এ পাঁচ পরিবর্তন আসলে কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে (আদৌ করা হবে কিনা)—এ বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা এখনো অস্পষ্ট। বাস্তবতা বিবেচনায় বিনিয়োগকারী, করপোরেট নেতারা এমনকি নীতিনির্ধারকদের এসব উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।
প্রথমেই রাজস্ব ব্যবস্থার নীতিমালায় পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চাই। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগের নির্দেশিকায় সম্প্রতি কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসব পরিবর্তন করতে পারলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তহবিলের মাধ্যমে সরাসরি ঋণ দেয়া যাবে। এভাবে মালিকানার অংশীজনদের ওপরও সমান হারে কর আরোপ করার নীতিমালা বাস্তবায়ন সহজ হবে। এ তহবিলগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে করমুক্ত সুবিধা ভোগ করে। এমনটা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও করে। এসবের ফলে অর্থনৈতিক খাতে বহুমুখী প্রভাব পড়তে পারে। ২০২৫ সালে সমাজকল্যাণ ও সরকারি ভাতা তহবিলগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ১৩২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। বিনিয়োগের এ পরিমাণে সামান্য পরিবর্তনও যদি এখন আনা হয় তাহলে বেসরকারি বাজার ও ঋণ অবকাঠামোতে এর প্রভাব পড়বে।
দ্বিতীয়ত, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক সুদহারের ওপর ১০ শতাংশ সীমা নিয়ে আলোচনা জরুরি। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে ভোক্তা পর্যায়ে ঋণ আদায় নিম্নমুখী হতে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ব্যাংকগুলোর ওপরও। কারণ ক্রেডিট কার্ড দেবে এমন প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহক থেকে কম সুদ আদায় করবে। বেশ কয়েকটি সমীক্ষা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে ক্রেডিট কার্ড প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান জেপি মরগানের বার্ষিক আয় এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে ২০-২৫ শতাংশ হারে কমবে। ঋণের খরচ কমাতে এ প্রস্তাব দেয়া হলেও এমন প্রস্তাবনা ঋণদাতাদের শর্ত আরো কঠোর করে তুলতে পারে। এছাড়া নিম্ন ক্রেডিট রেটিং রয়েছে এমন ঋণগ্রহীতাদের ঋণ বাজারে প্রবেশের সুযোগ সীমিত করে তুলতে পারে। এমনটি হলে মূলধারার ঋণ খাতবঞ্চিতরা বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হবেন। উদাহরণ হিসেবে পে ডে ঋণদাতাদের কথা বলা যায়। এ ঋণদাতাদের বার্ষিক সুদহার ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। কিন্তু এ ঋণদাতারা ছয়টি অঙ্গরাজ্য ও ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ায় নিষিদ্ধ।
সম্প্রতি ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে একক পরিবার বা ক্ষুদ্র পরিবারের বাড়ি কিনতে না পারে সে ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে ওই আদেশে। ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের ফলে নগরের কিছু কিছু অংশে স্বস্তি দেখা দিতে পারে। সংকটকালীন সাশ্রয়ের সিদ্ধান্ত থেকেই এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ট্রাম্প মূলত বাড়ির মালিকদের মধ্যে বিক্রির প্রতিযোগিতা কমাতেই এমন উদ্যোগ নিয়েছেন। এ ধরনের বিক্রেতারা ক্রমেই বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন। সমস্যা হলো, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষুদ্র পরিবারের বাসযোগ্য বাড়ির বাজারের ২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। মহানগরে ২০ শতাংশের বেশি মালিকপক্ষের জন্য তাই ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত কিছুটা চাপ কমাতে পারে। এভাবে ক্ষুদ্র বাড়ির প্রতি বড় প্রতিষ্ঠানের চাহিদাও কমবে। তাতে বাড়ি মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মন্থর হয়ে উঠবে।
চতুর্থত, ট্রাম্প প্রশাসন করপোরেট সুশাসন এবং শেয়ারহোল্ডার ভোটে প্রক্সি পরামর্শদাতা সংস্থাগুলোর, বিশেষ করে গ্লাস লুইস এবং ইনস্টিটিউশনাল শেয়ারহোল্ডার সেবার প্রভাব সীমিত করার চেষ্টা করছে। গত ডিসেম্বরে এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ট্রাম্প সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, ফেডারেল ট্রেড কমিশন এবং শ্রম বিভাগের কাঠামোগত অবস্থাকে পর্যালোচনা করে সংশোধনের নির্দেশ দেন। এভাবে বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাবনা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্ধারণ ও বেতন-ভাতা-সংক্রান্ত বিষয়ে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে সেগুলোর বিষয়ে সংস্থাগুলো তাদের উদ্বেগ জানায়। এ সিদ্ধান্ত প্রক্সি উপদেষ্টাদের প্রভাব কমিয়ে সম্পদ ব্যবস্থাপকদের নিজ নিজ বিশ্লেষণের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার তাগিদ দেয়। এ কারণে ক্ষুদ্র ও খুচরা বিনিয়োগকারী, নির্বাহী বেতন ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সংস্কারবিষয়ক প্রস্তাবনা এমনকি সামাজিক সুরক্ষা নীতিমালার পরিসরও সংকুচিত হতে থাকবে। এরই মধ্যে জেপি মরগানের মতো প্রতিষ্ঠান প্রক্সি উপদেষ্টা সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালিত প্লাটফর্ম চালু করেছে।
অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সক্ষম করে তোলার জন্য সম্পদ জরুরি। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো হয়তো অর্থনৈতিক জটিলতার ধাক্কা সামলাতে পারে। কিন্তু ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে বাড়তি ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। তাদের এ বাড়তি ব্যয় শেষে বিনিয়োগকারীদের ওপর পড়ে। সক্রিয় যেসব বিনিয়োগকারী প্রক্সি উপদেষ্টাদের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করেন তাদের জন্য ব্যবসায়িক প্রভাব বিস্তার আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
পরিশেষে আরেকটি বিষয় আলোচনা করা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রে এসইসি জনপরিসরে বাণিজ্য পরিচালনা করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অর্ধবার্ষিক রিপোর্ট তৈরির পরিকল্পনা করছে। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর ত্রৈমাসিক হালনাগাদের প্রচেষ্টা শেষ হবে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে। স্বল্পমেয়াদে বেশি পুঁজি আদায়ের মনোভাব থামাতেই মূলত এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা দেখছি, অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের সংখ্যা কমিয়ে আনায় ইউরোপের কিছু বাজারে স্বচ্ছতার ঘাটতি দেখা গেছে। ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনগুলো বিনিয়োগকারীদের পুঁজি, মুনাফা এবং ব্যয়ের নিয়মিত তথ্য দেয়। বড় প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাগুলো তখন শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে তদারকির কাজ করতে পারে। যখন এসব তথ্য পর্যাপ্ত সমন্বয়ের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয় না তখন বাজারে বৈষম্য দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ বড় বাজারে অংশ নিচ্ছে এমন প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ভালো সম্পদ রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান অপ্রত্যক্ষভাবে বেশি সুবিধা পেতে থাকবে।
নীতিগত এসব উদ্যোগের বাইরে, বিস্তৃত মুদ্রানীতিগত উন্নয়নও আর্থিক পরিপ্রেক্ষিতকে বদলে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফেড চেয়ার পদে কেভিন ওয়ার্শের মনোনয়নে বাজার ইতিবাচক সাড়া দিলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। একই সময়ে ফেড ট্রেজারি পুনরায় বিল কিনতে শুরু করেছে। বর্তমানে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত রিজার্ভ বজায় রাখতে প্রতি মাসে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের টি-বিল এবং অন্যান্য স্বল্পমেয়াদি সরকারি বন্ড কেনা হচ্ছে। ট্রাম্প হাউজিং-ফাইন্যান্স এজেন্সি ফ্যানি মে এবং ফ্রেডি ম্যাককে ২০০ বিলিয়ন ডলারের মর্টগেজ বন্ড কেনার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, এ সিদ্ধান্ত মর্টগেজ সুদের হার কমাবে এবং হাউজিং সাপ্লাই সীমিতকারী ‘লক-ইন প্রভাব’ মোকাবেলা করবে।
এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক ও খুচরা উভয় বিনিয়োগকারীর জন্য জিনিয়াস আইন প্রণয়ন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ নীতির ফলে ডলারের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া স্টেবলকয়েন কিছু বাড়তি সুবিধা পাবে। এ সিদ্ধান্তের ফলে বোঝা গেছে, নীতিনির্ধারকরা আর্থিক খাতে উদ্ভাবনের পক্ষে। তদারকি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা এখন বেশি ঝুঁকি নেয়ার আগ্রহ দেখাবেন।
স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন নীতি ও তদারকি খাতে দ্রুত পরিবর্তন আনছে। এসব সিদ্ধান্ত সার্বিকভাবে আর্থিক বাজারের কাঠামোর পরিবর্তন আনতে পারে। এসব পরিবর্তনকে লঘু ভাবার উপায় নেই। তাতে বরং ক্ষতি হবে বিনিয়োগকারীদেরই।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ২০২৬]
ডামবিসা মোয়ো: আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদ ও লেখক










