এছাড়া এটি দেশের এবং একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর। ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস ২০২৫-এ জনসংখ্যার বিবেচনায় ঢাকাকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে জনসংখ্যা ও অন্যান্য অবকাঠামোগত বিচারে তুলনামূলক এগিয়ে থাকলেও পরিবেশগত দিক দিয়ে ঢাকার অবস্থান ঠেকেছে তলানিতে। বিশেষ করে ঢাকার বায়ুমান ভয়াবহ অস্বাস্থ্যকর। বছরের প্রায় প্রতিদিনই এর বায়ু থাকে অত্যধিক দূষিত। ঢাকাবাসীরা ২০১৬ থেকে ২০২৪—এ নয় বছরে মাত্র ৩১ দিন নির্মল বাতাসে নিশ্বাস নিতে পেরেছে বলে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) তথ্যে উঠে এসেছিল। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে খুবই অস্বাস্থ্যকর ও দুর্যোগপূর্ণ বাতাস ছিল যথাক্রমে ৬৩৫ ও ৯৩ দিন। আর ৮৫৩ দিনের বাতাস ছিল অস্বাস্থ্যকর।
দীর্ঘকাল ধরেই বায়ুমানসংক্রান্ত দেশীয় বা আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন বা গবেষণায় দূষিত বায়ুর শহর হিসেবে শীর্ষে থাকছে ঢাকার নাম। এর পরও কেন দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে কোনো ফলপ্রসূ পদক্ষেপ দেখা যায় না তা ভেবে উদ্বিগ্ন হতে হয়। সম্প্রতিও বণিক বার্তার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকার আকাশ ছিল ধোঁয়াশাপূর্ণ। আর এর কারণ হিসেবে বন্ধ থাকা ইটভাটা নতুন করে চালু হওয়া এবং নগরের দুই প্রান্তে থাকা ল্যান্ডফিলে বর্জ্য পোড়ানোকে দায়ী করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। প্রশ্ন হলো, কারণ সম্পর্কে অবগত থাকার পরও দায়িত্বপ্রাপ্তরা কেন তারা এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। নির্বাচিত সরকার গঠনের পর খুব বেশি কার্যদিবস অতিবাহিত হয়নি, তা ঠিক। কিন্তু কোনো সরকারের আমলেই ঢাকার বায়ুমান উন্নয়নে তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ফলে ক্রমেই ঢাকার বায়ুদূষণ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। অতীতের মতো বর্তমান সরকারও এক্ষেত্রে অকার্যকর ভূমিকা রাখবে তা মোটেও প্রত্যাশিত নয়। সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঢাকার বায়ুমান উন্নয়নে কাজ করবে—এ বিষয়ে আশাবাদী হতে চায় নগরবাসী। মনে রাখা প্রয়োজন, ঢাকা যে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছে, এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে এর বায়ুদূষণ।
ল্যান্ডফিলের বর্জ্য পোড়ানোর কারণে সম্প্রতি ঢাকার বায়ুদূষণের তীব্রতা বেড়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন। পাশাপাশি কেরানীগঞ্জ, সাভার, বসিলা এলাকায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ইটভাটাগুলো নতুন করে সচল হওয়ায় বায়ুদূষণ আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে। আশঙ্কা রয়েছে, এ অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বায়ুদূষণ আরো ভয়াবহ রূপ নেবে, যা জনস্বাস্থ্যে মারাত্মক বিপর্যয় নামিয়ে আনবে। এসব বিবেচনায় নিয়ে সরকারের উচিত দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেয়া ও বাস্তবায়ন করা, যাতে ঢাকার বায়ু স্বাস্থ্যকর পর্যায়ে ফিরে আসে।
কার্যকর উদ্যোগের একটি হতে পারে ঢাকা, ঢাকার আশপাশসহ সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা ইটভাটাগুলো ক্রমেই বন্ধ করে ফেলা। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শীত মৌসুমে শহরের বায়ুদূষণের ৩০-৪০ শতাংশের জন্য সরাসরি ইটভাটা দায়ী। অধিকাংশ ইটভাটা এখনো পুরনো ফিক্সড-চিমনি বা আধা-যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে সমাধান হতে পারত কার্বো-পিউরিফিকেশন টেকনোলজির (সিপিটি) মতো আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপন করা। তবে এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। বরং বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারখানায় ইট প্রস্তুত সম্ভব। তাছাড়া ভাটায় ইট পোড়ানোর জন্য জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার হয়। এ কাঠের জোগান দেয়া হয় গাছ কেটে, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সুতরাং ইটভাটা পুরোপুরি বন্ধ করাই শ্রেয়।
দ্বিতীয়ত, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো নিষিদ্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন প্রয়োজন। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় তিনটি ধাপ জরুরি—উৎসে বর্জ্য আলাদা করা, জৈব বর্জ্য কম্পোস্টিং এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা। এছাড়া মিথেন গ্যাস সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিলে একই সঙ্গে দূষণ কমবে ও জ্বালানি সুবিধা তৈরি হবে। মাতুয়াইল ও আমিনবাজার ল্যান্ডফিল নিয়ে একটি বিস্তর গবেষণা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরা। ল্যান্ডফিলের পোড়ানো বর্জ্য থেকে বের হওয়া ধোঁয়ায় ব্যাপক মাত্রায় মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি রয়েছে বলে তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে। সুতরাং বর্জ্যকে জ্বালানির উপাদান হিসেবে কাজে লাগানো উচিত।
তাছাড়া ক্রমবর্ধমান নাগরিক চাপে ঢাকার ল্যান্ডফিল কমে আসায় এবং বারবার জমি অধিগ্রহণের জটিলতা নিরসনে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পথে যাত্রা শুরু করেছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এ লক্ষ্যে ২০২০ সালে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প হাতে নেয় সংস্থাটি। গত ডিসেম্বরে এ প্রকল্পের মেয়াদও শেষ হয়েছে হচ্ছে। যদিও দুই দফায় দ্বিগুণ ব্যয় বাড়িয়েও এখনো ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্রই নির্মাণ হয়নি। এতে প্রকল্পের কাজে ব্যবহারের জন্য কেনা মূল্যবান যন্ত্রপাতিও নষ্ট হচ্ছে বলে বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছিল। ডিএনসিসি জানিয়েছিল যে চূড়ান্ত পরিবেশ ছাড়পত্র না পাওয়ায় বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেয়া যাচ্ছে না। সরকারের উচিত বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ প্লান্ট গড়ে উঠেছে। পাশের দেশ ভারতেও রয়েছে ‘ওয়েস্ট টু এনার্জি প্লান্ট’। এছাড়া দেশটি বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাসও উৎপাদন করে। অন্যদিকে নেপালে কমিউনিটিভিত্তিক কম্পোস্ট প্লান্ট পরিচালনা করা হয়। বিশেষ করে হোটেল-রেস্টুরেন্টের খাদ্য বর্জ্য ব্যবহার করে বায়োগ্যাস উৎপাদন করা হয়। এভাবে স্থানীয়ভাবেই দক্ষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে। বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে সার্কুলার ইকোনমিও গড়ে উঠবে, যার মূল লক্ষ্যই হলো বর্জ্য হ্রাস, পুনর্ব্যবহার ও রিসাইকেল।
এগুলোর পাশাপাশি বায়ুদূষণের অন্য উৎসগুলো শনাক্ত করে তার সমাধানে এগোতে হবে। যেমন নির্মাণকাজ থেকে ঢাকায় ধুলার উৎপত্তি হয়। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, উন্মুক্ত নির্মাণসামগ্রী এবং অনিয়ন্ত্রিত বালিবাহী ট্রাক নগরের বাতাসে বিপুল ধূলিকণা ছড়ায়। নির্মাণস্থলে বাধ্যতামূলক কাভারিং, পানি ছিটানো এবং পরিবহন নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া ঢাকার সড়কে মেয়াদোত্তীর্ণ ও দূষণকারী যানবাহন অপসারণ করতে হবে। সব মিলিয়ে ঢাকার বায়ুমান উন্নয়নে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।










