষয়ের তথ্যে রয়েছে বড় ধরনের গরমিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে দেশের জিডিপির আকার ৪৫৯ বিলিয়ন ডলার। যদিও অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জিডিপির প্রকৃত আকার ৩০০-৩৫০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলেছেন, সরকারিভাবে এ তথ্যকে প্রকৃত পরিমাণের চেয়ে অন্তত ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়েছে। জিডিপিসহ অর্থনীতির বিভিন্ন সূচককে এভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোয় সংকটে থাকা অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারের গৃহীত কোনো নীতিই বিগত বছরগুলোয় সেভাবে কাজ করেনি। বর্তমানে তথ্যের অসংগতি বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে সামষ্টিক অর্থনীতিতে। কেননা সঠিক পরিসংখ্যান ছাড়া কার্যকর নীতি প্রণয়ন সর্বদাই ব্যাহত হয়। সর্বোপরি সঠিক পরিসংখ্যান ছাড়া অর্থনীতির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা সম্ভব নয়।
বিগত সরকারের আমলে জিডিপিকে যেভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে সেভাবে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও শিল্প উৎপাদন বাড়েনি। সমসাময়িক প্রতিযোগী অর্থনীতিগুলোর তুলনায় বিনিয়োগ, রফতানি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিদেশী বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশসহ বিভিন্ন সূচকেই পিছিয়ে বাংলাদেশ। সরকারের পরিসংখ্যান যদি সঠিক হতো তাহলে এসব সূচকে বাংলাদেশ এতটা পিছিয়ে থাকার কথা নয়। তবে বিগত সরকার জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখালেও মূল্যস্ফীতি কমিয়ে দেখিয়েছে। ফলে সঠিক তথ্যের অভাবে চাহিদা ও বাজার নিয়ন্ত্রণসহ অর্থনীতির ব্যবস্থাপনাগত সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ত্রুটি রয়ে গেছে। এ অবস্থায় বর্তমান প্রয়োজন অনুযায়ী জিডিপির প্রকৃত আকার নিরূপণসহ সঠিক পরিসংখ্যান নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য-উপাত্তের স্বচ্ছতা ও সঠিকতা নিশ্চিতেও আরো কঠোর অবস্থান নেয়া জরুরি।
পরিসংখ্যান নিয়ে বিভ্রাট তৈরি হওয়ার পেছনে সহজ ভাষায় প্রধান দুটি কারণ থাকতে পারে। এক. যদি কোনো অদক্ষ ব্যক্তিকে দিয়ে কাজটি করানো হয়। দুই. যদি পরিসংখ্যানের রাজনৈতিকীকরণ হয়। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত সরকারের আমলে দ্বিতীয় কারণটিই দেশে পরিসংখ্যান বিভ্রাটের সবচেয়ে বড় কারণ। বানোয়াট পরিসংখ্যান বানানোর কাজটি করা হতো সাবেক এক পরিকল্পনামন্ত্রীর নেতৃত্বে। তিনিই ছিলেন কৃত্রিম পরিসংখ্যানের প্রধান পরিকল্পনাকারী। ২০১৪ সালে পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর পরিসংখ্যানের বিভ্রান্তি প্রকট হতে থাকে। মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে পাঁচ-ছয়জনের একটি সিন্ডিকেট। অভিযোগ উঠেছে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের তথ্য ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গেও বাড়তে থাকে পরিসংখ্যানগত ব্যবধান। এ প্রবণতা অব্যাহত ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় পর্যন্ত।
পরিসংখ্যানগত বিভ্রান্তি জাতীয় অর্থনীতির লক্ষ্য নির্ধারণ, নীতি প্রণয়ন থেকে শুরু করে সার্বিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। দেশের পরিসংখ্যান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আস্থার সংকট তৈরি হয়। অনাস্থা তৈরি হয় দেশের অভ্যন্তরে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিসংখ্যানকে রাজনীতিতে জড়িয়ে ফেললে তা সঠিক নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে যায় সামষ্টিক অর্থনীতি। দেশে রাজনৈতিক কারণে পদ্ধতিগত পরিবর্তন এনে সরবরাহ করা হয়েছে বিকৃত পরিসংখ্যান। এসব ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণের কারণেই ধাক্কা লেগেছে দেশের অর্থনীতিতে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠনের পাশাপাশি দেশের আর্থিক খাতের অবস্থা নিরূপণের জন্য শ্বেতপত্র কমিটি গঠন করে। যেখানে দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদরা তিন মাস কাজ শেষে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনেও বিগত সময় পরিসংখ্যান কারসাজির মাধ্যমে উন্নয়নের বয়ান তৈরির অভিযোগ আনা হয়। এতে বলা হয়, ২০১০-১৯ সাল পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখানো হলেও কিসের ভিত্তিতে এ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে তার কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। এমনকি একটি মডেলে ২০১৩ সালের পর থেকে দেশের প্রবৃদ্ধি নামতে থাকলেও সরকারের ঘোষিত প্রবৃদ্ধির হার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রবৃদ্ধির উপস্থাপিত তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার এমন ব্যবধান শুধু বাড়ছিল। জিডিপির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণ করতে হলে এখন সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। তাছাড়া বিগত সময়ে রফতানি তথ্যের মধ্যেও ছিল বাড়িয়ে দেখার প্রবণতা। এ বিষয়ে প্রশ্ন বাড়তে থাকায় অবশেষে গত বছর ইপিবির রফতানির তথ্য থেকে এক ধাক্কায় ১৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৩৮০ কোটি ডলার বাদ দিয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একইভাবে এনবিআর ও সিজিএর রাজস্ব আহরণের তথ্যে পার্থক্য দেখা দেয় ৯৭ হাজার ২৮০ কোটি টাকার বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের রাজস্ব আয় নিয়ে এমন গরমিল দেখা দেয়ায় হিসাব পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনে এনবিআর।
বিবিএস থেকে বুধবার প্রকাশিত অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর তথ্যও বলছে, বিগত এক দশকে দেশে তেমন শিল্পায়ন ঘটেনি। সরকারের পক্ষ থেকে বিপুল বিনিয়োগ ও বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও এসবের সুফল মেলেনি অর্থনীতিতে। ২০০১-১৩ সাল পর্যন্ত দেশে ১০০ শতাংশ শিল্পের প্রসার ঘটলেও গত ২০১৩-২৩ সাল পর্যন্ত শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ বিগত এক দশকে শিল্পায়নের হারও থমকে ছিল। তবে শিল্প খাত থমকে থাকলেও বিগত সময় থেকেই দেশের অর্থনীতিতে সেবা খাতের অবদান সবচেয়ে বড় করে দেখানো হয়েছে। যেহেতু সেবা খাতের সঠিক আকার হিসাব করা কঠিন, তাই এর সুযোগ নিয়ে খাতটিকে বড় করে দেখিয়ে জিডিপির আকার বড় দেখানো হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সামষ্টিক অর্থনীতির স্বার্থে পরিসংখ্যান রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি। অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে সরকারের উচিত যেকোনো নীতি প্রণয়নের আগে সঠিক পরিসংখ্যানের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া। তথ্য-উপাত্তের সঠিকতা যাচাই করতে ডাটা কমিশন গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এ কমিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও ব্যাংকের পরিসংখ্যানও পর্যালোচনা করার কথা প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছিল। যদিও এখনো ডাটা কমিশনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিশ্বব্যাংকের ২৫টি সূচক বিবেচনায় তৈরি হওয়া ২০১৪ সালের স্ট্যাটিস্টিক্যাল ক্যাপাসিটি ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশের সার্বিক স্কোর ছিল ১০০-এর মধ্যে ৮০ আর মেথডোলজি বা পদ্ধতিগত সূচক ছিল ৭০। কিন্তু এর পর থেকে দুটি স্কোরই ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। সবচেয়ে বড় পতন দেখা যায় পদ্ধতিগত স্কোরে। ২০১৪ সালের স্কোর ৭০ থেকে ২০২০ সালে পদ্ধতিগত স্কোর অর্ধেকের বেশি কমে ৩০-এ নেমে আসে। বহির্বিশ্বে দেশের পরিসংখ্যান নিয়ে আস্থা ফেরাতে হলে বিশ্বব্যাংকের এ সূচকের স্কোর বাড়ানোয় কাজ করতে হবে। বিবিএস দেশের সব ধরনের সরকারি পরিসংখ্যান তৈরি ও প্রকাশ করে। বিবিএসের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, গত দেড় দশকে প্রতিষ্ঠানটিতে বানোয়াট পরিসংখ্যান নিয়ে কথা বলার মতো পরিস্থিতি ছিল না, কেউ ন্যূনতম আপত্তি তুললে তাকে বদলি করে দেয়া হতো। এমনকি বিনা কারণে হয়রানির জন্য বিভাগীয় মামলাও করা হয়েছে।
জিডিপির প্রকৃত আকার নিরূপণে বিবিএসকেই কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে বিবিএসে সংস্কার আনা জরুরি। বিগত সময়ে সরকারি পরিসংখ্যানগত বিভ্রান্তির সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তাদের শাস্তির আওতায় আনা দরকার। পাশাপাশি যাদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে তাদের ন্যায্যতা প্রাপ্তিও জরুরি। দক্ষ পরিসংখ্যানবিদদের ফিরিয়ে আনতে হবে কিংবা নতুন করে বিবিএসে যোগ্য পরিসংখ্যানবিদ নিয়োগের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। দেশের অর্থনীতির সঠিক পরিসংখ্যান নিরূপণের মাধ্যমেই সামষ্টিক অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে। সঠিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিতে গতি ফিরে আসুক—এটাই প্রত্যাশা।










