পুঁজিবাজারের উন্নয়েন সবসময়ই ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়ে আসছে। সেই সঙ্গে গুরুত্ব পায় সুশাসন। পুঁজিবাজারে সুশাসন না থাকলে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে ভরসা পান না। বাজার প্রায়ই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। শেয়ার দর কারসাজির মাধ্যমে সূচকের অস্বাভাবিক ওঠানামা পরিলক্ষিত হয়। দীর্ঘমেয়াদে সূচক নিম্মগামী হয়ে যায়। ফলে সুশাসনের ঘাটতিও পুঁজিবাজারের বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দুঃখজনকভাবে, দেশের পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির শেয়ারের বেশ ঘাটতি রয়েছে। নেই নিয়ম-নীতির পরিপালন।
এদিকে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতে দুর্দশা, উচ্চ সুদহারের মতো সংকটগুলো ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা তৈরি হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ব্যবসা ও মুনাফা কমেছে। কেউ কেউ লোকসানের মধ্যেও পড়েছে। অর্থনীতির এমন দোদুল্যমান অবস্থায় ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারের পরিবর্তে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বন্ডের দিকে ঝুঁকছেন, যা পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট তৈরি করেছে।
বিদ্যমান এসব চ্যালেঞ্জ বিনিয়োগকারীদের মনে আরো বেশি প্রশ্ন ও নিরাশার জন্ম দিয়েছে। পুঁজিবাজারকে নিয়ে এক প্রকার অনিশ্চয়তায় ভুগছেন অংশীজনরা। অনেকেই এরই মধ্যে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছেন। অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনেকেই নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না। কমেছে বিদেশী বিনিয়োগও। অথচ পুঁজিবাজারের জন্য বিদেশী বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশী বিনিয়োগের ওপর ভিত্তি করেই একটি স্থানীয় বা আঞ্চলিক পুঁজিবাজার বৈশ্বিক হয়ে ওঠে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে দেশের পুঁজিবাজারের মোট লেনদেনে বিদেশীদের অংশগ্রহণের পরিমাণ ১ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ফ্লোর প্রাইস, নীতির অধারাবাহিকতা, ভালো শেয়ারের অভাব, বিনিময় হারের অস্থিরতা ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে বিদেশীরা দেশের পুঁজিবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। পাশাপাশি অদক্ষ ব্যবস্থাপনায় এটি অপরিণতই থেকে গেছে। এখান থেকে অর্থ সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রতা ও কার্যকর বন্ড মার্কেটের অনুপস্থিতি উদ্যোক্তাদের পুঁজিবাজারবিমুখ করছে। যে কারণে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে প্রায় সব সূচকেই এ দেশের পুঁজিবাজারের অবস্থান সবার নিচে। বলা বাহুল্য, সবমিলিয়ে বিনিয়োগে ভাটা পড়েছে এবং পুঁজিবাজারের গতি কমেছে।
এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারের গতিশীলতা বাড়াতে হলে জরুরি ভিত্তিতে সরকারের কিছু দৃশ্যমান কার্যক্রম হাতে নিতে হবে যা বিনিয়োগকারীদের কিছুটা হলে আশ্বস্ত করবে। বর্তমান সংকট কাটিয়ে দীর্ঘমেয়াদে দেশের পুঁজিবাজার টেকসই হবে এমন বার্তা বিনিয়োগকারীদের দেয়া প্রয়োজন।
আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের মতো পুঁজিবাজারেও অবাধ লুটতরাজ হয়েছে। অসংখ্য দুর্বল ও প্রায় অস্তিত্বহীন কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করে পুঁজিবাজারের বোঝা বাড়ানো হয়েছে। লাগামহীন কারসাজির মাধ্যমে দুর্বল মৌলভিত্তির, জাংক কোম্পানির শেয়ারের দাম ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। ফ্লোর প্রাইস আরোপ, সার্কিট ব্রেকারের ঊর্ধ্বসীমা ও নিম্নসীমা বেঁধে দেয়া ইত্যাদি নানা কৃত্রিম ব্যবস্থায় বাজারের শোচনীয় অবস্থা ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। আবার বিভিন্ন সময়ে শেয়ার কারসাজিতে অভিযুক্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো বিচার ও শাস্তির পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এভাবে মূলত বিগত সরকার পুঁজিবাজারকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।
এমন এক পরিস্থিতিতে যখন অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়, তখন অংশীজনদের মনে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা জন্মায়। সেই প্রত্যাশার প্রতিফলনও দেখা যায় পুঁজিবাজারের প্রধান সূচকে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পর কয়েক দিন সূচক ও লেনদেনে ঊর্ধ্বগতি দেখা গিয়েছিল। যদিও তা দীর্ঘায়িত হয়নি। এমনকি ছয় মাস অতিবাহিত হলেও সরকারের দিক থেকে কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষণীয় নয়। বিশেষ করে পুঁজিবাজারে কোম্পানির তালিকাভুক্তি ও শেয়ারদর কারসাজি প্রতিরোধে কাঠামোগত সংস্কারের কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
পুঁজিবাজার সংস্কারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পক্ষ থেকে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হলেও এখন পর্যন্ত এ টাস্কফোর্সের কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ পায়নি। ফলত আশঙ্কা করা হচ্ছে, প্রতিবেদন জমার পর এতে যেসব সুপারিশ উঠে আসবে সেগুলোরও যথাযথ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কম। সব মিলিয়ে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশার উদ্রেক ঘটেছে। ছেদ পড়েছে বাজার অংশীজনদের প্রত্যাশায়।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সার্বিক সূচক ডিএসইএক্সের অবস্থান ছিল ৫ হাজার ৯২৫ পয়েন্টে। সেদিন এক্সচেঞ্জটিতে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। এর পর থেকে পুঁজিবাজারের সূচক ও লেনদেন ক্রমেই নিম্নমুখী। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ডিএসইএক্স সূচক ৫ হাজার ১৭৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে সূচকটি ৭৪৬ পয়েন্ট হারিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৪৩০ কোটি টাকা। এক্সচেঞ্জটিতে সর্বশেষ ৫০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছিল গত বছরের ৩ ডিসেম্বর। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত লেনদেনের পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা স্পর্শ করেনি।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের জরুরি ভিত্তিতে ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়ানোর বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক। এতে বিনিয়োগকারীদের মাঝে স্বল্প সময়ে ইতিবাচক বার্তা দেয়া সম্ভব হবে। গত ১৬ বছরে দেশের পুঁজিবাজারে কোম্পানি তালিকাভুক্তির নামে অসংখ্য অনিয়ম হয়েছে। এ সময়ে যেসব কোম্পানি পুঁজিবাজারে এসেছে তার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক এরই মধ্যে দুর্বল কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে যেমন তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নিতে হবে, তেমনি এর বিপরীতে ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা আবশ্যক।
এর বাইরে সুশাসন নিশ্চিতে কাজ করতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজার কারসাজি প্রতিরোধে কমিশনের উদ্যোগ যথেষ্ট দুর্বল। তাছাড়া বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর এখন পর্যন্ত অনিয়ম ও কারসাজির দায়ে ৭০০ কোটি টাকার বেশি জরিমানা করা হয়েছে, যার মধ্যে এখন পর্যন্ত ১ টাকাও আদায় করা সম্ভব হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাবেন না এবং বিনিয়োগে আগ্রহ বোধ করবেন না। সরকারকে সুশাসন নিশ্চিতে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে নয়তো এ ধরনের কারসাজি বন্ধ করা দিন দিন আরো কঠিন হয়ে উঠবে।
বিএসইসি সূত্রে জানা যায়, পুঁজিবাজার সংস্কারসংক্রান্ত টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে জমা হবে। প্রতিবেদনে সংস্কারের যেসব সুপারিশ উঠে আসবে তার মধ্যে স্বল্প মেয়াদেরগুলো দ্রুতই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে। মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। এসব সংস্কার বাস্তবায়ন হলে পুঁজিবাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এ নিয়ে দ্বিমতের সুযোগ নেই। পুঁজিবাজারের যে ক্ষত তা রাতারাতি সারিয়ে তোলা সম্ভব নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পুঁজিবাজারকে দাঁড় করানোর প্রয়াস দৃশ্যমান হওয়া উচিত যাতে পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়। সেটি হতে পারে নতুন কারসাজি বন্ধ ও এরই মধ্যে চিহ্নিত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে পুঁজিবাজারে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। একই সঙ্গে বিশৃঙ্খলাগুলোর অবসান ঘটানো হতে পারে একটি কার্যকর উদ্যোগ। শেয়ারবাজারের টানা দরপতনের প্রতিবাদে এরই মধ্যে একাধিক দফায় বিক্ষোভ-সমাবেশ করেছেন বিনিয়োগকারীরা। সুতরাং সরকারের জরুরি ভিত্তিতে কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে। স্থিতিশীলতা ফিরলে তাতে কিছুটা হলেও আস্থার পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে এবং ভালো কোম্পানিকেও আকৃষ্ট করা যাবে। তাতে ধীরে ধীরে পুঁজিবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।










