মাতৃভাষায় শিক্ষা বা পাঠদান বলতে আমরা বুঝি, কোনো শিশু যে ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীতে জন্মগ্রহণ করেছে সে ভাষাতেই তার প্রথম পাঠ শুরু হবে। স্বাধীনতা-উত্তর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতির গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশের কোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাতৃভাষায় শতভাগ পাঠদান শুরু করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি অঞ্চলের বিস্তৃত পাহাড়ে যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বসবাস করে। পাশাপাশি সমতল ভূমিতে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম হলো সাঁওতাল এদের বাসস্থান মূলত রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়া জেলায়। সমতলে বসবাস করা অন্য একটি বৃহৎ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হলো গারো যারা বৃহৎ ময়মনসিংহ জেলায় বসবাস করে। ওরাওঁ অন্য একটি গোষ্ঠী যারা উত্তরবঙ্গের রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া ও রাজশাহীতে বসবাস করে। নিজস্ব ভাষা হিসেবে সাদরি ভাষায় কথোপকথন করে। কৃষিভিত্তিক আরেকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হলো মুন্ডা যাদের বসতি খুলনার ডুমুরিয়া, কয়রা ও বাংলাদেশের বৃহত্তর সুন্দরবন এলাকায়। এছাড়া পাত্র ভাষাভাষীরা সিলেটে, খাসিয়া সম্প্রদায় সিলেট, ডালু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ময়মনসিংহ ও শেরপুর, কোচরা ময়মনসিংহে বসবাস করছে।
যদিও সরকার মাতৃভাষায় শিক্ষার গুরুত্ব বিবেচনায় ২০১৩ সালে ছয়টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করে। তবে সরকার শেষ পর্যন্ত পাঁচটি ভাষায় তা কার্যকর করতে সমর্থ হয়। এগুলো হলো গারো, সাদরি, চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা। লিপি বিতর্কের জন্য সাঁওতালিদের মাতৃভাষা কার্যক্রম থেকে বাদ দেয়া হয়। ভাষাবিজ্ঞানী সৌরভ শিকদার বলেন, এ পাঁচ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাইরেও বাংলাদেশে বর্তমানে ৪০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। যাদের রয়েছে স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও নিজস্ব ভাষা।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট কর্তৃক পরিচালিত নৃবৈজ্ঞানিক ভাষা সমীক্ষা প্রথম খণ্ড (২০১৮) অনুযায়ী বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪০টি। এসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বেশির ভাগ ভাষারই লিখিত রূপ নেই। বাংলাদেশে বাংলা ভাষাসহ মোট আটটি লিখন রীতির কথা জানা যায়, যা দীর্ঘকাল ধরে সংশ্লিষ্ট ভাষী কর্তৃক ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এগুলো হলো চাকমা, রাখাইন, মারমা, তঞ্চঙ্গা, মৈতৈ মণিপুরী, অহমিয়া ও বাংলা ভাষা। রাজশাহীতে বসবাসকারী কিছু জনগোষ্ঠী হিন্দি, বাংলা, উর্দু ও অন্যান্য ভাষার কিছু বর্ণ দিয়ে ‘সাদরি’ ভাষা ব্যবহার করে। সিলেটের চা বাগানে তেলেগু, সাঁওতালি, নেপালি ও রাই সম্প্রদায় এটি ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ হিসেবে ব্যবহার করে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তারা মৌখিক ভাষা ব্যবহার করে থাকে। যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা জীবিত আছে তারা প্রাত্যহিক কাজে তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করে থাকে। দুঃখের বিষয়, এসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সন্তানরা যখন প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করতে স্কুলে যায় তখন তারা নিজ মাতৃভাষায় পড়ালেখা করতে পারে না। কেননা বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক বাংলাভাষী। তারা এসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সংস্কৃতি, জীবন ও ভাষা সম্পর্কে একদমই অবগত নয়। তবে বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তা এ বিষয়ে আশার আলো জাগিয়েছে বলে মনে করি। প্রথমত, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এ পাঁচ ভাষাগোষ্ঠীর পাশাপাশি যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এখনো প্রাত্যহিক জীবনে তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করছে সেই বিষয়ে অতি জরুরি গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোন এলাকায় কোন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস বেশি তা বিবেচনায় সেই নৃগোষ্ঠীর ভাষার শিক্ষক প্রস্তুত করা অত্যাবশ্যক। যেমন ধরা যাক, বান্দরবানে একই সঙ্গে মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গা, খিয়ং, খুমি, লুসাই ও পাংখোয়ারা বসবাস করে। মাতৃভাষা শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ভাষার লিখিত লিপি রয়েছে কিনা তা অনুসন্ধান করা। যদি না থাকে তবে সম্প্রদায়ের হেডম্যান বা গোত্রপ্রধানদের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে এর সমাধান আবশ্যক।
বর্তমানে অনেকেই রোমান লিপি ব্যবহার করছে আবার একই সঙ্গে বাংলা লিপি। তবে এর সমাধানের উপায় হিসেবে নৃবৈজ্ঞানিক participatory rural appraisal (PRA) পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। মাতৃভাষায় শিক্ষার ক্ষেত্রে তারা কোন লিপি ব্যবহার করতে চায় তার বিস্তারিত উঠে আসবে। যদি সেই ভাষার অভিজ্ঞ শিক্ষক পাওয়া না যায় তবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট অত্র গোষ্ঠী থেকে কয়েকজনকে বাছাই করে স্বল্পমেয়াদি (ছয় মাস বা এক বছর) ভাষা শিক্ষা জ্ঞান প্রদান করতে পারে। একই সঙ্গে ওই ভাষায় খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে সুপারিশ করাসহ নানা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট। কেননা অনেক শিক্ষক নিজ গোষ্ঠী ছেড়ে পাহাড়ের মধ্যে গিয়ে শিক্ষা প্রদানের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন না। এ সমস্যার সমাধান হিসেবে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ করা সম্ভব হলে বিভিন্ন ভাষায় মাতৃভাষায় শিক্ষাদান কার্যক্রম চলমান থাকবে। এর মাধ্যমে অনেক জায়গায় সরকারের ব্যয় সংকোচন করা সম্ভব। কেননা অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে যাদের জনসংখ্যা অনেক কম, তাদের জন্য স্থায়ী শিক্ষকের বিকল্প হতে পারে এ পদ্ধতি।
সেই সঙ্গে এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে যেন বিকল্প এসব শিক্ষক নিজ গোত্রের মধ্য থেকে নেয়া হয়। দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভাষিক সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজস্ব ভাষার যোগাযোগ বাড়াতে হবে। সেক্ষেত্রে কমিউনিটি রেডিও, নিজস্ব লিখন পদ্ধতিতে লেখালেখির ওপর জোরারোপ করাসহ শিল্প-সাহিত্য চর্চার ওপর মনোনিবেশ করা জরুরি। নতুবা এসব ভাষার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। জাতীয় একটি রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের ৮ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিশু প্রাথমিক শিক্ষা এবং মাত্র ২ শতাংশ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে। অধিকাংশ শিশু পাঠ্যপুস্তকের বাংলা লেখা ভালোভাবে পড়তে ও বুঝতে পারে না। যথোপযুক্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বীকৃতির অভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাড়ি, বনাই, ডলই, রাজবংশী প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব ভাষার বদলে বাংলার ব্যবহার শুরু করেছে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, জাতীয় শিক্ষানীতি (২০১৩) অনুযায়ী সব শিশুকে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের মাধ্যমে শিক্ষাদানের যে মহতী উদ্যোগ তাও ভবিষ্যতে বাধার সম্মুখীন হবে।
আহাদ হোসেন: আর্কাইভিস্ট ও পেশাগত ফেলো (২০২২-২৩), আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট










