জহির উদ্দিন স্বপন, বিএনপি চেয়ারপাসনের উপদেষ্টা ও বরিশাল-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন। সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের চীন সফরে তিনি ছিলেন। সফরে চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্কসহ অন্যান্য বিষয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিকা মাহজাবিন

সম্প্রতি আপনি চীন সফর থেকে ফিরলেন। এ সফর নিয়ে জানতে চাই।

এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক, বিশেষ করে দেশ দুটির ভবিষ্যৎ সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বে প্রবেশ করেছে। আলাপ-আলোচনায় মনে হয়েছে চীন সরকার এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ধরে নিয়েছে খুব দ্রুতই এখানে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। সেই সম্ভাবনাকে মাথায় রেখেই আমাদের দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ভ্রমণটি ছিল। যেখানে উভয় পক্ষেরই সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি বৈঠকটি যেখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে সেখানে সাধারণত সরকারপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক হয়ে থাকে। অর্থাৎ এটি একটি বার্তা যে আমরা সরকারপ্রধান না হয়েও আমাদের একই ধরনের গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

আলোচনায় কোন বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে?

বৈঠকে আবারো ‘এক চীন নীতি’-র প্রতি আমাদের দলের মহাসচিব দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। এ নীতি থেকে আমরা সরে এসেছি বলে এক ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা অনেকে চালিয়ে থাকেন। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেয়া হয়েছে। আলোচনার এক পর্যায়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে চীন সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে দেশটির কমিউনিস্ট পার্টি। এ আমন্ত্রণ কূটনৈতিক দিক থেকে তাৎপর্য বহন করে।

আপনাদের এ সফরের আগে অন্তর্বর্তী সরকারও চীন সফরে গিয়েছেন। কিন্তু দেশটি থেকে নতুন কোনো ঋণ কিংবা বিনিয়োগ আসেনি। অর্থনৈতিক বিষয়গুলো কি আপনাদের বৈঠকে এসেছে?

আমাদের অর্থনীতিতে চীনের ভূমিকার প্রসঙ্গ টেনে তাদের প্রশংসা করেছি এবং এটিকে অব্যাহত রাখার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদ আমলে বেশকিছু ঋণ দুর্নীতিগ্রস্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে। এ ধরনের প্রকল্পগুলো কীভাবে বিবেচনা করা যায় সে বিষয়ে আমাদের মহাসচিব আলোচনা করেছেন। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঋণকে গ্রান্টে (অনুদান) পরিবর্তনের একটি প্রথা আছে। সময়-সুযোগমতো তারা বিষয়টিকে বিবেচনা করবেন। দেশের স্বার্থে এটি যত দ্রুত হয় ততই ভালো বলে আমরা বলেছি। তারাও বিবেচনার কথা বলে।

দেশটি নতুন কোনো ঋণের প্রতিশ্রুতি আমাদের ব্যক্ত করেনি। আমাদের দিক থেকে আমরা আহ্বান জানিয়েছি। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, ১৯৭৬ সালে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের শুরুটা হয় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের হাতে। আগামী ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ এবং চীনের সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি হবে।

আপনাদের আলোচনায় কোন প্রকল্পগুলোর কথা উঠে এসেছে?

সুনির্দিষ্টভাবে কোনগুলোকে আমরা দুর্নীতি প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ঋণ বলতে পারি এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। তবে বিভিন্ন পত্রিকায় এ ধরনের প্রকল্প বিশেষ করে মেগা প্রজেক্টগুলোর দুর্নীতির বিষয়টি পত্র-পত্রিকায় আছে। সময়মতো প্রকল্পগুলোর তালিকা হাজির করা কঠিন হবে না বলেই মনে করি।

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চীনের সঙ্গে যে সম্পর্ক তৈরি করেছিল পরবর্তী সময় বিএনপির সঙ্গে সেটির দূরত্ব তৈরি হয় বলে শোনা যায়। এবার কি আপনারা আশাবাদী?

আপনি সঠিক বলেছেন। এ সফরের মধ্য দিয়ে চীন তাদের সর্বোচ্চ আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিএনপিও তার অবস্থানটি পুনরায় দৃঢ়ভাবে স্পষ্ট করেছে। এর ফলে আমাদের সম্পর্কের একটি নতুন পর্ব শুরু হয়েছে। বিএনপির সঙ্গে সব সময়ই সম্পর্ক ভালো ছিল। হ্যাঁ, এটি সঠিক যে তাইওয়ানের সঙ্গে বাণিজ্য করতে গিয়ে বাণিজ্যের একটি কনস্যুলেট অফিস (কূটনৈতিক মিশন) তারা এখানে তৈরি করতে চেয়েছিলেন। চীন নিজেও কিন্তু তাইওয়ানের সঙ্গে বাণিজ্য করে। অর্থাৎ বাণিজ্য করাতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। বাণিজ্যের সম্পর্কটা চীন-বাংলাদেশ-তাইওয়ানের মধ্যে আমলাতান্ত্রিক বা যেকোনো কারণেই হোক সেটি স্বচ্ছ হয়নি। এটিকে কেন্দ্র করে দেশ দুটির মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়, যা উভয় পক্ষের কাছে খুব পরিষ্কার। ৫০ বছর আগে জিয়াউর রহমানের হাতে চীন-বাংলাদেশের সম্পর্ক যেখানে শুরু হয়েছিল বিএনপি আজও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। চীনও সেখানেই আছে। এ অবস্থান থেকেই তারা তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানের সফরেও কি এ ঋণের প্রসঙ্গে বিবেচনার বিষয়গুলো আলাপ করেছিল? সাধারণত এ বিষয়গুলো থাকার কথা। দুই পক্ষের মধ্যে বেশকিছু বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে যেগুলো প্রশংসনীয়। সুনির্দিষ্টভাবে ঋণের বিষয়ে কথা হয়েছে কিনা সে বিষয়ে আমাদের কোনো ধারণা নেই।

রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর কি চীনের দিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঝুঁকে পড়াকেই নির্দেশ করছে?

চীনের অর্থনীতি বিবেচনায় দেশটির দিকে বাংলাদেশ অনেক আগে থেকেই ঝুঁকে আছে। অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে চীনের ওপর নির্ভরশীলতার পাশাপাশি দেশটি থেকে সর্বোচ্চ আমদানি করার মধ্য দিয়ে আমদানিনির্ভরতাও তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রেও প্রাধান্য পেয়ে থাকে চীন। যেখানে আমাদের দ্বিতীয় আমদানির উৎস ভারত। তবে এ সম্পর্কগুলোকে সরলীকরণ করে দেখার সুযোগ নেই। অর্থনৈতিক আলোচনাকে এত বেশি রাজনৈতিকভাবে দেখাটা ভুল হবে। এখনকার অর্থনীতির একটি বৈশ্বিক চরিত্র এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতা আছে। সুতরাং দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে যেসব অংশীদারকে লাভজনক মনে হবে আমরা তো সে দিকেই ঝুঁকব।

অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের যে শীতলতা চলছে নির্বাচনের পর সেটি কোন দিকে মোড় নিতে পারে?

এটি নির্ভর করবে নির্বাচিত সরকার কূটনৈতিক ফোরামে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় স্বার্থ কীভাবে উপস্থাপন করতে চায় তার ওপর। বিএনপি নীতিমালা হচ্ছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। সুতরাং বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই আমরা সম্পর্কগুলো তৈরি করব। শুধু তাই নয়, নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে ভারতের সঙ্গে বিগত সরকার যে চুক্তিগুলো করে গেছে সেগুলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এ মানদণ্ডে আমরা অবশ্যই পুনর্বিবেচনা করব। দেশের স্বার্থ বজায় রেখেই সবার সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫ শতাংশ শুল্কের কারণ কি চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভিন্ন মাত্রায় থাকাটা?

এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না। তবে এটি খুবই স্বাভাবিক চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের যে বাণিজ্য যুদ্ধ চলছে সেখানে কম-বেশি সব দেশই আক্রান্ত; বাংলাদেশ এর বাইরে থাকতে পারবে না। আমাদের রফতানি লক্ষ্যের বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ইউরোপ। কাজেই আমাদের বাণিজ্য ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হবে। একদিকে চীন-ভারতের ওপর আমদানিনির্ভরতা; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ওপর আমাদের রফতানিনির্ভরতা—এ দুই বিষয় মাথায় রেখেই আমাদের চলতে হবে। যারা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ পরিচালনা করবেন তারা নিশ্চয়ই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবে। আমদানি-রফতানিনির্ভরতা, বাণিজ্য ঘাটতি ও ভারসাম্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের যে নীতিমালা—সবকিছুর মধ্যেই দেশের স্বার্থ কীভাবে বজায় রেখে চলা যায় আমরা সেভাবেই পথ চলব।

ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক এখন কেমন?

এ বিষয়ে আমি সংশ্লিষ্ট না, তাই মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। তবে আমাদের মহাসচিবসহ কয়েকজন নেতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত কথা বলেছেন। আনুষ্ঠানিক দেখা হয়নি, কিন্তু আমরা আশাবাদী।

আপনি বলছেন বাংলাদেশের দ্রুত নির্বাচনের বিষয়ে চীন আশাবাদী। আপনি কী কোনো শঙ্কা দেখছেন?

গত ১৩ জুন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে লন্ডনে আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে একটি সংবাদ সম্মেলন হয়। বৈঠকে ফলাফল জাতি এবং বিশ্ববাসীকে যেভাবে জানানো হয়েছে সেখানে থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ আছে বলে আমাদের কাছে মনে হয় না। বিএনপি তো আরো আগেই নির্বাচন চেয়েছিল। সরকারের সুবিধা বিবেচনা করে এবং সরকারের সম্মতিতেই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের তফসিলটি জাতির সামনে যৌথভাবে ঘোষণা করা হয়েছে।