দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের পথে করোনাকালে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মতো আমাদেরও হোঁচট খেতে হয়েছিল। সে অবস্থা থেকে এতগুলো বছরেও তেমনভাবে ঘুরে দাঁড়ানো হয়নি। বিরুদ্ধ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই হাজার বছর ধরে বিশ্বসভ্যতা এগিয়ে চলছে। কিন্তু আমাদের দেশে সরকারি নীতিনির্ধারণের একটি সংকট বরাবরই আমাদের চেতনায় আঘাত করে। সরকার পরিচালকরা যেন দেশ উন্নয়নের সঙ্গে নিজেদের দলীয় রাজনৈতিক লাভালাভের ব্যাপারটাও যুক্ত করেন। তাই দায়িত্বশীলদের দূরদৃষ্টি যেন অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয় না। সচেতন মানুষ নিশ্চয়ই বিশ্বাস করেন সেই উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন যা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভালাভের সাইনবোর্ড হবে না—পাবে স্থায়ী ভিত্তি। চটজলদি রাজনৈতিক লাভালাভের হিসাব না করলে এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে পারলে স্থায়ী রাজনৈতিক লাভও যে হবে এ সত্যটি আমরা অনেক সময় মানতে চাই না। শিক্ষা যে সব শক্তির বুনিয়াদ তা আমাদের মতো সংকীর্ণ রাজনৈতিক বলয়ের ধব্জাধারীরা বুঝতে চান না। বাস্তবসম্মত মুক্তচিন্তার শিক্ষা পরিকল্পনা ছাড়া এ দেশটির ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন।
একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর নির্মিত ইমারত দীর্ঘস্থায়ী হয়। কিন্তু ওপরের চাকচিক্য দেখে কি এ ভাবনা সামনে আসে যে সবকিছুর চালিকাশক্তি মাটির নিচের অদেখা ভিত্তি। ভিত্তি দুর্বল রেখে কতদিন টিকিয়ে রাখা যাবে ইমারত? আমাদের ক্ষমতাবান সরকার পরিচালকদের কাছে সেই স্বর্ণশিল্পীর কদর নেই যে নিখাদ স্বর্ণের গায়ে অনুপম শৈল্পিক নকশা ফুটিয়ে তুলবেন। যা যুগ যুগ ধরে অবিকৃত থাকবে। বাস্তব ক্ষেত্রে ক্ষমতাবানরা খুঁজে নেন সেইসব স্বর্ণকারকে যারা ইমিটেশনের ওপর সোনার প্রলেপে চকচক করে দিতে পারেন। প্রাথমিক লাভ হয় তাতে। কিন্তু এক সময় প্রলেপ উঠে ইমিটেশনের আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ে। এ কারণে উন্নয়নকে স্থায়ী করতে হলে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো প্রয়োজন, যা সততা ও প্রকৃত শিক্ষা উন্নয়ন ছাড়া নির্মাণ করা অসম্ভব। বিগত সরকারের আমলে পেছনে অন্ধকার যতই থাকুক না কিন্তু দৃশ্যমান অনেক উন্নয়ন ছিল। কিন্তু তা স্থায়ী ও দৃঢ় করার জন্য শিক্ষা উন্নয়নের প্রয়োজনে বাস্তব কোনো পদক্ষেপ ছিল না।
সার্টিফিকেটধারী অমানুষ দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি শিক্ষিতের কথা এখানে বলা হচ্ছে না। আমরা সেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথা বলতে চাইছি যার কারিকুলামের মধ্যে থাকবে চেতনা ও মনুষ্যত্ব তৈরির পথনির্দেশনা। আমাদের শিক্ষা নীতি ভালো ফলাফলের ছকে ফেলে ভালো মানুষ তৈরির পথ বন্ধ করে দিচ্ছে।
স্মরণ করতে পারি, করোনাক্রান্ত সময়ে আমাদের মধ্যকার অনেক দুর্বল দিকের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছিল। করোনা বুঝিয়ে দিয়েছিল সময়ের কাজ সময়েই শক্তভাবে করা উচিত। তা করা হয় না বলে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের সময় সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নড়বড়ে হাল সামনে চলে এসেছিল। স্বাস্থ্য খাতে গত এক যুগের বাজেট বরাদ্দ যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তবে নিশ্চয় টাকার সদ্ব্যবহার হয়েছে এমনটা আমরা প্রমাণ করতে পারব না। বিভিন্ন সময়ই তো আমরা সংবাদমাধ্যমে পড়েছি চিকিৎসা সরঞ্জাম অনেক বেশি দাম দেখিয়ে কেনা হচ্ছে। দামি দামি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে নানা সিন্ডিকেটের নাম। কিন্তু এসব দুর্নীতিমুক্ত করে ঢেলে সাজানোর কোনো পদক্ষেপের কথা শোনা যায়নি। এ দেশে আমলা আর ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক সরকারগুলোর কাছ থেকে যতটুকু সমাদর পান, এর সিকিভাগ সম্মান এ দেশে শিক্ষকের নেই। মেডিকেল শিক্ষায় গবেষণার সুযোগ কতটুকু রাখা হয়েছে?
আমরা বিশ্বাস করি, সুশিক্ষাই পারে সার্টিফিকেটধারী অশিক্ষিত দুর্নীতিবাজদের সামনে দেয়াল তুলতে। সুশিক্ষার প্রথম ও জরুরি পাঠ হতে হবে স্কুল থেকে। কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি কারিকুলাম ও সিলেবাসের দুর্বলতা এবং জিপিএ ৫-এর উদগ্র প্রতিযোগিতার কারণে নবীন শিক্ষার্থীর মেধাচর্চার তেমন সুযোগ থাকছে না। এখনো আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে গিয়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বোঝাতে শৈশবে স্কুলে পড়া ছড়া-কবিতাগুলো উদাহরণ হিসেবে দাঁড় করাতে পারি। স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তা মাথায় চলে আসে। এসব সাহিত্যে ছিল নৈতিক শিক্ষার উপাদান, দেশের প্রতি ভালোবাসা জাগানিয়া কথা। এখন আমি তৃতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠ্যবইগুলোয় এমন কবিতা, ছড়ার অন্তর্ভুক্তি দেখতে পাই না।
আমি ১৯৯৬ সাল থেকে এনসিটিবির কারিকুলাম তৈরি ও গ্রন্থ প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ২০১১ সালে তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে বেরিয়ে এসেছি। আর ওপথ মাড়াইনি। দেখেছি সব কিছুতেই যোগ্যতা ও দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক ও দলীয় প্রভাবই বড় হয়ে যাচ্ছে। যার যা করার কথা নয় অনেক ক্ষেত্রে তারা তা করছেন। ফলে ভীষণ সীমাবদ্ধ ও দুর্বোধ্য রচনা অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দিতে হচ্ছে। যে গুণগত শক্তিতে ৫০ বছর পরও স্কুলপাঠ্য বইয়ের ছত্র ঠিক মনে থাকছে, এখন কত শতাংশ শিক্ষার্থী দুবছর পরই তার পাঠ্যবইটি স্মরণ করতে পারবে সে এক গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার মানের ভীষণ স্খলন ঘটেছে। দীর্ঘ শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার আলোকেই বলছি। এ নিয়ে হয়তো লম্বা বক্তৃতা করা যাবে, তবে এই কলামের সীমাবদ্ধতায় তা সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার দিকে তাকিয়ে থাকে সারা পৃথিবী। নানা সংকটে সম্ভাবনায় এ গবেষণালব্ধ জ্ঞান, নতুন উদ্ভাবন দেশকে এগিয়ে নেয়। বিশ্বেও অবদান রাখে। এজন্য গবেষণার পথ তৈরি করতে বিশেষ মনোযোগ থাকে সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। কিন্তু এক্ষেত্রে তো আমরা তিমিরেই আছি। করোনাকালে দেখেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সামান্য করোনা টেস্টের বন্দোবস্ত করেছিল। তাও সেই সংকটকালে সরকারের অর্থ সহযোগিতার অভাবে বন্ধ করে দিতে হয়। গবেষণা করতে হলে গবেষক সৃষ্টি করা জরুরি। উন্নত ও সাংস্কৃতিকভাবে উন্নয়নশীল দেশ গবেষকদের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দেয়। আর সামান্য সহযোগিতার অভাবে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা বন্ধ করে দিতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ মেধাবী শিক্ষক গবেষকদের প্রশিক্ষণ-পড়াশোনার জন্য বিদেশে যাওয়া জরুরি, সেখানে ক্ষমতার জোরে উচ্চ শিক্ষার বাজেটের বড় অংশ নিয়ে আমলারাই বিদেশে চলে যান। এসব ডিগ্রি নিয়ে তারা কোন গবেষণায় নিজেদের নিযুক্ত করবেন তা একমাত্র ঈশ্বরই বলতে পারবেন। অথচ যাদের প্রশিক্ষিত হওয়ার কথা ছিল তারা বদ্ধ জলাশয়ে হাবুডুবু খেতে থাকে। এসব নানা বাস্তবতার কারণেই এশিয়ার র্যাংকিংয়েও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে হয়।
আমাদের দেশের সরকারগুলো অহর্নিশি ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চায় বলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতিবাজ দুর্বৃত্তদেরই পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকে। ফলে সংকটে বোঝা যায় কতটা অন্তঃসারশূন্য করে রাখা হয়েছে প্রতিটি খাতকে। যখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দুর্বৃত্ত রাজনৈতিকীকরণ সম্পন্ন করা হয়েছে তখন থেকে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় তার ঔজ্জ্বল্য হারাতে থাকে। যে বিপুল পরিমাণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষকতা করেছে আওয়ামী লীগ সরকার, যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে এর কিছু অংশ ব্যয় করলেই শিক্ষা উপকরণের সংকট ও গবেষণার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব হতো। কিন্তু সে পথে হাঁটে না কোনো সরকার। সরকারগুলো যদি ভাবে শিক্ষার উন্নয়ন দিয়ে কী হবে, এমনিতেই তো ক্ষমতাসীন থাকার মৌরুসিপাট্টা পেয়ে গেছি, তাহলে তো ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কমে যায়।
ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত দেশে একটি মুক্ত হাওয়া প্রত্যাশিত ছিল। বলাও হয়েছিল, দলীয় দাসত্বে বন্দি শিক্ষাবিদ নন, দলচর্চা বিযুক্ত স্বনামধন্য অধ্যাপকদের বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হবে, যাতে মুক্তচিন্তায় বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান সৃষ্টির তপোবন করায় ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার সে পথে হাঁটতে পারল না। বিশেষ দুই রাজনৈতিক দলের বলয়বন্দি শিক্ষাবিদরাই নিয়োজিত হতে লাগলেন। এটি হয়তো বড় রকমের দোষের কিছু নয়। যারা নিয়োগ পাচ্ছেন পাণ্ডিত্যে হয়তো সবাই উজ্জ্বল। কিন্তু দলীয় সংশ্লিষ্টতা থাকায় তাদের পক্ষে মুক্তচিন্তা করা কঠিন হবে। এমনটাই আমরা দেখে আসছি। এ দেশের রাজনৈতিক দলসংশ্লিষ্ট মানুষ কখনো দলের কোনো অন্যায়ের সমালোচনা করেছেন এমন দৃশ্য দেখা বা শোনার সৌভাগ্য ক’জনের হয়েছে তা বলা সহজ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে দলান্ধই হয়ে পড়েন। দলীয় আইনজীবীরা দলীয় স্লোগান দিতে দিতে প্রতিপক্ষ সহকর্মীদের ওপর হামলে পড়েন। দলীয় সাংবাদিকরাও মুক্তচিন্তা করতে পারেন না। এ দেশে যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে তখন সে দলের সমর্থক মানুষের মধ্যে প্রতিভা ও জ্ঞানের বিস্ফোরণ ঘটে, তাই বিভিন্ন জাতীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় সংশ্লিষ্টরাই নানা ক্ষেত্রে পুরস্কার পেয়ে থাকেন। বারবার এমনটাই দেখতে হচ্ছে আমাদের। দল নিরপেক্ষদের কোথাও অবস্থান নেই। অমন দেশে দলীয় ছাপ থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালকদের পক্ষে নিরপেক্ষভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জ্ঞানচর্চার তপোবন তৈরি করা কঠিন।
এসব বাস্তবতায় আমাদের ভাবতে হবে প্রকৃত শিক্ষার অভাব আমাদের বিবেকের জায়গাটিকে অন্ধকারে বন্দি করে রাখছে। এ বন্দিত্বের অর্গল অবমুক্ত করে দিতে হবে। সার্বিক শিক্ষা উন্নয়নে যদি এখনই আমরা পদক্ষেপ না নিতে পারি, তবে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ কণ্টকমুক্ত হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
ড. একেএম শাহনাওয়াজ: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়










