আকস্মিক বন্যায় ফসল তলিয়ে যাওয়া হাওর অঞ্চলের কৃষকের বড় সমস্যা। আসছে ঝড়-বৃষ্টির মৌসুম। প্রতি বছরই পাহাড় থেকে নেমে আসা আকস্মিক ঢলে হাওর অঞ্চলে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। গত বছরের দুটি বন্যায় হাওর অঞ্চলে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এ বছরও হাওর অধ্যুষিত সিলেট বিভাগের অনেক স্থানেই অরক্ষিত রয়েছে ফসল রক্ষা বাঁধ। কৃষকদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে বোরো ফসল রক্ষা বাঁধের নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায়। এতে কৃষকের দুশ্চিন্তা বাড়ছে। আগাম বন্যার আশঙ্কাও করা হচ্ছে। হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের সময়সীমা গত ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হতে আর বাকি মাত্র দুদিন। কিন্তু এর মধ্যে খবর মিলছে, হাওরের অনেক জায়গায় এখনো বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হয়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবে বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কারও পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে উঠতি বোরো ফসল ঘরে তোলা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হচ্ছে। বোরো মৌসুমে উৎপাদিত ধানের বড় একটি অংশ আসে হাওর অঞ্চল থেকে। হাওরে বোরোর ফসলহানি ঘটলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়ে, অস্থির হয়ে ওঠে চালের বাজার। সুতরাং আকস্মিক বন্যার কবল থেকে হাওরের ফসল রক্ষায় দ্রুত বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ করা জরুরি। বাঁধ নির্মাণকাজ শেষ করতে প্রশাসনকে আরো সক্রিয় হতে হবে।
হাওর অঞ্চলে আগে ঠিকাদারি ভিত্তিতে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হতো। অনিয়ম রোধে কয়েক বছর ধরে সেখানে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) প্রথা চালু হয়েছে। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সংকট কাটেনি। এখনো সময়মতো প্রকল্প হয় না, বাস্তবায়ন কমিটি হয় না, বাঁধের কাজ সময়মতো শুরু হয় না, সময়মতো শেষও হয় না। এছাড়া সামনে কৃষকের নাম থাকলেও পেছনে রয়েছেন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা। সরকারি হিসাবে সুনামগঞ্জে ৮০ শতাংশ, সিলেটে ৬০ ও হবিগঞ্জে ৬৯ শতাংশ বাঁধ নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্মকর্তাদের দাবি, তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাঁধ নির্মাণকাজ শেষ করতে পারবেন। অন্যদিকে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতাদের দাবি, এখনো অর্ধেক কাজ শেষ হয়নি। তাদের দাবি মাটি কাটার কাজ শেষ হলেও এখনো দুরমুশ, বস্তা বাঁধা, ঘাস লাগানোসহ অনেক কাজ বাকি। এবারো সময়মতো কাজ শেষ হবে না। এটা হতাশাজনক। তাছাড়া কাজের তদারকিতে রয়েছে দুর্বলতা। তদারকি বাড়াতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী, ১৩ সদস্যের পিআইসিতে দাপ্তরিক কর্মকর্তা ছাড়াও একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি, গণমাধ্যম প্রতিনিধি, এনজিও প্রতিনিধি, নারী প্রতিনিধি, কৃষক প্রতিনিধি, মৎস্যজীবী প্রতিনিধি থাকার কথা। কৃষকদের স্বার্থে রাষ্ট্র প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়, কিন্তু যারা কাজ বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত, তারা কৃষকের নয়, নিজেদের স্বার্থই বড় করে দেখেন। কিন্তু সমস্যা হলো পাউবো ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্থানীয় রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক প্রভাবশালীরা মিলে হাওরে সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তুলেছেন। যে কারণে কাজে দুর্নীতি-অনিয়ম হচ্ছে। বাঁধের নামে টাকার অপচয় ও লুটপাট হয়। এতে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক। আবার যারা কমিটিতে থাকার যোগ্য তাদের না রেখে প্রভাশালীদের রাখা হচ্ছে। ফলে তদারকি ব্যবস্থায় থেকে যাচ্ছে দুর্বলতা। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে দায়সারাভাবে কাজ হচ্ছে। ফলে বন্যার পানিতে ফসল রক্ষার বদলে অনেক সময় উল্টো বাঁধ তলিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। কাজেই টেকসই বাঁধ নির্মাণ নিশ্চিতে পিআইসি গঠনে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কমিটি গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে তদারকি ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।
বাঁধ নির্মাণের সঙ্গে হাওরবাসীর জীবন-জীবিকা যুক্ত। সুতরাং এক্ষেত্রে কোনো ধরনের দুর্নীতি কাম্য নয়। অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। অনিয়ম বন্ধ করতে হবে। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পিআইসি যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করে তাও নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করে সময়মতো অর্থছাড় করতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, সিলেট বিভাগের চারটি জেলার মধ্যে মৌলভীবাজার ছাড়া অন্যগুলোয় বোরো ফসল রক্ষায় ৭২৫টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনের মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণকাজ হচ্ছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জে ৬৮৭টি, সিলেটে ২২ ও হবিগঞ্জে ১৬টি পিআইসি রয়েছে।
হাওরে বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রকৌশলগত ঘাটতিও বিরাজমান। নিয়ম অনুযায়ী, বাঁধের ৫০ মিটার দূর থেকে মাটি কাটার কথা। কিন্তু বেশির ভাগ বাঁধের ক্ষেত্রেই বাঁধের পাড় থেকে মাটি কেটে বাঁধ দেয়া হয়। এতে বাঁধ দুর্বল হয়। বাঁধে একটি নির্দিষ্ট ঢাল থাকার কথা (২:১), কিন্তু অনেক বাঁধই খাড়া থাকায় পানির তোড়ে সহজেই ভেঙে যায়। ড্রেজার মেশিনে বাঁধের কাছ থেকে মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণ করার কারণেও অনেক বাঁধ দুর্বল হয় এবং সহজেই ভেঙে যায়। হাওর এলাকা এমনিতেই নিচু। বছর বছর বাঁধের জন্য মাটি কাটার ফলে যেসব জায়গা একটু উঁচু ছিল, তা-ও নিচু হয়ে যাচ্ছে। তাই এখন অনেক হাওরে বাঁধ নির্মাণের জন্য বাঁধের ধারেকাছে মাটি পাওয়া যায় না। দূর থেকে নৌকায় করে মাটি আনতে হয়। এতে সময় যেমন বেশি লাগে, খরচও তেমন বেশি হয়। এ সংকট নিরসনে জুতসই বিকল্প উপায়ের সন্ধান করতে হবে।
হাওর অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব ক্রমেই মারাত্মক আকার ধারণ করছে। এখন অনেক হাওর থেকে পানি নামতে দেরি হয় বলে দেরিতে ধানের চারা রোপণ করা হচ্ছে। এতে ধান কাটার সময় পিছিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে অকাল বন্যা ক্রমেই এগিয়ে আসছে। বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে। সুষ্ঠুভাবে ও সময়মতো বাঁধের কাজ শেষ করার জন্য বাঁধের কাজ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। সর্বোপরি এ বাঁধ বা ফসলের ওপর যাদের জীবন ও জীবিকা নির্ভর করে ওই কৃষকদের অধিকারসচেতন করা গেলে তারা নিজেরাই নিজেদের অধিকার আদায় করে নেবেন। এজন্য কৃষকদের সচেতনতা অত্যাবশ্যক। আমরা হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নিয়ে কোনো অনিয়ম দেখতে চাই না। অসাধু কর্মকর্তা ও ক্ষমতাসীনদের চক্র ভেঙে দিতে হবে।
হাওরে একসময় ঠিকাদারদের মাধ্যমে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ হতো। ২০১৭ সালের বন্যায় হাওরে ফসলহানির পর বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ঠিকাদারি পদ্ধতি বাতিল করে পিআইসির মাধ্যমে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। বাঁধ নির্মাণে নতুন নীতিমালা করে ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করে সরাসরি যুক্ত করা হয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে। এখন তারাও যদি ব্যর্থ হন তাহলে তা হতাশা ছাড়া আর কী এনে দিতে পারে? তবে খানিকটা আশার কথা, কর্মকর্তারা দ্রুত কাজ শেষ করার আশ্বাস দিয়েছেন। তড়িঘড়িতে কাজের মান যাতে নষ্ট না হয়, সেদিকেই এখন বিশেষ নজর রাখা দরকার। দুর্যোগের বিরূপ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ে বাঁধ নির্মাণকাজ শেষ না হওয়া হতাশাজনক। নির্মাণকাজ বিলম্বিত হওয়ার কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আবারো হাওর আক্রান্ত হলে শুধু হাওরবাসীই নয় সারা দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই অতি দ্রুত বাঁধ নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে। হাওরের বোরো ধান উৎপাদনের সঙ্গে সারা বছরের খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। হাওরে বাঁধ নির্মাণে গড়িমসির কোনো সুযোগ নেই। হাওর অঞ্চলের ফসল রক্ষায় দ্রুত বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।










