ঢাকায় গণপরিবহন খাত নানা সমস্যায় জর্জরিত। বিশেষ করে এখানে দীর্ঘকাল ধরে বিরাজ করছে বিশৃঙ্খলা। অবৈধ, অনুমোদনহীন ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন অবাধে চলাচল ও ব্যস্ত সড়কে যত্রতত্র থামানোর কারণে ঢাকার সড়কগুলোয় অসহনীয় যানজট হয়ে উঠেছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এমনকি প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। গণপরিবহন খাতের এ বিশৃঙ্খলা দীর্ঘদিনের অনিয়মের ফসল। যদিও খাতটিতে শৃঙ্খলায় ফেরাতে ২০০৫ সালে প্রণীত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) ঢাকায় নির্দিষ্ট কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবা প্রবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছিল। এরপর দুই দশক পেরিয়ে গেলেও সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি রুটে ‘নগর পরিবহন’ নামে পরিষেবা চালু হলেও সফল হয়নি সেগুলো।
বণিক বার্তার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবা চালু না হওয়ার পেছনে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তাদের বাধার কারণে এটি প্রবর্তন করা সম্ভব হয়নি। বিগত সরকারের আমলে সুবিধাভোগীদের নেতৃত্বাধীন মালিক সমিতি বাধা দিয়ে এসেছে। আর বর্তমানে বাধা দিচ্ছে দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া মালিক সমিতি। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, মালিক সমিতির এমন অসহযোগিতার অন্যতম কারণ সড়কে চাঁদাবাজির প্রবণতা। দেশে সড়কে কী হারে চাঁদা আদায় করা হয় তার একটি চিত্র গত ৫ মার্চ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে উঠে আসে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। এ চাঁদার ভাগ পান দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কর্মকর্তা-কর্মচারী, মালিক-শ্রমিক সংগঠন ও পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিরা। আরো বলা হয়েছে, দেশের বৃহৎ বাস কোম্পানির প্রায় ৯২ শতাংশ পরিচালনার সঙ্গে রাজনীতিবিদরা সম্পৃক্ত। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত। গত ৫ আগস্ট তৎকালীন সরকার পতনের পর সড়কে কিছুদিন চাঁদাবাজি প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছিল। সে দলের নেতারা আত্মগোপনে চলে যান। কিন্তু কয়েকদিন পরই আবার পুরনো পরিস্থিতিতে ফিরেছে গণপরিবহন ব্যবস্থা, কেবল হাতবদল হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ঢাকার পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে ক্ষমতার অপব্যবহারকারী মালিক সমিতির দৌরাত্ম্য বন্ধ করা আবশ্যক। বর্তমানে মেট্রোরেল চালু হওয়ায় ঢাকার মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছে চলাচলের ক্ষেত্রে। তবে স্বস্তি পাওয়া মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম। ঢাকার অধিকাংশ মানুষ যাতায়াতের জন্য গণপরিবহন হিসেবে বাসের ওপর নির্ভরশীল। এসটিপি অনুসারে, ঢাকা ও আশপাশে গণপরিবহনের যাত্রীদের ৫৮ শতাংশ বাসে যাতায়াত করে। বাস-মিনিবাস, সিএনজি অটোরিকশা ও কার—এ তিন শ্রেণীর যানের মধ্যে বাস-মিনিবাসে ৭২ শতাংশ ট্রিপ (যাত্রা) হয়। উল্লেখ্য, ঢাকার যানজট নিরসন ও গণপরিবহন ব্যবস্থা আধুনিকায়নে ২০০৫ সালে ২০ এসটিপি প্রণয়ন করা হয়েছিল। ২০১৫ সালে সেটি পরিকল্পনা সংশোধন করে করা হয় রিভাইজড স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (আরএসটিপি), যার মেয়াদ ২০৩৫ সাল পর্যন্ত। এসটিপি ও আরএসটিপিতে মেট্রোরেল, উড়ালসড়ক, বিআরটিসহ নানা অবকাঠামো উন্নয়নের সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু সব মেট্রোরেল, বিআরটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও ঢাকা ও আশপাশের মানুষের ২০ শতাংশ যাতায়াতের চাহিদা পূরণ হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর অর্থ হলো ঢাকার মানুষের কাছে এখনো মূল গণপরিবহন বাস। তাই বাস পরিচালনায় শৃঙ্খলা না এলে যেকোনো পরিকল্পনা সফল করা কঠিন হবে। বাস চলাচল নিয়মতান্ত্রিক করা না গেলে ঢাকার যানজটের কোনো সমাধান সম্ভব হবে না। তাই মালিক সমিতির কর্তৃত্ব নিয়ন্ত্রণ করে দক্ষ সড়ক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ঢাকায় কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবা প্রবর্তন কাজে সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। ঢাকায় কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবা প্রবর্তনে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ডিটিসিএ। এ প্রকল্পের মাধ্যমে বাস পরিষেবা চালুর প্রাথমিক কাজগুলো এরই মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিগত সরকারের আমলে প্রকল্পের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি রুটে নগর পরিবহন চালুও করা হয়। যদিও পরবর্তী সময়ে পরীক্ষামূলক বাসগুলো বন্ধ হয়ে যায়। ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার একটি রুটে বন্ধ হয়ে যাওয়া কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবা নগর পরিবহন পুনরায় চালু হয়েছে। সব বাসই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। ঈদুল ফিতরের আগে-পরে আরো কয়েকটি রুটে একই ধরনের পরিষেবা চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে এরই মধ্যে কাউন্টারভিত্তিক বাস পরিষেবা চালু করেছে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। ঢাকার বিভিন্ন রুটে চলাচল করা কাউন্টারভিত্তিক অনেক বাসে গোলাপি রঙ করা হয়েছে। যদিও বাসগুলো আগের মতোই চলছে। অভিযোগ রয়েছে, ডিটিসিএ যেন কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবা চালু করতে সফল না হয়, তার জন্যই কাউন্টারভিত্তিক নাম দিয়ে বাস পরিষেবা চালু করে দিয়েছে মালিক সমিতি।
কোম্পানিভিত্তিক বাস চালুর বাইরে ঢাকায় বাসের শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রথম রুট র্যাশনালাইজেশনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল ২০১৫ সালে। উদ্যোগটি নেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র। উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রায় সব কাজ গুছিয়ে আনলেও ২০১৭ সালে ওই মেয়র মারা যান। পরবর্তী সময়ে আরো অনেকে প্রচেষ্টা করলেও সেভাবে অগ্রগতি দেখা যায়নি কারো কাজের। পরিবহনসংশ্লিষ্টদের মতে, অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে উদ্যোগটি বাস্তবায়ন হয়নি। এর বাইরে প্রধানতম কারণ ছিল পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অসহযোগিতা। আর এ অসহযোগিতার অন্যতম কারণ চাঁদাবাজি, যা শুরুতেও উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং ঢাকার গণপরিবহন সেবার মানোন্নয়নে সর্বাগ্রে অসাধু মালিক সমিতি নেতাদের হাত থেকে গণপরিবহন খাতকে রক্ষা করতে হবে।
অতীতে রাজনৈতিক দলগুলোই পরিবহন মালিকসহ খাতসংশ্লিষ্টদের নানা ধরনের অনিয়ম করার সুযোগ করে দিয়েছে। বাস মালিকরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের প্রভাবেই চলেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তাদের স্বার্থে একপেশে ও একচেটিয়া সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আইন কার্যকরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের মুখে বিগত সরকারের পতন ঘটানোর অন্যতম লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র মেরামত। নতুন কোনো রাজনৈতিক দলও যদি আগের মতো প্রভাব খাটাতে চায় সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন।










