এমন অস্বস্তিকর সময়েও বাংলাদেশী প্রবাসীরা প্রতিনিয়ত রেমিট্যান্স পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ কমাতে সহযোগিতা করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বিদায়ী বছরে প্রবাসীরা রেকর্ডসংখ্যক ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠান। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের অভাব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার পাশাপাশি ডলার সংকটের সময় প্রবাসীদের ভূমিকা নিশ্চয়ই আনন্দের। তবে দেশ থেকে বিদেশের বিভিন্ন শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর পরিসংখ্যান মেলালে কিছুটা হতাশও হতে হয়।
শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠানোর বিষয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ শাসনামলে প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কিছু প্রকল্প এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নিলেও সেগুলো ফলপ্রসূ হয়নি। বরং নানা সমালোচনা তৈরি করে। এ প্রেক্ষাপটে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে শ্রমবাজার সংস্কার ঘিরে প্রত্যাশা জন্মে এবং এ বিষয়ে সরকারও নানা প্রতিশ্রুতি দেয়। যদিও সেসব অঙ্গীকার পূরণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি থেকেই গেছে। বিশেষ করে দেশের সবচেয়ে বড় তিন শ্রমবাজার যেসব পক্ষের কারণে সংকুচিত হয়েছে তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেও তেমন কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এমনকি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে আস্থা বাড়ানোর জন্য বাণিজ্যিক কূটনীতিরও অভাব ছিল। এমন এক জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার মাঝেই দায়িত্ব নিয়েছে নবনির্বাচিত সরকার। আর সদ্য বিদায়ী সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে বিএনপি সরকারের ওপর।
বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মসংস্থানের পুরনো সমীকরণ দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। ভূরাজনৈতিক জটিলতা, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে পেশিশক্তির ব্যবহার হ্রাস, মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে শ্রমবাজারের পরিসর সংকুচিত হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুসারে, নতুন ও পুরনো শ্রমবাজারকে ঘিরে কিছু সিন্ডিকেট গড়ে ওঠায় দক্ষ-অদক্ষ উভয় ধরনের কর্মীদের মাঝে কর্মমুখী অভিবাসনের আগ্রহ কমতে শুরু করেছে। বণিক বার্তার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর দায়িত্বে থাকা রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নানা ধরনের অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছে। এর পরও রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা কমেনি। বরং বিদায়ী সরকারের সময় নতুন করে যাচাই-বাছাই ছাড়াই ২৮৩টি রিক্রুটিং এজেন্সি অনুমোদন দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব এজেন্সি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বৈধ প্রক্রিয়ায় দক্ষ জনশক্তি রফতানি করে না। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ গমনপ্রত্যাশীদের হয়রানির কারণ হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানগুলো। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উত্থাপিত হলেও সেগুলো পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে এ দেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর প্রতি বিদেশী শ্রম খাতের আস্থার সংকট বাড়ছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরাসরি অবৈধ অভিবাসনের অভিযোগ থাকায় কিছু দেশ তাদের ভিসানীতিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
শ্রমবাজার বহুমুখী করার উদ্যোগ নেয়ার মাধ্যমেই নতুন সরকার সমস্যার সমাধান করতে পারবে, এমন নয়। তবে দেশে বিভিন্ন সময় শ্রমবাজারকে সরকারিভাবে পরিচালনার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এ খাতের সফলতা বেসরকারি খাতের হাত ধরেই এসেছে। মুক্তবাজারের রীতি অনুযায়ী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে প্রতিনিয়ত বিদেশের নতুন শ্রমবাজার সন্ধান করছে। এভাবে লাখ লাখ চাকরিপ্রত্যাশীকেও আকৃষ্ট করা যাচ্ছে। তবে বেসরকারি খাতের এ অনুসন্ধান প্রক্রিয়া সরকারি তদারকি প্রতিষ্ঠানের কড়াকড়ি ও কাগুজে জটিলতার কারণে ব্যাহত হয় বলে অভিযোগ এ খাতসংশ্লিষ্টদের। প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারে এ জটিলতাই মূলত সিন্ডিকেটগুলোকে উৎসাহ দেয়।
এক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতাও শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার পেছনে দায়ী। বাংলাদেশী শ্রমিকরা মূলত কাজ করেন নির্মাণ শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, বৃক্ষরোপণ, কারখানা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও সেবা খাতের রেস্টুরেন্ট, কফিশপ, হোটেল, ছোট দোকানে সাধারণ কর্মী হিসেবে। এটি এক ধরনের এককেন্দ্রিক বাজারনির্ভরতা তৈরি করছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা কম থাকায় বৈশ্বিক মানদণ্ডে যেখানে উপযুক্ত পারিশ্রমিক রয়েছে, এমন কর্মসংস্থানে তারা যুক্ত হতে পারেন না। একদিকে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অনিয়ম অন্যদিকে বাংলাদেশী শ্রমিকরা দক্ষ নন—এ দুটো ধারণার কারণেই বহু দেশ আমাদের শ্রমশক্তির ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। এ বাস্তবতা বিবেচনায় শ্রমিকের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
শ্রমিকের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশী শ্রমিকদের দক্ষতাভিত্তিক মানদণ্ড করা গেলে কূটনৈতিক পর্যায়ে দরকষাকষির ক্ষমতাও বাড়বে। শ্রমিক দক্ষ হলে তার বেতনও স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। জনশক্তি রফতানি খাতের অংশীজনদের মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক আস্থার সংকট, যা দূর করার বিষয়ে সরকারকে শিগগিরই কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে। কাজটি পুরোপুরি কঠিনও নয়। কারণ এ খাতের মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে রয়েছে একাধিক এজেন্সি ও সরকারি সংস্থার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আমলাতান্ত্রিক ও ব্যবস্থাপনাগত জটিলতা নিরসন করে এ নেটওয়ার্ককে সমন্বয় করে, তাহলে আরো বেশিসংখ্যক শ্রমিককে ভোগান্তি ছাড়াই বিদেশে পাঠানো সম্ভব। পাশাপাশি রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা যৌক্তিক পর্যায়ে আনা, অনিয়মে জড়িত অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি। প্রবাসী খাতকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়ে এগোতে হবে। তাৎক্ষণিক ঘোষণা না দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনার বিষয়ে সরকারকে ভাবতে হবে।
এছাড়া দেশের কর্মীদের জন্য যেসব শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলোয় কর্মী নেয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। মূলত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অনিয়ম-দুর্নীতির কারণেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলো থেকে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। এ নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার জন্য কূটনৈতিক তদবির বাড়াতে হবে। বর্তমানে প্রবাসী আয় বাড়ার অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতেও এটা অব্যাহত থাকবে। প্রতি বছরই আগে পাঠানো শ্রমিকদের একাংশ দেশে ফিরে আসেন। তাদের শূন্যস্থান পূরণ না হলে প্রবাসী আয়ও কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণাকালীন বিএনপি তাদের ইশতাহারে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে বিরাজমান সিন্ডিকেট ও প্রতারণা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। জনশক্তি রফতানির সব বাধা দূর করার জন্য কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ নেয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল তারা। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। জনগণ তাদের প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রাখতে চায়। রাতারাতি শ্রমবাজারসংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু স্বল্প সময়ের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে, যাতে রেমিট্যান্স প্রবাহের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকে।










