জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে ফেরার পর থেকে চরম পদক্ষেপ, উসকানিমূলক বক্তব্য, কর্মকর্তাদের বদলি, নীতির উলটপালট, নিয়মকানুনের অবজ্ঞা ও লঙ্ঘনের ঘটনা এত ঘন ঘন ঘটছে যে তাল রাখা কঠিন। এর সঙ্গে রয়েছে গোপন তথ্য ফাঁস করা থেকে শুরু করে আদালতের আদেশ অমান্য করার মতো ঘটনা। বিশ শতকের শুরুতে ইউরোপের ফ্যাসিস্ট শাসকদের মতো ট্রাম্প জানেন, জনসাধারণ যদি বিভ্রান্ত, বিভক্ত এবং দিশাহারা থাকে, তাহলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা ও প্রতারণা করা অনেক সহজ হয়ে যায়। সচেতন, সম্পৃক্ত ও আত্মবিশ্বাসী নাগরিকদের ঠকানো কঠিন।
ট্রাম্পের একের পর এক ঘোষণা, নীতি পরিবর্তনের আকস্মিক ঘোষণা, আইনের লঙ্ঘন তার বিরোধীদের দিশাহারা করে তোলে। ফলে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে অসংখ্য মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্যপ্রবাহ ও জনগণের অসন্তোষকে টেনে আনার কৌশল তার সমর্থকদের এমন এক অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে তারা বুঝতেই পারে না যে ট্রাম্প প্রায়ই তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধেই কাজ করছেন।
উদাহরণস্বরূপ, সদ্য পাস হওয়া ‘বিগ, বিউটিফুল বিল’ এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা (মেডিকেইড) কর্মসূচিতে ট্রিলিয়ন ডলারের মতো বাজেট ছাঁটাই করা হবে। এতে আগামী এক দশকের মধ্যে লাখো আমেরিকান স্বাস্থ্যসেবাবঞ্চিত হবেন, যাদের মধ্যে বহু ট্রাম্প সমর্থকও আছেন। অথচ তারা এখনো ট্রাম্পে মোহমুগ্ধ হয়ে বুঁদ হয়ে আছেন। আমেরিকার শত্রুদের হাত থেকে ট্রাম্পের রক্ষা করার অঙ্গীকারে তারা ইমান রাখেন। যদি আপনার একটি ক্ষুব্ধ সমর্থকগোষ্ঠী থাকে এবং আপনি তাদের সামনে কাউকে ভয়ানক ‘শত্রু’ হিসেবে কাউকে হাজির করতে পারেন, তাহলে নীতির ধার ধারতে হবে না। শুধু তাদের ভয় আর ক্ষোভকে উসকে দিতে পারলেই চলে।
দেশে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিরোধীরা শুধু তার ভণ্ডামি তুলে ধরে (যেমন বাজেট ঘাটতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েও পরের দশকে ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার ঘাটতি বাড়ানোর মতো কর ও ব্যয় বিলে স্বাক্ষর করা) বা তার নীতির কারণে সাধারণ আমেরিকানদের ওপর কী প্রভাব (যেমন শুল্কের মূল্যস্ফীতিজনিত প্রভাব) পড়ছে, তা তুলে ধরে খুব একটা সফল হতে পারছে না। এসব কৌশল একইভাবে অকার্যকর প্রমাণ হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও ট্রাম্পের অস্থিতিশীল আচরণের (যেমন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা বা বহুপক্ষীয় চুক্তি প্রত্যাখ্যান) জবাব কীভাবে দেবে, তা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন বিশ্ব নেতারা। তবে শুল্কের ক্ষেত্রে পরবর্তী পথ স্পষ্ট হওয়া উচিত।
গত ২ এপ্রিল ট্রাম্প একতরফাভাবে সেসব দেশের ওপর ‘পারস্পরিক’ শুল্ক বসানোর ঘোষণা দেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে উদ্বৃত্তে রয়েছে। কিন্তু ৯ এপ্রিল শুল্ক কার্যকর হওয়ার ২৪ ঘণ্টারও কম সময় পর তিনি ৯০ দিনের ‘বিরতি’ ঘোষণা করেন। যাতে আক্রান্ত দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন চুক্তি করতে পারে। পরে আবারো সময়সীমা বাড়িয়ে ১ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়েছে।
ট্রাম্পের শুল্কনীতি অর্থনৈতিক যুক্তির কোনো ধার ধারছে না। শত শত বছরের গবেষণাভিত্তিক সুপ্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব বলছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এমন হওয়া উচিত যাতে উভয় পক্ষেরই লাভ হয়। কারণ প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব তুলনামূলক সুবিধা অনুযায়ী পণ্য বা সেবা উৎপাদন ও রফতানি করতে পারে।
তুলনামূলক সুবিধা তৈরি হয় নানা কারণে—জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক সম্পদ, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ইত্যাদি। যেমন জাপান বহু বছর ধরে প্রযুক্তিতে উন্নয়ন ও বিশ্ববাজারে আস্থা তৈরি করায় এখন উন্নতমানের গাড়ি উৎপাদনে এগিয়ে। প্রতিটি দেশ তাদের নিজ নিজ শক্তিমত্তা কাজে লাগালে সবার জীবনমান বাড়ে।
কিন্তু ট্রাম্পের দৃষ্টিতে বাণিজ্য একটি ‘জিরো-সাম গেইম’। তিনি মনে করেন, অন্যরা লাভ করলে আমেরিকা নাকি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই তিনি শুল্ককে অস্ত্র বানিয়ে আমেরিকান শিল্পের জন্য ‘জয়’ ছিনিয়ে আনার চেষ্টা করেন। অথচ এই শুল্কের বাড়তি ব্যয় পড়ে মূলত আমেরিকান আমদানিকারকদের ওপর। তারা সেটি আবার পণ্যমূল্যে চাপিয়ে দেয়। ফলে বিদেশী পণ্যের প্রবেশ সীমিত হয়, অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা কমে, আর দাম বাড়ে।
তবে ট্রাম্প হয়তো এসব বোঝেন না কিংবা গুরুত্বই দেন না। তার সমর্থকরা এখনো ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগানে মশগুল। ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তড়িঘড়ি করে চুক্তি করতে চাপ অনুভব করছে। কিন্তু এ চাপের কাছে তাদের মাথা নোয়ানো ঠিক হবে না। গেম থিওরি বলে, যে পক্ষ ধৈর্য ধরে, সেই জটিল পরিস্থিতিতে সহযোগিতামূলক সমাধানের পথে যেতে পারে—বিশেষ করে যখন প্রতিপক্ষ অস্থিরতা দেখায়। দেশগুলোকে ধৈর্য ধরতে হবে এবং আলোচনাকে কেবল শিল্পপণ্য নয়, কৃষিপণ্য এমনকি নিরাপত্তা ইস্যুতেও প্রসারিত করতে হবে, যাতে পারস্পরিক লাভের পথ খোলা থাকে।
জাপান-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য আলোচনা এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হতে পারে। বাণিজ্য আলোচনায় শুধু গাড়িই নয় কৃষিপণ্যও গুরুত্ব পাচ্ছে। জাপান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি আমদানি এশিয়ার দেশটিতে রফতানি পরিমাণ অনেক কম। অন্যদিকে কৃষিপণ্য, বিশেষ করে চাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে রেখেছে জাপান। মূলত চাল এমন একটি খাত, যা জাপান দীর্ঘদিন ধরে শুল্ক ও ভর্তুকির মাধ্যমে রক্ষা করে আসছে। কিন্তু বর্তমানে অতিরিক্ত উৎপাদন এবং উচ্চ উৎপাদন খরচের কারণে এই সুরক্ষা তেমন কার্যকর হচ্ছে না। জাপানের জন্য এ খাতকে আরো উন্মুক্ত করা যৌক্তিক, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির স্বার্থে নয়, বরং নিজস্ব অর্থনৈতিক বাস্তবতাতেও।
ট্রাম্পের আগ্রাসী কৌশল ইউরোপকে নিজের নিরাপত্তার দায় নিজের কাঁধে নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এটি অনিশ্চিত—এ অনিশ্চিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। গত মাসের ন্যাটো সম্মেলনে (স্পেন বাদে) সব দেশ ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছে। বাণিজ্য আলোচনায় নিরাপত্তার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা গঠনমূলক কৌশল হতে পারে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন দখলদার নীতির কারণে জাপানের প্রতিরক্ষা ব্যয় সীমিত রাখা হয়েছিল, যাতে দেশটি আবার কোনো সামরিক শক্তিতে পরিণত না হয়। কিন্তু এখন পাশের চীন ও উত্তর কোরিয়ার সামরিক শক্তির উত্থানের প্রেক্ষাপটে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন চাপের কারণে জাপানকে নতুন করে প্রতিরক্ষা খাতে গুরুত্ব দিতে হবে।
এসব কিছুই অবশ্য ট্রাম্পের অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর ও অস্থিতিশীল নীতিকে বৈধতা দেয় না। তবে দেশগুলো যদি বিভ্রান্ত না হয়, দ্রুত
সিদ্ধান্ত না নেয় এবং কৌশলগতভাবে চিন্তা করে, তাহলে তারা একতরফা ও ক্ষতিকর চুক্তির ফাঁদে পড়া এড়াতে পারবে। বরং ধীরে-সুস্থে পারস্পরিক লাভজনক প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা টেবিলে আসাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
কোইচি হামাদা: ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা










